পুরুলিয়া: একটা শীতের দুঃস্বপ্ন

এখনই শেয়ার করুন

প্রথমেই বলে রাখি, এটা লিখতে বসে মনে হয়েছিল, আমি ট্র্যাভেল ব্লগ লিখতে পারব না। কারণ ট্রাভেল ব্লগ ব্যাপারটাই বেশ ইন্টারেস্টিং একটা জিনিস। তবে যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, সেটুকুই না হয় আড্ডার ছলে বলি! আজকের বিষয় ‘পুরুলিয়া’। তবে পুরুলিয়া বলতে চোখের সামনে যে প্রচলিত দৃশ্য উঠে আসে, সেগুলো নয়। বরং আজ পুরুলিয়ায় অন্য এক অভিজ্ঞতার কথা বলা যাক! (পুরুলিয়া: একটা শীতের দুঃস্বপ্ন)

আরও পড়ুন: কাটাকুটি খেলা: সব চরিত্র কাল্পনিক

পুরুলিয়া যারা ঘুরতে আসে তারা প্রায় প্রত্যেকেই ট্রেন অথবা গাড়ি কিংবা বাসপথ পছন্দ করে। পুরুলিয়া অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মার্বেল লেক। এই লেকের সৌন্দর্য সত্যি মনোরম। পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর এক উপত্যকা। প্রচুর মানুষ ভিড় করেছে। কিন্তু বাঙালি সর্বদা অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়। তাই আমরা চললাম লেকের সামনে থাকা পাহাড়ের ওপরে।

খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। সহজেই সামনের পাহাড়ে উঠে গেলাম। বাঁ পাশ থেকে পাহাড়ের ওপরের দিকে আরও উচুঁতে যাওয়ার রাস্তা যেটা আছে, সেটা মনে হয় অনেকেই জানেন না। কিংবা জানলেও ওঠার সাহস থাকে না। আমি আর দু’জন ছাড়া বাকি পাঁচজন পাহাড়ি খাড়াই রাস্তা পেরিয়ে মার্বেল লেকের সামনে পাহাড়ের চূড়ায় উঠি অল্প সময়ের মধ্যেই। চূড়া থেকে সমগ্র পাহাড়ে ঘেরা মার্বেল লেক যেন এক টুকরো স্বর্গ! অসাধারণ সুন্দর বললেও কম বলা হবে এই দৃশ্য। জীবনের প্রতিটা শৃঙ্গ আমরা চেষ্টা করি এভাবেই জয় করতে।

আরও পড়ুন: ভূত আর রূপম! যুক্তিবাদে ভর করেই পূজাবার্ষিকী-র দ্বিতীয় গল্প শোনালেন গায়ক

পুরুলিয়া থেকে ফেরার কোনও টিকিট আমরা করিনি। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, কবে ফিরব। শুরুতে বাসে ফেরার কথা থাকলেও পরে ট্রেনে সিলমোহর পরে। ট্রেনের সময় ভোর ৫:৩০। পুরুলিয়া স্টেশন থেকে প্রায় ৬৪কিমি দূরে আমরা বড়াভূমে ছিলাম। তাই ভোর ৫:৩০ পুরুলিয়ায় ট্রেন ধরতে গেলে অন্তত রাত ২:৩০ নাগাদ বেরোতে হবে। কারণ রাস্তা ভীষণ খারাপ। তার ওপর কুয়াশা তো আছেই। প্রশ্ন হচ্ছে এত রিস্ক নিয়ে কি কেউ আসে? আসে আসে। কিছুজন তো আসে আর সঙ্গে যদি বিজয়দার মতো চালক থাকে, তাহলে আসাই যায়।

ব্যাগ, লাগেজ রেডি। ঘড়ি বলছে রাত ২:৩০। আকাশে চাঁদের আলো তখনও হোটেলের সামনের প্যাসেজ ভরিয়ে রেখেছে। আর শীতের ঝাঁকুনি বারবার গলায় ছুরি চালিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি এল। লাগেজ তুলে দেওয়ার পরেই যাত্রা শুরু। চোখটা প্রায় সকলের লেগে যাচ্ছে ২০-৩০ মিনিট চলেও এসেছি। এমন সময় হঠাৎ খেয়াল পড়ল আমাদের বন্ধু মনো ব্যাগসহ তিনহাজার টাকা ফেলে চলে এসেছে হোটেলের রুমে। অগত্যা গাড়ি ঘুরিয়ে আবার হোটেলে।

শীতের রাতে খারাপ রাস্তার মধ্যে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব হোটেলে পৌঁছে দেখা গেল টেবিলের নীচে টাকাসহ ব্যাগ পড়ে আছে। আবার যাত্রা শুরু। টাকা তো পাওয়া গেল। কিন্তু ট্রেন পাওয়া যাবে তো?

আরও পড়ুন: হাথরস টু বলরামপুর: বেকারত্বের দোহাই দেওয়া ইস্তাহার!

ঘড়ি বলছে ৩টে প্রায় বাজে। যেতে অন্তত ২ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। গাড়িতে আমি, সোমনাথ,হিমন আর ড্রাইভার বিজয়দা ছাড়া প্রায় সকলেই একপ্রকার ঢুলছে। আমার সারাজীবন আফসোস থাকবে এই মধ্যরাতে পাহাড়ের মধ্যে ৬০কিমি বেগে গাড়ি চালানোর কোনও ভিডিও আমার কাছে নেই। মাথার মধ্যে দুশ্চিন্তা। রাতে এদিকে হাতির দল বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে আবার কুয়াশা। ওদিকে ৫:৩০-এর ট্রেন ধরতে হবে।

অযোধ্যার চড়াই উতরাই পেরিয়ে গাড়ি ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছে। আমার ফোনে একবার হোয়াটসঅ্যাপ, একবার গুগল ম্যাপ। রাস্তায় বুনো খরগোশ আর শিয়াল ছাড়া আর কিছু দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনওটাই হল না। পাহাড়ি বাঁকের রাস্তায় নিপুণ হাতে একের পর এক বাঁক কাটিয়ে যখন বিজয় দা বলল, আর ১৫মিনিট। তখন ঘড়িতে ৫টা বাজতে ২০মিনিট বাকি আছে। শান্তির নিশ্বাস। চাঁদের আলো তখন ম্লান হয়ে গেছে নতুন দিনের শুরুতে। ৫টা বাজতে ৫মিনিট বাকি। চোখের সামনে লাল হরফে বড় বড় অক্ষরে লেখা পুরুলিয়া জংশন। ট্রেন সময় ৫:৩০। রাত পেরিয়ে ভোর হল। আমরাও যে যার রওনা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বলা বাহুল্য, বিজয়দা ওই রাস্তায় দীর্ঘদিন গাড়ি চালায়। তাই তার কাছে হয়তো এটা বড় কোনও ব্যাপার নয়। কিন্তু মধ্যরাতে কুয়াশার মধ্যে মাথায় ট্রেন ধরার তাড়া নিয়ে এরকম একটা রাত্রিযাপন স্মৃতি থেকে সহজে মোছার নয় বোধহয়।

আরও পড়ুন: ব্লগ: মৃত্যুর ওপারে প্রেম

পুরুলিয়া: একটা শীতের দুঃস্বপ্ন লিখলেন দেবজিৎ আদক।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।