নিজের লেখা কবিতা পছন্দ হতো না সুনীলের!

বিবিধ ডট ইন: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দেশ ভাগের আগে তাঁরা কলকাতায় চলে আসেন। বাবা কলকাতায় শিক্ষকতা করতেন। জীবনে প্রাচুর্য, বিলাসিতা তেমন ছিল না।

তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরুটা হয়েছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে। বাবার কড়াকড়ি ছিল প্রচণ্ড। টেনিসনের কালেকটেড ওয়ার্কস থেকে প্রতিদিন দু’টি করে কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে বাবাকে দেখানো ছিল তাঁর প্রধান কাজ। প্রথমদিকে ডিকশনারি দেখে বেশ কষ্ট করে অনুবাদ করতেন। সেইখান থেকেই বানিয়ে কবিতা লেখা শুরু। ইতিমধ্যেই তিনি একটি মেয়ের প্রেমে পড়েন। তাঁর জন্য একটি কবিতা লিখেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘একটি চিঠি’। যথারীতি লেখাটা দেশ পত্রিকায় পাঠালেন। চারমাস পরে পাল্টা একটি চিঠি এলো, দেশ পত্রিকার একটি কপি। তাঁর কবিতাটি ছাপা হয়েছে। ‘একটি চিঠি’ ছিল তাঁর প্রথম কবিতা। যদিও সেই কবিতা কোনো বইয়ে রাখেননি কারণ তিনি জানিয়েছেন পরে সেই কবিতাটি তাঁর দুর্বল বলে মনে হয়েছে।

তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতা বের হয় অগ্রণী ও শতভিষা’য়। বুদ্ধদের বসুর বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর চতুর্থ কবিতা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে আবু সৈয়দ আইয়ুবের সংকলিত ‘পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা’ বইয়ে স্থান পেয়েছিলো তাঁর কবিতা। বিজ্ঞাপনে লেখা হত ‘রবীন্দ্রনাথ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত’। দেখে বেশ আনন্দ পেতেন।

বই পড়ার অভ্যাসটা তিনি তাঁর মায়ের থেকে পেয়েছেন। মায়ের বই পড়া হয়ে গেলে বইটি ফেরত দেওয়ার আগে, তিনি নিজে একবার পড়ে ফেলতেন। তার কোনো বাছবিচার ছিল না। যে বই পেতেন সে বই’ই পড়ে ফেলতেন।

নিজের লেখা কোনো প্রিয় কবিতা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলে, উত্তর এসেছে- নিজের লেখা কোন কবিতাই তাঁর প্রিয় নয়। কোন লেখা লিখেই তিনি সম্পূর্ণভাবে তৃপ্তি পাননি।

রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা প্রবন্ধ তিনি ভালোবাসতেন। জীবনানন্দ দাশ, নজরুলের লেখাও তিনি পড়তেন। তাঁর একটা কবিতার লাইন আছে : ‘তিনজোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে’।

তিনি রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন না। তবে এই কবিতার পেছনে একটি কারণ ছিল। তাঁর বন্ধু ছিলেন তারাপদ রায়। মাঝেমধ্যে রাতে সুনীল যখন তাঁর বাড়িতে থেকে যেতেন তখন দেখতেন চারিদিকে রবীন্দ্ররচনাবলী ছড়ানো। এই প্রসঙ্গে তিনি ওই লাইন দুটি রচনা করেছিলেন।

প্রথম দিকে তিনি নজরুলের বিরোধী ছিলেন। পরে তাকেই আবার পথিকৃত বলে অভিহিত করেছেন। নজরুল বিদ্রোহের কবি, সাম্যবাদের কবি রূপে খ্যাত। তবে নজরুল অজস্র প্রেমের কবিতা, প্রেম নিয়ে গান ও গজল লিখেছেন। সুনীলের মতে, নজরুল প্রেমিক কবি হিসেবে অনেক বেশি সার্থক।

কবি হিসেবে সুনীল, রবীন্দ্রনাথের থেকে জীবনানন্দ দাশকে অনেক উপরে জায়গা করে দিয়েছেন। প্রকৃতির যেরূপ তা জীবনানন্দের কবিতায় জীবন্ত। তিনি দস্তয়ভস্কির লেখা পড়তেন। একই লেখা বহুবার পড়েছেন। প্রতিবারই মুগ্ধ হয়েছেন। ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’ বইটা তাঁর কাছে মনে হয়েছে বেদের মতো অবশ্যপাঠ্য। বেদ যেমন হিন্দুদের জন্য, ওই বইটা ঠিক তেমনই ভক্তির ছিল তাঁর জন্য।

মানুষের জীবনে প্রথম প্রেমের স্থান কোথায় জানতে চাওয়ায় তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “সে প্রেম যদি সত্যি কারের হয় তবে মানুষ তা ভুলতে পারেনা। তিনি নিজেও ভুলতে পারেননি তাঁর প্রথম প্রেমিকাকে। উদাহরনে, রবীন্দ্রনাথের কথা বলেছেন-“তিনি তার বৌদি কাদম্বরী দেবীর প্রেমে পড়েন। তেইশ বছর বয়স যখন রবীন্দ্রনাথের, তখন কাদম্বরী দেবী মারা যান। তবু রবীন্দ্রনাথ সত্তর বছর বয়সেও তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখেন। তার নাম চলে আসে কবিতায়। বিভিন্নভাবে মোট সাতখানা বই উনি উৎসর্গ করেছিলেন কাদম্বরী দেবীর নামে। প্রথম প্রেমটা কি স্ট্রং তাঁর জীবনে।”

তাঁর কী রং পছন্দ জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, “নীল রং পছন্দ। নাম সুনীল বলে নয়। নীল রংটা আমার পছন্দ, নামটা কিন্তু নয়।”

লিখেছেন মধুমিতা সিনহা

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: