আমি আসব ফিরে তোমার পাড়ায়

এখনই শেয়ার করুন

ঠক ঠক ঠক…!
সকাল সকাল দরজায় তিনবার নাড়া। ঘুম চোখে অত্যন্ত বিরক্তির ভাব নিয়ে দরজা খোলে রোহন। দরজার ওপারে কোমরে হাতে দিয়ে দাঁড়িয়ে সৌমি- ‘তোর না আজ পরীক্ষা… এখনও ঘুমাচ্ছিস?’
‘সে তো ১১টা থেকে। এত সকালে এসেছিস কেন?’
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ সুরে বলল রোহন।
‘তা এখন ক’টা বাজে খেয়াল আছে?’

এই নিয়ে সকাল সকাল এক প্রস্থ লেগে গেল দু’জনের মধ্যে। হোস্টেলের ছেলে মেয়েরা আগে এ নিয়ে আগে বিরক্তি প্রকাশ করলেও এখন তাদের অভ্যেস হয়ে গেছে ব্যাপারটা। ঝগড়া মিটিয়ে, চান করে, জল খাবার খেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটল দু’জনে পরীক্ষার হলে। মাঝ পথে এসে আবার লাগল ঝামেলা। সৌমি পথে বইয়ের পাতাটা ওল্টাচ্ছে, এমন সময় রোহন বলে উঠল,

‘এই যা ! পেন নিতেই ভুলে গেছি…’

ব্যাস! বাকিটা আশাকরি অনুমান করাই যায়। অবশেষে ব্যাগের সামনের পকেট থেকে দুটো পেন বের করে ছেলেটার হাতে তুলে দেয় মেয়েটা।

তার পরের তিন ঘণ্টা কাটে একেবারে নিস্তব্ধে। তারা দু’জনেই এখন পরীক্ষা হলে।

পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে তারা দু’জনে একে অপরের প্রশ্ন দেখে মিলিয়ে নেয় এবং আলোচনা চলে বেশ জোরদার। এরপর রোহন ঠিক করে এখন সোজা হোস্টেল না গিয়ে একবার গঙ্গার ঘাটে যাবে। সৌমি তাতে আপত্তি জানায় না। সূর্য প্রায় অস্ত যাবে যাবে। একটা ঠান্ডা মৃদু হওয়া শরীরের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে দ্রবীভূত হয়ে সিক্ত করছে দু’জনের মন প্রাণ। এর পর মেয়েটির ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিল ছেলেটির ঘামে ভেজা শরীরে। দু’জনেই এখন নিস্তব্ধ। তারা অনুভব করছে একে অপরের উপস্থিতি। অস্তগামী সূর্য বিদায় নেয়ার অন্তিম লগ্নে রাঙিয়েছে নদীর স্রোতকে। কিছুক্ষণ পর ছেলেটির মোবাইলে বেজে উঠল অঞ্জন দত্ত…

আজ হোক না রং ফ্যাকাশে
তোমার আমার আকাশে
চাঁদের হাসি যতই হোক না ক্লান্ত।
বৃষ্টি নামুক নাই বা নামুক
ঝড় উঠুক নাই বা উঠুক
ফুল ফুটুক নাই বা ফুটুক
আজ বসন্ত…

বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে কাটানোর পর সৌমির যেন হুঁশ ফিরল,

‘চল এবার… কাল অঙ্ক পরীক্ষা তো’
প্রস্তাবটায় একটু ইতস্তত হয়ে অনিচ্ছাকৃত সুরে সম্মতি জানাল ছেলেটা।

রাস্তায় চলার পথে কী যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন সৌমি! রোহন, সৌমির হাল দেখে একটু খোঁচা মেরে বলল, ‘চিন্তা হচ্ছে কালকের জন্য? শ্রীধর আচার্যর সূত্রটা একবার গিয়েই দেখে নিস। ওটা তো বারবার ভুল করিস।’
‘না রে, গত একহপ্তা ধরে থার্ড ইয়ারের সি-সেকশনের ছেলেগুলো খুব বিরক্ত করছে। সামনাসামনি হলে পরেই অকথ্য কথাবার্তা বলে, সে দিন দেখে শিসও দিল।
‘সে কী! তুই বেশি পাত্তা দিস না, তালেই হবে।’

এই ভাবেই কাটল গোটা একটা দিন।

পরের দিন রোহনের ঘুম ভাঙল নিজে থেকেই। উঠেই দেয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে চমকে ওঠে। পরীক্ষা শুরু হতে বাকি মাত্র আর আধ ঘণ্টা…। তার প্রথম প্রশ্ন সৌমি কোথায় ? এমনটা তো কোনও দিন হয় নি। প্রতিদিন পরীক্ষার সকালে তার ঘুম ভাঙে সৌমির ক্যাচক্যাচানিতে। এবার একটু ভয় পেল সে। ঘর থেকে বেরিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগাল সৌমির ঘরের দিকে। সৌমির ঘরের সামনে জমেছে ছেলে-মেয়েদের ভিড়। পুলিশও চোখে পড়ল চার-পাঁচ জন। আর নিতে পারছে না রোহন। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াতেই আঁতকে উঠে দু-পা পিছিয়ে পড়ে সে। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। চোখের দৃষ্টি আবছা হয়ে আসছে তার, কোনও আওয়াজ যেন কান অব্দি এসে পৌঁছাচ্ছে না, মস্তিষ্ক যেন আর সঙ্গ দিচ্ছে না। পিছন থেকে ভিড়ের ধাক্কায় পূর্বাবস্থায় ফেরে সে।

অগোছালো বিছানায় সৌমির নগ্ন নিথর দেহ…. চেয়ে রয়েছে মুক্ত আকাশ পানে। যেন তারই অপেক্ষায় এখনও চোখ বুজতে পারেনি সৌমি। ছেলেটা তাঁর দিকে কম্পিত পায়ে এগোতে, বাধা পড়ল থানার বড়োবাবুর…

‘এগোবেন না, রেপ কেস। গ্যাং রেপ!’

পেছন পেছন ইতিমধ্যে কলেজের প্রিন্সিপাল এসে হাজির। বড়বাবু প্রিন্সিপালকে বলছেন,

‘আপনাদের কলেজে রোহন বলে কেউ পড়ে?’

রোহন উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে এল বড়বাবুর দিকে, ‘বলুন স্যার, আমি রোহন বিশ্বাস।’
‘তোমার জন্য একটা চিঠি আছে বডির কাছ থেকে পাওয়া গেছে।’

 

 

‘বড্ড ভয় করছে রোহন। কেন জানি না। কাল যদি আর না থাকি। মিস করব গঙ্গার ঘাটটা, মিস করব তোকে, মিস করব তোর গন্ধ। আমি তোর মতো এত ভাল কবিতা লিখতে পারি না। তাও আজ লিখতে ইচ্ছা করছে,

‘কালকে যখন আবার আসব মনে।
চেয়ে থেকো ওই নদীর পানে, অসীম শূন্য তীরে।
ঘন কালো মেঘ ভেঙে আজ বৃষ্টি নামবে জোরে।
আমার দেহের যন্ত্রণা সব তোমার ভিতর ভরে।’
কী সব হাবিজাবি লিখছি বলতো!’

কাগজটা দোমড়ানো-মোচড়ানো। লেখাটার উপর বড় করে কাটা দাগ। যেন লিখে সম্পূর্ণটাই বাতিল করেছে মেয়েটি।

পরীক্ষাটা আর দেওয়া হল না রোহনের। সারাদিন ধরে চলল জেরা, চলল অবাঞ্ছিত প্রশ্ন। প্রয়োজনে আবার ডাক আসতে পারে বলে জানানো হয়েছে। বিকেলে আবার এসে বসল গঙ্গার ঘটে। আজও সেই ঠান্ডা হওয়ায় ভিজল তার মন। যেন প্রতি মুহূর্তে সে অনুভব করছে সৌমির উপস্থিতি, অনুভব করছে তার স্পর্শ। আজ সূর্যের সেই মহিমাটাই আর নেই। ঘন কালো মেঘ নদীকে দিয়েছে একটা ধূসর মিশ্রিত কালোর ছোঁয়া। আজ ছেলেটির চোখের জলে ভিজছে গঙ্গা।
আজ আবারও গেয়ে উঠল অসহায় অঞ্জন,

‘একটা ফাটা রেকর্ডের মতো
শুধু একি কথা শুনালাম।
আমি তোমার কাছে আসব
বলে তোমাকেই হারালাম।
শুধু আমার নিজের কথাই
ভেবে গেলাম।

আমি তোমার সাথে অনেক
গুলো দিন কাটিয়েছি
তোমার কথা ভেবে তোমার
হাতটা ধরে রেখেছি
আমরা কি সত্যি
সত্যিই ভালোবেসেছি’

কেটে গেল আরও একটা দিন…!

 

লেখা: অর্পিত চৌরাশিয়া

ফিচার ছবি: অনিন্দিতা সুর


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *