ভালোবাসা মানে চৌরাশিয়ার বাঁশি

এখনই শেয়ার করুন

 

সখী ভালোবাসা কারে কয় ?
সে কি কেবলই যাতনাময় !

বহুকাল আগে গুরুদেব হয়তো কোনো এক বটবৃক্ষ তলে কিংবা ঘরের কোনো এক অসহায় জানালার সঙ্গী হয়ে, আমাদেরই উদ্দেশে করেছিলেন এই প্রশ্ন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, প্রশ্নটার মাহাত্য…গুরুত্ব। প্রেম মানে কি !
কেবল গোলাপ নিবেদন ?
শুধুই কি হাতের উপর হাত ?
কোনো এক দামী রেস্তোরাঁয়, দামী অঙ্গুলি বন্ধকের বিনিময় একে অপরকে এক খাঁচায় আবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি ?
নাকি কাম বাসনা ?
সত্যি কি প্রেম, নাকি সবটাই অলীকতা !
ছোট বেলায় অঞ্জন দত্তের একটি গান আমাকে করেছিল হতবাক, হতভম্ব।

‘একটা বুড়ো গ্রামোফোনে যার বাজনা কখনো থামে না
একটা জোকার যার মুখেতে ভরে গেছে হাসি
একটা হেরে যাওয়া সৈন্যের দল যারা হার মেনে নেয় না।
আমি তাদের মতন করে তোমাকে ভালোবেসেছি।’
অর্থাৎ শিল্পী এখানে ভালোবাসার সঙ্গা দিচ্ছেন গভীর বিরহ ব্যাথায় তপ্ত হয়ে। তাই আজ বড্ডো লিখতে ইচ্ছে করছে~
বিরহ ব্যাথায় ব্যাথিত হয়ে তোমারে খুঁজেছি আমি।
প্রেম যে আজ রাস্তায় বিকোয়, কোহিনুর হলো দামী।

কবি জীবনানন্দ দাশ তার কবিতা ও তার চিন্তা ধারার মাধ্যমে যে ভাবে প্রকৃতি প্রেমিকের পরিচয় বহন করতেন তা বলাই বাহুল্য। সেও কিন্তু প্রেমিক। কেবল একজন একনিষ্ঠ প্রেমিকই লিখতে পারেন

‘মিশরের মানুষী তার বুকের থেকে যে মুক্তা আমার নীল মদের
গেলাসে রেখেছিলো
হাজার-হাজার বছর আগে এক রাতে— তেমনি—
তেমনি একটি তারা আকাশে জ্বলছে এখনও।’

বিজ্ঞানসম্মত ভাবে মানুষ তার সারাজীবনে মগজাস্ত্রের কিছু অংশ ব্যাবহার করে থাকেন। প্রেমও হয়তো ঠিক তাই। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলছেন, “যদি পাগল হতেই হয় তাহলে সংসার ধর্মে থেকে কেন পাগল হবি ? তাকে ডেকে পাগল হ। ঠিক যেমন কৃষ্ণ রাধিকার প্রেমে, গৌরাঙ্গ জগন্নাথের প্রেমে…। সেই প্রেম এক আনা নয়, দুই আনা নয়, পুরো ষোলো আনা।” এমন প্রেম রসে সিক্ত হবে, এমন সাদ্ধি কার… !?

আচ্ছা একটু ভাবুন তো, অস্তগামী সূর্য রাঙিয়েছে গোটা সমুদ্রকে। বিন্দু বিন্দু জলরাশি একত্রিত হয়ে সৃষ্টি করছে ঢেউ। তাদের গর্জন এবং আগন্তুক বাতাসের শব্দ আপনাকে জানান দিচ্ছে তাদের অস্তিত্ব। এবং আপনার ফোনে বাজছে
‘যদি আকাশের গায়ে কান না পাতি তোমার কথা শুনতে পাবো না।
যদি বাতাসকে আমি ছুঁয়ে না দেখি তোমার শরীর স্পর্শ পাবো না।’
ফিরে যান সেই ছোট্ট বেলায়, প্রত্যেক দিন সকালে ঘুমচোখ খোলার পর আপনার মায়ের স্নেহের সেই আলিঙ্গন, এবং তাঁর কোলে মাথা রেখে ঘুমের আড়ষ্টতা কাটানো।
দুর্গাপূজার আগে মহালয়ার গভীর ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে শুনতে আপনার কানে ভেসে আসছে নামাজের ধ্বনি।
আবার ধরুন কোনো এক সন্ধ্যায় আজান পড়তে পড়তে আপনার কানে ভেসে উঠলো কোনো মন্দিরের সন্ধ্যা আরতির পবিত্র বাণী।
কিংবা ভাবুন আপনি কোনো এক গভীরে জঙ্গলে পথ ভ্রষ্ট পথিক, এবং আপনার হাতে রয়েছে বিভূতিভূষণ এর চাঁদের পাহাড়।
রাস্কিন বন্ডের ‘The Eyes Have It’ গল্পের অন্ধ পথিক, আপনি নিজে।
অথবা আপনি একজন ক্রিকেট প্রেমিক মানুষ আপনার হাতে এসজি টেস্ট বল। আপনার হাতের বলটা গুড লেন্থে আউটসাইড অফ দ্য স্ট্যাম্পে পিচ আপ হয়ে, ব্যাটসম্যানের ব্যাট ও প্যাড এর মাঝখান থেকে বেরিয়ে সোজা অফ বা মিডল স্ট্যাম্প নিয়ে বেরিয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে আপনার কোচ ফ্যাবিউলাস বলে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো।

একবার বুকে হাত রেখে বলুনতো আপনার কি এক মুহূর্তের জন্যও প্রেম জাগবে না !

তাই বলি, প্রেম নিবেদন করার জন্য বছরের নিদৃষ্ট কোনো দিন বেছে নেবেন না।
আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে, রোজ ডে -র দিন
“এটা আমাদের সংস্কৃতি না।
এ সমাজ বিগড়ে গাছে
এই সব আমাদের সময় ছিল না
যত সব ন্যাকাপনা”
এইসব বলে নিজেকে ছোট করবেন না।

মনে রাখবেন গোটা বিশ্ব কে একত্রিত করার ক্ষমতা রাখে প্রেম, ভালোবাসা। আমরা তাকে সেই ক্ষমতা প্রদর্শন করতে দিনই। একবার এই সুযোগটা দিয়ে দেখুন। দেখবেন আমার আপনার দেশ হবে সীমান্তবিহীন, বেড়াজালবিহীন। যাতায়াতে লাগবে না কোনো পাসপোর্ট। সৈনিকদের হাতে থাকবে কেবল লাল গোলাপ। এই গোলাপে অভিষিক্ত হবেন কেবল আপনি। আপনার আরাধ্য দেব দেবীর বাসস্থানের বাইরের ফুটপাথে থাকবে না কোনো ক্ষুধার্ত গর্ববতী। আপনার দিকে চাইবে না কাদা মাটি মাখা সেই অসহায় ল্যাংটো শিশুর চোখ। দেখবেন সারাবিশ্ব জুড়ে উঠবে সেইদিন কৃষ্ণচূড়ার ঝড়। স্লোগান বদলাতে বাধ্য হবে ওঁরা। ওঁরা বলবে- তোমার হাতের গোলাপটাই হবে সকল ক্ষমতার উৎস।

জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বমুহূর্ত অব্দি সেই দিনটার জন্য লড়ব। না না পেশিশক্তির জোরে নয়, ভালোবাসার জোরে। আপনাদের পাশে পাবো তো ?

লিখলেন অর্পিত চৌরাশিয়া

ছবি: অনিন্দিতা সুর


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।