মহামারীর আতঙ্ক, ভয়ডর ঝেড়ে পথে নেমেছিলেন রবীন্দ্রনাথ

বিবিধ ডট ইন: বর্তমানে পুরো বিশ্ব করোনা নামক মারণ ভাইরাসের প্রকোপে জর্জরিত| যদিও এর আগেও বাংলার মানুষ অনেকবার মহামারীর শিকার হয়েছেন| প্রত্যেকবারই রোগের থেকে মানুষের ভয় ছিল অনেক বেশি| সেই ভয় দূর করতে একসময় পথে নেমে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ|

সময়টা ১৮৯৮ থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, ভারতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে প্লেগ| কলকাতায় এর প্রভাব এত বেশি বাড়তে থাকলো,যে মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে| বহু মানুষের পলায়ন, দোকানপাট বন্ধ এবং সেইসঙ্গে শহরে গাড়ি-ঘোড়া না থাকায় ‘মহানগরী’ কলকাতা রাতারাতি পরিত্যক্ত নগরীর রূপ ধারণ করেছিল| এই ভয়াবহতার মধ্যেই মানুষকে সচেতন করতে পথে নেমেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| তাঁকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা|

প্লেগের প্রকোপ অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বাড়ির সকলে মিলে চাঁদা তুলে একটি প্লেগ হাসপাতাল তৈরি করেন| সেখানে ডাক্তার ও নার্সদের আনা হয়েছিল| বাড়ি বাড়ি চুন বিলি করাও হয়েছিল| রবীন্দ্রনাথ সিস্টার নিবেদিতাকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ইনস্পেকশনে যেতেন, এছাড়াও সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতেন|

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে প্লেগ-এর ভয়াবহতা, কারণ এবং সচেতনতা বজায় রাখার বিষয়ে অনেক কিছু লিখেছিলেন| সেই সময় জগদীশচন্দ্র বসুও প্লেগের আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান| কারণ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লেখেন- তাঁর ভৃত্য ছুটি নিয়ে বড়বাজারে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফেরার পরেই সে প্লেগে আক্রান্ত হয় এবং ৩০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়|

এমনকি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও প্লেগের প্রকোপ দেখা দেয়| সেই সময়ই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বছর দশেকের মেয়ে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়| এরপরই ঠাকুর পরিবারের সবাই চৌরঙ্গীর একটি বাড়িতে চলে যান| সেখানেই অবনীন্দ্রনাথ মেয়ের শোকে কাতর হয়ে ‘শাহজাহানের মৃত্যু’র ছবিটি আঁকেন| তাঁর সমস্ত বেদনা, কষ্ট সেই ছবিতে ফুটে উঠেছিল|

বেশ কিছু সময় পর ব্রিটিশ সরকার প্লেগের জন্য টিকাকরণের ব্যবস্থা করেন| কিন্তু সাধারণ মানুষের ভীতি ও সেই সঙ্গে তীব্র ইংরেজ-বিদ্বেষ এবং নানা কারণে তারা কেউ টিকা নিতে রাজি ছিলেন না|

রামকৃষ্ণ মিশন টিকা নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিলি করলে সাধারণ মানুষ তাদের উপরও আক্রমণ করে| স্বামী বিবেকানন্দ সেইসময় কলকাতা ফেরেন, তাঁর ব্যাগে টিকা আছে এই সন্দেহে সাধারণ মানুষ তাঁর উপরও আক্রমণ করেন| এমন সময় মানুষকে সচেতন করার জন্য রবীন্দ্রনাথ উদ্যোগ নেন|

শুধুমাত্র প্লেগ নয়, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারীতেও সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এসেছিলেন| ১৯১৫ সালে যখন কলেরা মহামারী আকার ধারণ করে, তখন রবীন্দ্রনাথের পুত্র শমীন্দ্রনাথ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়| শোকে-দুঃখেও রবীন্দ্রনাথ কখনো কলম ছাড়েননি| সেইসময় ‘ওলাউঠার বিস্তার’ নামক প্রবন্ধে কলেরা সম্বন্ধে অনেক কিছু লেখেন তিনি| এরপর ‘গোরা’,’দুর্বুদ্ধি’,’দিদি’- তাঁর সমস্ত লেখাতেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা লেখা আছে|
এর কয়েক বছর পরে ইনফ্লুয়েঞ্জা মারাত্মক আকার নেয়| সেই সময় তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন| ফ্লু যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তার জন্য তিনি ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’ তৈরি করেন| এই পাঁচন ছিল নিম,বাসক,গুলঞ্চ,পলতা ও কন্টিকারির মিশ্রণ| শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন এই পাঁচন তিনি প্রায় দুশো লোককে খাইয়েছিলেন| আর তারা সবাই ফ্লু’র প্রকোপ থেকে রক্ষা পেয়েছিল|

‘দেশনায়ক’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,”দুর্ভিক্ষ, মহামারী সবই উপলক্ষমাত্র| আসল রোগ দেশের মধ্যে অনেক আগেই প্রবেশ করেছে|” সমগ্র পৃথিবী তখনই সুন্দর হয়ে উঠবে, যখন মানুষ রোগের মূল উৎস খুঁজে বের করতে পারবে, আর সকলে মিলে তা নিরাময়ের চেষ্টা করবে|

লিখেছেন পারমিতা মুখোপাধ্যায়

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: