সুনীলদের ‘প্রথম যৌবনের অ্যারিস্টটল’ কমলকুমার

বিবিধ ডট ইন: কমলকুমারকে ঘিরে ভিড় জমান ফরাসি ভাষা শিখতে উৎসাহী যুবক-যুবতীরা। একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও আবদার জুড়লেন ফরাসি শিখবেন।

কমলকুমারের লেখা বাংলা গদ্য নেহাত সহজ নয়। কিন্তু তাঁর মুখের গদ্য ছিল খাঁটি কলকাতার চলতি ভাষায় গড়া। সুনীল তাঁকে বলেছেন ‘কলকাতার ককনিও’।

কোনও এক তরুণ কবিকে কমলকুমার ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, “কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না বুঝলে! পভর পোয়েত ব্রাভাইয়ো।”

হাতে সবসময় থাকতো ফরাসি ক্লাসিক। স্থান-কাল ভুলে সেই বই’এ মুখ গুঁজে বসে পড়তেন আবার প্রয়োজনে সেই বই-ই হয়ে যেত তাঁর মানিব্যাগ। পাতার খাঁজে খাঁজে রাখা থাকতো নোট। রেস্তোরাঁয় কিংবা পানশালায় টাকা দিতেন বইয়ের পাতা ঘেঁটে।

ইংরেজদের বিশেষ পছন্দ করতেন না তিনি, ইংরেজ-মনস্ক বাঙালিরা ছিল তাঁর উপহাসের পাত্র। ফরাসি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। সংস্কৃত টোলে পড়াশোনা করা, তারপর ওস্তাদের কাছে সেতারে তালিম নেওয়া মানুষটা একদিকে অত্যন্ত ভারতীয় আর্য, অন্যদিকে ফরাসি সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী।

ফরাসি ভাষা চুম্বকের মতো টানে তাকে। তিনি কলেজ স্ট্রিট বা ওয়েলিংটন মোড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আলোচনা করতে পারেন সাহিত্য-দর্শন নিয়ে। সঙ্গে গিরিশচন্দ্র, অর্ধেন্দুশেখর, শিশির ভাদুড়ির মতো গণ্যমান্য মানুষদের সম্পর্কে বিবিধ গল্প। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, বলিষ্ঠ চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা চুল।

অথচ এই মানুষটি কোনওদিন পা রাখেননি দেশের বাইরে। চাইলেই যেতে পারতেন। তাঁর ভাই শিল্পী নীরদ মজুমদারই দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ফ্রান্সে। কিন্তু কমলকুমারের ইচ্ছেই হয়নি বিদেশ যাওয়ার। সুনীল লিখছেন, কেউ যদি বিদেশ থেকে ফিরে বেশি সাহেবিপনা দেখাত, তাহলে হেসে ফেলতেন কমলকুমার। হাসতে হাসতেই বলতেন, “আমার বাবার বাবার বাবার বাবা হাফ প্যান্টুল পরে বিলেত গেসলো বুঝলে!” বিদেশ থেকে অনেক পণ্ডিত-জ্ঞানী-গুণী মানুষরা কলকাতায় এলে তাঁর খোঁজ করতেন।

অবশেষে কমলকুমার রাজি হলেন সুনীলকে ফরাসি শেখাতে। শর্ত দিয়েছিলেন দু’খানা—এক, মাইনে দিতে হবে মাসে একটাকা আর তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে অন্যদের কাছে একটাও ফরাসি বাক্য উচ্চারণ করা যাবে না। শিক্ষার লোভে তাতেই রাজি হন সুনীল। উত্তর কলকাতার গ্রে স্ট্রিটে আশুতোষ ঘোষের বাড়িতে সপ্তাহে দু’দিন দুপুরে বসত ফরাসি ক্লাস। সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। শিক্ষক কমলকুমার অত্যন্ত কঠোর, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে শব্দরূপ-ধাতুরূপ মুখস্ত করতে হত। সেই অত্যাচারে মাত্র মাস দুয়েকের মধ্যেই ফরাসি শেখার মোহ ছাড়লেন সুনীল। কিন্তু কমলকুমারের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়নি। কমলকুমার তাঁর ‘মোশন-মাস্টার’। তাঁরই নির্দেশনায় সুকুমার আর রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ করেছেন সুনীল-শক্তি। সুনীল বলতেন- “কমলকুমার আমাদের প্রথম যৌবনের অ্যারিস্টটল।”

লিখেছেন মধুমিতা সিনহা

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: