সুদেষ্ণা সিংহ: মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বলিদান যে নারীর (পর্ব ১)

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষার জন্য রক্ত দেবার এ ইতিহাস,আমাদের পরম গর্বের ইতিহাস। ১৯৫৩ সাল থেকে আমরা এই দিনে ভাষাশহীদদের স্মরণ করে আসছি; এবং তার পাশাপাশি ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর ২০১০ সাল থেকে পুরো বিশ্ববাসীর কাছেই একুশে ফেব্রুয়ারি আজ স্ব-স্ব ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব মূল্যায়ণে এক অনন্য স্মরণীয় দিন।

পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দু’টি ভাষার জন্যই জনগণকে লড়াই করতে হয়েছে,বুকের রক্ত ঝরাতে হয়েছে – ভাষা দু‘টি হলো বাংলা এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । তামিল ও কন্নাড়া ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা করার দাবীতেও আন্দোলন হয়েছে, তবে কেবল বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জাতিগত অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার মতোই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদেরকে তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামে অনেক রক্ত ও প্রাণ ঝরেছে এবং সে সংগ্রাম ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর। মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চরম পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছিল সুদেষ্ণা সিংহ নামের এই বিদ্রোহী তরুণী।

 

সুদেষ্ণা র গল্পের শুরু:

১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি আসামের বরাক উপত্যকায়,যার ঠিক নিচেই সুরমা উপত্যকা, সেখানে কচুবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এক শিশুকন্যা, তাঁর নাম সুদেষ্ণা সিংহ। গ্রামবাসীরা আদর করে তাঁর ডাকনাম দেয় ‘বুলু’।
দরিদ্র পরিবারে কন্যা সুদেষ্ণা,পরিবারের সহায়-সম্বলহীন সামর্থ্যকেই চিরসঙ্গী করে নিয়ে তাঁর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। এভাবে কেটে যায় বত্রিশটি বছর। ১৯৯৬ সাল। একদিন আসামের ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি’-অধ্যুষিত এলাকায় ডাক আসে ‘ইমার ঠার’ আন্দোলনের। ‘ইমা’ শব্দের অর্থ মা। নিজেদের ভাষাকেও তারা ‘ইমার ঠার’ অর্থাৎ ‘মায়ের ভাষা’ বলে অভিহিত করে। এরপর দলে দলে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষী মানুষ জড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলনে। নিজ ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় রেল অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয় সুদেষ্ণা সিংহ।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার জন্য লড়াই:

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি নামে পরিচিত ভাষিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির আদিভূমি হলো ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের মণিপুর নামের একটি রাজ্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে নানান রাজনৈতিক এবং সম্প্রদায়গত সংঘর্ষের কারণে এবং বিশেষ করে ১৮১৯–১৮২৫ সালে সংঘটিত বার্মা–মণিপুর যুদ্ধের সময় ব্যাপক সংখ্যক মণিপুরির অভিবাসন ঘটে পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের কাছাড়, ত্রিপুরা এবং পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্র)। অভিবাসী মণিপুরিদের মধ্যে বলতে গেলে সবাই মৈতৈ, বিষ্ণুপ্রিয়া এবং পাঙন (মণিপুরি মুসলিম) সম্প্রদায়ের। বিষ্ণুপ্রিয়াদের ভাষার নাম বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি এবং মৈতৈদের ভাষা মৈতৈ বা মীতৈ। মণিপুরে প্রায় ত্রিশটিরও বেশী বৈচিত্রময় জাতির মানুষের বাস হলেও সেখানে মৈতৈরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মৈতৈ ভাষা সেখানে লিঙগুয়া ফ্রাংকা। ইমফাল, বিষ্ণুপুর ও নিংথৌখঙের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি যারা ছিল, তারা প্রায় সবাই মৈতৈ ভাষা গ্রহণ করার ফলে মণিপুরে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে ভারতের সাম্প্রতিক সেন্সাস থেকে মণিপুরের জিরিবাম অঞ্চলে কয়েক হাজার বিষ্ণুপ্রিয়ার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।

ভারতের মণিপুরসহ বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বরাবর একটি আন্ত:জাতিগত দ্বন্দ্ব আছে কে মণিপুরি আর কে মণিপুরি নয় তা নিয়ে। ভারতের মণিপুর অঞ্চলেই বিষ্ণুপ্রিয়া বা মৈতৈ ভাষার উদ্ভব। যদিও বিষ্ণুপ্রিয়া এবং মৈতৈ এই দুইটি জাতিকে বরাবর রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজে ‘মণিপুরি’ হিসেবে দেখানো হয়। ভারতের ভাষানীতির ভিত্তি স্যার জর্জ গ্রিয়ারসনের ‘লিংগুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের স্পষ্টভাবে ‘বিষ্ণুপুরীয়া মণিপুরি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের জাতীয় নথিপত্রসমূহে দুই জনগোষ্ঠীকেই ‘মণিপুরী’ হিসেবে দেখানো হলেও ‘মণিপুরী’ ভাষা হিসেবে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়া। ২০০৭ সালের ৮ মার্চ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে বিষ্ণুপ্রিয়া ‘মণিপুরী’ ভাষা হিসেবে তার মর্যাদা ফিরে পায়। আবার ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের দিকে।

পরবর্তী পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

সুদেষ্ণা সিংহ: মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বলিদান যে নারীর লিখেছেন কাকলি কর্মকার।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।