রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’: অরিঘ্ন মিত্র

খোদ তিমির বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, ‘প্রথম নয়। বরং এককে প্রত্যাবর্তন আমার।’ ১১ অক্টোবরের সেই অনুষ্ঠান নিয়েই ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’ লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র।

তিমির বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘একক আন্দোলনের বিভাগে আমিও সামিল হলাম। তবে আমার এই একক-রাজ্য আমি আমার অন্তরের অধিবাসীদের কথামতোই গড়ব। ঠিক সেই কারণেই আমার ‘একক’ আত্মপ্রকাশ একদমই আমার মতোই হবে— ইন্টিমেট! এর গন্ধ স্বাদ সবটাই আমার রান্নাঘরের রান্নার মতো হবে!’
এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তিমির বিশ্বাসের রান্নাঘরে যাওয়ার একটা অদৃশ্য হাতছানি বাংলা গানের দর্শকদের সামনে এসেছিল। তিমির এক এক করে তাঁর রান্নাঘরে কী, কী রান্না হবে তার তালিকা প্রকাশ করেছিলেন, উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে কৌতূহলও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছিল দর্শক-মনে। তিমিরের রান্নাঘরে কী এমন গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে! তাঁর ঘরোয়া রান্নার স্বাদই বা কেমন? অপেক্ষার অবসানের পর ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনি তাঁর দুয়ার খুললেন, হুড়মুড়িয়ে কৌতূহলী মানুষ ভিড় জমালেন তাঁর রন্ধনশালায়। তিমির সবার সামনে তখন শান্ত বাবুর্চি, যিনি তাঁর লুকিয়ে রাখা রন্ধনপ্রণালীর কথা বলা এবং রান্না— দুই-ই করবেন ‘তিমির, দুয়ার খোলো’ নামের এক বৈঠকী ডিজিটাল আড্ডাখানায়।

তিমির যেমনটা বলেছিলেন, ঠিক সেরকমই.. অন্তরের অধিবাসীদের নরম হৃদয়ের সুর ছুঁয়ে নিজের স্বয়ংক্রিয় মেজাজে তাঁর গানের অনুষ্ঠান সাজালেন। যাঁরা সেই রন্ধনশালায় ঢুকেছিলেন, তাঁদের পাতে একের পর এক ভিন্নভিন্ন, নানারকমের স্বাদের রসদ সাজিয়ে দিলেন কুড়ি-একুশটা গানে। তবে তিমির যেভাবে সাজিয়ে দিলেন তাতে অবশ্য অন্তত আমি নিজে কোনটা স্টার্টার, মেইনকোর্স, এমনকী, ডেজার্ট— তা আলাদা করে বুঝে উঠতে পারিনি। প্রত্যেকটা গানে, গল্পে ছিল এমন কিছু চমক যে, অনুষ্ঠানের পিক টাইম বেছে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। দর্শক হিসেবে হাঁ করে গিলতে হয়েছে তাঁর যত্ন করে তৈরি করা এক একটি পদ। (ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’)

যদিও তিমির এই প্রথম এককভাবে অনুষ্ঠান করেননি, তাঁর জীবনের প্রথমদিকের মঞ্চ গুলোয় তিনি একাই কাটিয়েছেন কখনও গিটার কিংবা কি-বোর্ড নিয়ে। তাই তিমির এই প্রথম একক নাম নিয়ে অনুষ্ঠান করলেও তিনি নিজেই বলছেন এটা তাঁর ‘একক-এ ফেরা’। তিনি বলেছিলেন, তাঁর অনুষ্ঠান হবে একদম তাঁরই মতো ইন্টিমেট! সত্যিই তা-ই। তাঁর একক তাঁরই মতো তিমিরের মধ্যে জ্বলতে থাকা একটা শান্ত কিন্তু তেজি প্রদীপের শিখা, একটা নিঝুম রাতে দূর থেকে ভেসে আসা সুর। যেখানে তাঁর জীবনযাপনের গল্পগুলো মিশে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। সেই ক্লান্ত রাতে তাঁর প্রদীপের শিখা থেকে দর্শকদের ঘরে ঘরে নীল লাল আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। একটি অনুষ্ঠান কিন্তু সেটার বিভিন্ন রূপ। কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে না থেকে প্রতি মুহূর্তে বেড়া ভেঙে দিচ্ছেন। নিজেই তৈরি করছেন তাঁর সীমা আবার পরক্ষণেই সেটা ভাঙছেন। তাঁর রান্নাঘর থেকে বেরোল লালন সাঁই থেকে অন্যান্য লোকগান, রবীন্দ্রসংগীত, কিশোর কুমার, বাংলা আধুনিক, বাংলা ছায়াছবির গান, কিছু অপ্রকাশিত গান, পুরোনো দল মিউজিক স্ট্রিটের গান, থিয়েটারের গান। বাংলা গানের বিশাল পরিধি তাঁর শিল্পী সত্তাকে বিকশিত করেছে। বোঝাই গেল তিমির কোনওদিন কোনও একটি বিশেষ ঘরানায় আটকে যাননি। তাই তাঁর এককেও একই অঙ্গ থেকে বেরিয়ে এল এতগুলো রূপ! তাঁর এই বিশাল গানের পরিসরে তাঁর সঙ্গীত যাপনের সীমাগুলোর দিগন্ত বিস্তৃত, স্বাভাবিকভাবেই সেই গানগুলির বিভিন্ন দিকের আয়নায় তিমির নিজেকে দেখেছেন, শুনেছেন আর সেই গল্পগুলোই এককে সবার সামনে সাজিয়ে ধরলেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, প্রাথমিক জীবনে কোনও বাধার সম্মুখীন না হলে কোনো ব্যক্তিই যেন ভেতর থেকে দৃঢ় হয়না। রূপম ইসলাম বলেন, জীবনে বড় হতে গেলে রিজেকশন পাওয়া খুব জরুরি। তিমির বিশ্বাসের জীবনেও প্রাথমিক রিজেকশন ছিল.. ‘গান গাওয়ার উপযুক্ত গলা নয়’ বলে কম কথা শুনতে হয়নি তিমিরকে! এই প্রত্যাখ্যান এবং একইসঙ্গে বড় হওয়া ইচ্ছে, চাওয়া, স্বপ্নগুলোই তাঁর ভেতরে একটা খিদে তৈরি করে। পরবর্তীকালে সেই খিদেই আজকের তিমিরকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে কখনও প্লে ব্যাক সিঙ্গার, ব্যান্ড ‘মিউজিক স্ট্রিট’ কিংবা ‘ফকিরা’র মাধ্যমে।  (ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’)

ছোটবেলার বড় হয়ে ওঠার সময় দূরদর্শনে গানের সঙ্গে পরিচয়, পাশাপাশি রবি ঠাকুরের গানের সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা আসানসোল থেকে কদমখালির লালন মেলায় গিয়ে লোকগানের চর্চা শুরু হওয়া। ছোটবেলায় গান গাওয়ার একটা বিরতির পর কলেজজীবনে কী করে তাঁর কথায় ‘সুস্থ র‍্যাগিং’-এর ঠেলায় পরে আবার গান গাওয়া শুরু হয়। কোনওদিন প্রকাশ্যে না আসা সেই বৃত্তান্ত, আবার কিছু প্রকাশ্যে আসা গল্পই নতুনভাবে গানের সঙ্গে জড়িয়ে দিলেন তিমির তাঁর এককে। এই অনুষ্ঠানের মূল ভাবটাই যেন ছিল একজন শিল্পীর জীবনে প্রত্যেক ধারার গানের ভাব কীভাবে জড়িয়ে যায়, তা যেন অনুভব করতে চাওয়া।

তবে শুধু কি নিজের গল্পই বলেছেন তিমির? যে চেতনার মাধ্যমে এই পৃথিবীতে সুর তৈরি হয়, আর সেই সুরে বেঁচে থাকা মানুষের কথা বলেননি তিনি? বলেছেন। নিজের থেকে বেরিয়ে গিয়ে কখনও কখনও তাঁর গল্পগুলোও অন্যান্য অনেক মানুষের সঙ্গে এই সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন। এই অস্থির সময়ের নানা বিক্ষোভ, আন্দোলনের মধ্যে মানুষের মধ্যে ক্ষয়িষ্ণু ভালোবাসায় সতেজ গোলাপ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, বলেছেন সবাইকে ভালোবাসতে। সত্যিই তো এত ঘৃণা, বিদ্বেষের মধ্যে আমরা যদি একটু ভালোবাসতে পারি, তাহলে একটা শান্তি আমাদের মধ্যে তো আসতেই পারে। তিমির বোধহয় সবসময় সবাইকেই ভালোবাসতে চান তাই হয়তো অনুষ্ঠানের মধ্যে তিনি বললেন, ‘আমার গান সবার জন্য। যে আমার সমালোচনা করে, আমায় ঘৃণা করে, তাঁর জন্যেও এবং যে আমায় ভালোবাসে তাঁর জন্যেও।’ মানুষকে ভালোবাসেন বলেই তাঁর ব্যান্ড ফকিরার বন্ধুদের নিয়ে তৈরি হওয়া দলের নাম ব্যান্ডের নামে রাখেননি, রেখেছেন ‘সহজ মানুষ’। সেই জন্যই তিনি যখন গান গাইলেন প্রত্যেকটা গানের ভাবের মধ্যে দিয়ে যেন এক মুঠো রঙীন রংধনুর রঙে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলেন, শান্ত শীতল বৃষ্টির ধারা মনের মধ্যে নামিয়ে আনলেন। বিশেষ করে যখন রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায় আপন মনে চোখটা বুজে এল, বন্ধ চোখের আবছা তিমিরে যেন এক উজ্জ্বল তিমিরকে অনুভব করতে পারা গেল। যখন চোখ খুলি, তখন দেখি দর্শকাশন থেকে অনেকেই সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি আলাদা করে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছেন। সত্যিই তিমির কী অদ্ভুত ভাবে ছুঁয়ে গেলেন সবাইকে! শুধু কি রবীন্দ্রসঙ্গীত? লোকগান, নিজের লেখা গান, মিউজিক স্ট্রিটের গান, যখন যেটা গেয়েছেন এক অদ্ভুত মায়াবী নিস্তব্ধতায় রূপকথার নগরী তৈরি করেছেন।  (ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’)

তিমির নিজে অনেকসময়ই তাঁর গান লেখার অনুপ্রেরণায় নচিকেতা চক্রবর্তী, রূপম ইসলামের কথা বলেছেন। জানিয়েছেন তাঁদের গান শুনে তাঁরও কীভাবে ভাষা তৈরি হয়েছে, গান লিখতে চেয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে একক অনুষ্ঠানে তা উল্লেখ করলেন। এছাড়াও কীভাবে নচিকেতা এবং রূপমের স্নেহাশিস পেয়েছেন, সেই ঘটনা, তাঁদের সঙ্গে কখনও মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার অনুপ্রেরণা। কিন্তু তাই বলে তাঁর নিজের একক অনুষ্ঠানে তাঁদের গান গাইবেন এটা কি কেউ ভাবতে পারবেন? তিমির গাইলেন তাঁদের গান। শুধু গাইলেনই না, রীতিমতো চমকে দিলেন। সচরাচর নিজের অনুষ্ঠানে নিজের পর্যাপ্ত গান থাকা সত্ত্বেও সমসাময়িক শিল্পীদের গান গাইতে খুব একটা কাউকে দেখা যায় না। তবে ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, তিমির নিজেকে বেঁধে রাখতে জানেন না, ভেঙে দিয়েছেন যেকোনও গণ্ডি। তাই হয়তো গেয়ে ফেললেন। নচিকেতার জনপ্রিয় সৃষ্টি ‘অনির্বাণ’ যে গভীরতায় অনুভব করে গাইলেন, গানের ভাবকে এমন ভাবে ছুঁয়ে গেলেন, আমার মনে হয়, খোদ নচিকেতা সেটা যদি শুনতেন, তাহলে অবাক হতেন, হয়তো নিজের থেকেও বেশি মার্কস দিয়ে ফেলতেন তিমিরের এই গায়কীর জন্য। পাশাপাশি একইভাবে সিমিলার কর্ড প্রোগ্রেসনে রূপমের ‘বিষাক্ত মানুষ’ এবং ‘মহানিষ্ক্রমণ’-এর যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে ফেললেন সেটা শুধু অপ্রত্যাশিতই নয়, চমকপ্রদ এবং অভিনব। দর্শকদের অনেক অনুরোধ ভেসে এল তাঁর পুরোনো গানের জন্য, কিছু গাইলেন, কিছু জমিয়ে রাখলেন পরের কোনও একটা সন্ধের জন্য।

‘ফড়িং’ সিনেমায় তাঁর গাওয়া গান দিয়ে শুরু করে নিজের গান দিয়ে শেষ হল তাঁর অনুষ্ঠান। একটা সুন্দর সুদৃশ্য যাত্রাপথে দর্শকদের নিযে গেলেন তাঁর অচিনপুরে, অন্তরের অধিবাসীদের কাছে। এই যাত্রাপথে যেকোনও সময়, যখন তখন বিভিন্ন দিকে নিয়ে গেলেন, তাঁর গল্পগুলো বলতে বলতে যেভাবে যেরকম গান এল তাই গাইলেন। লোকগান গাইলেন আবার তারপরেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন, পরক্ষণেই কিশোর কুমার, বাংলা আধুনিক, সিনেমার গান-এর ‘এলোমেলো’ কোলাজ দিয়ে সাজালেন। কিন্তু এলোমেলো মনে হল না, একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল সেগুলোর মধ্যে, যে জার্নি সবাই উপভোগ করলেন উইন্ডো সিটে বসে খোলা বাতাসের সবুজ পৃথিবী দেখতে দেখতে। শেষ স্টপেজে এসে বোঝা গেল তাঁর অন্তরেও একটা আন্দোলন প্রতিরোধ রয়েছে। যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানবপ্রেম, ভালোবাসার সুর।

তিমির চেয়েছিলেন, তাঁর শান্ত স্বভাবেই সকল দর্শকশ্রোতার মনকে আচ্ছন্ন করে রাখতে, ঘোর তিমিরেও যে উষ্ণ প্রেম আর অ্যাডভেঞ্চার থাকে, সেটার কাছাকাছি নিয়ে যেতে, ভালবাসতে। তিনি পেরেছেন তাঁর রান্নাঘর থেকে নিজস্ব প্রণালীতে একদম নিজের মতো স্বতন্ত্রী একটা একক অনুষ্ঠান তৈরি করে সবাইকে যত্ন করে পরিবেশন করতে, তাঁর ঘরোয়া আড্ডার স্বাদ পৌঁছে দিতে।

তিমির বলেছিলেন, একক শব্দটার এখন গুরুত্ব বাড়িয়েছেন রূপম ইসলাম, অঞ্জন দত্তের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা। তিমির বিশ্বাস ‘একক’ নাম নিয়ে তাঁর মতো করে এই আন্দোলন শুরু করলেন। এ কথা ঠিক রূপম যেভাবে গানের মাধ্যমে আন্দোলন করেছেন তাঁর ‘একক’ কথায়, ঠিক সেই পথেরই পথিক হয়ে যেন তিমির হাত ধরাধরি করে বাংলা গানকে নিয়ে একটি স্বাধীন, স্বয়ংক্রিয় পথে হাঁটতে শুরু করলেন। তিমির নিজেই বলেছেন, এই অনুষ্ঠান তাঁর একক অনুষ্ঠানের ইন্ট্রোডাকশন ছিল। তাহলে কি আসল গল্প এখনও শুরুই হয়নি? তিমির কি তাহলে ধীরে ধীরে খুলবেন সেই গল্পের ঝুলি? কী ভাবছেন শিল্পী?
… তিমির, আপনি আপনার দুয়ার ধারাবাহিকভাবে খুলবেন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *