সুদেষ্ণা সিংহ: মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বলিদান যে নারীর (পর্ব ২)

এখনই শেয়ার করুন

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

বিবিধ ডট ইন: ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল ভাষাভাষীর প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আসামে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের এই অধিকার দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় জন্ম নিয়েছিল সম্ভবত সবচেয়ে দীর্ঘ এক ভাষা আন্দোলনের। আসামের বরাক উপত্যকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ১৯৫৫ সালে। সে বছর ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মহাসভা’ মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের সাত দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, পরে যা ‘সত্যাগ্রহে’ রূপ নেয়। দশকের পর দশক ধরে এ আন্দোলন ব্যাপক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে, অথচ নিজ ভাষার স্বীকৃতি মেলেনি বিষ্ণুপ্রিয়াদের। (সুদেষ্ণা সিংহ: মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বলিদান যে নারীর পর্ব ২)

 

সুদেষ্ণা র বিদায় বেলায়:

১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ ,শনিবার। এইদিন ‘নিখিল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী স্টুডেন্ট্স ইউনিয়ন’ সবচেয়ে দীর্ঘ ৫০১ ঘণ্টার রেল ও ট্রেন অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করেছিলো। এ সময় রাজপথে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আসামের কলকলি ঘাটের গুংঘাঝারি রেলস্টেশনে করিমগঞ্জ (আসাম, বাংলাদেশের সীমান্তে) থেকে আসতে থাকা একটি ডাউন ট্রেন অবরোধ করে। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই আন্দোলন চলাকালে পুলিশ অবরোধকারীদের উপর লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে, ঠিক যেমনটা ঘটেছিল বীর বাঙালির রক্তঝরা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মিছিলে।সেদিন পুলিশের গুলিতে ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আহত হন শতাধিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। ঘটনাস্থলেই সকাল ১২:১০ নাগাদ মারা যান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপ্লবী নারী সুদেষ্ণা সিংহ।

 

ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা সিংহ:

বিষ্ণুপ্রিয়ারা শহীদ সুদেষ্ণাকে সম্মান জানিয়ে বলে ‘ইমা সুদেষ্ণা’। ভারতের আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলার শিলচরে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার চাইতে গিয়ে ১৯৬১ সালে মে মাসের ১৯ তারিখ যে এগারো জন বীরশহীদ আত্মাহুতি দেন তাদের মধ্যে ছিলেন প্রথম নারী ভাষাশহীদ মাত্র সতেরো বছরের তরুণী কমলা ভট্টাচার্য। আর ৩৫ বছর পর আবারো ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলনে শহীদ হন বত্রিশ বছর বয়সী সুদেষ্ণা সিংহ। সুদেষ্ণাকেই আদিবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভাষাশহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

পৃথিবীর ভাষার ইতিহাসে এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির ইতিহাসে এ ১৬ই মার্চ  অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাংলাদেশের পূর্বে এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা কখনোই সুদেষ্ণা এবং তার আত্মত্যাগের কথা ভুলতে পারে না। আসাম সরকারের পাশাপাশি ত্রিপুরা সরকারও এ দিনটিকে ‘ভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত উভয়প্রান্তের বিষ্ণুপুরী মণিপুরীভাষী মানুষ প্রতিবছর রক্তঝরা এই ১৬ মার্চকে স্ব-ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ‘শহীদ সুদেষ্ণা দিবস’ হিসাবে পালন করে থাকে।

 

সুদেষ্ণা সিংহ: মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বলিদান যে নারীর লিখেছেন কাকলি কর্মকার।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।