রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড’— অরিঘ্ন মিত্র

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন-এর ভক্তের চোখে কলামে ‘দ্য বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড’ ডিজিটাল কনসার্ট নিয়ে লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র

নয়ের দশকের গোড়ার দিক। ভারতবর্ষের বন্ধ অর্থনীতির দরজা ধীরে ধীরে খুলছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে ১০টা-পাঁচটার অফিস যাত্রীদের ভিড়, কোথাও বা ফিকে হয়ে যাচ্ছে কোনও কলকারখানার চেনা ভিড়। আমাদের শহর কলকাতা যেন ঘ্যানঘ্যানে একঘেয়ে সুরে কেঁদে চলেছে, শহরের গায়ে কেউ মিথ্যে কথার চাদর চাপিয়ে দিচ্ছে । শহরের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই হারিয়ে যাচ্ছে রোজ।

সেই একঘেয়েমি সুরের মধ্যেই গলা চিরে গান গেয়ে কেউ কেউ সেই বেঁচে থাকার লড়াই ফিরিয়ে দিচ্ছেন মানুষকে। ক্লান্ত জীবনে একটু আনন্দ, একটু ভালবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে একজন কবীর সুমন। গিটার হাতে আধুনিক কবিয়াল হয়ে জীবনের গান গেয়েছিলেন, বাংলা গানকে একটা নতুন আঙ্গিক দিয়েছিলেন। সেই নতুন আঙ্গিকের ওপর ভর করে অনেকেই নিজেদের কথা সুরে বলতে চেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অবশ্যই একজন অঞ্জন দত্ত। যদিও তিনি শুধু ওই শহর কলকাতার ভ্যাপসা গরমের গল্পই বলেননি। বলেছেন একটা শীত, হেমন্ত, বসন্ত, ডিসেম্বরের কথাও। তিনি আমাদের সামনে একটা ক্যানভাস নিয়ে আসেন। তাতে এঁকে দেন পাহাড়ের ছবি। পাহাড়ি মানুষের মন ঠিক যেমনটা রঙিন হয়, হাসিটা ঠিক যতটা সুরেলা হয়, ঠিক তেমন একটা নির্ভেজাল ছেলেবেলার গল্প বলেন। যেখানে অপক্ক, অপরিণত প্রেম, একটা অংকের খাতায় অনেক হিজিবিজি কাটা, চামড়া ওঠা ক্যাম্বিস বল, পুরনো রং পেনসিল-এর মতো অনেক কিছু আছে। আমাদের সবাইকে ডাউন মেমোরি লেনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া হাসিগুলো খুঁজে দিয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত। হয়তো সমসাময়িক সময়ের গল্প বলতে বলতেই অঞ্জন হঠাৎ ছোটদের ড্রয়িংবুকের সবুজ পাহাড়ে ফিরে যেতেন বলেই আমরাও তাঁর সঙ্গে ফিরে গেছি। দ্য বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড

হয়তো অনেকেই ভাববেন, এতগুলো কথা হঠাৎ শুরুতে বলছি কেন? সোজাসুজি কনসার্টের কোথায় এলেই তো হতো!

আসলে আমার মনে হয়নি, আমি কোনো বিশেষ একদিনের কনসার্ট দেখছি। অঞ্জন নিজেকে একদিনের মধ্যে আটকে রাখেননি। গত রবিবারের ‘দ্য বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত’ ডিজিটাল কনসার্টে অঞ্জন টাইম ট্রাভেল করেছেন। তাঁর দর্শক-শ্রোতাদের তিনি কখনও নিয়ে গেছেন আগামীতে, আবার কখনও পিছনে ফেলে আসা অনেক অনেক দিন আগে ফিরে গেছেন। একটা সময়ের চাকা যেন ঘুরছে আর আমি অনেকগুলো দিন অতিক্রম করে চলেছি। যেমন আমার জন্ম নয় দশকের মাঝামাঝি, নয়ের দশকের শুরুর দিন, তখনকার শহর কলকাতার ছবি, মানুষগুলোর মুখের অভিব্যক্তি আমার জানার কথা নয়, কিন্তু আমি যেন অনুভব করেছি সেই সমস্ত ছবিগুলো, ছুঁয়ে দেখেছি প্রতিটি মানুষের জীবনের গল্পগুলো। ব্যর্থ প্রেমিকের কান্না, ভিতু স্কুলস্টুডেন্টের  মুখ, ‘হরিপদ’-র মতো অনেকের ছোটখাটো সাদামাটা চেহারা, তাঁদের অফিস যাওয়ার তাড়া সবকিছুই দেখতে পেলাম এই কনসার্টে। অঞ্জন তাঁর গানে ঠিক যেভাবে গল্প বলেন, এই কনসার্টেও তিনি গল্প বললেন, তবে পুরোটাই গানে। অঞ্জন বললেন ‘অনেকেই ভাববে আমি কেন বেশি কথা বলছি না, কিন্তু আমার যে গল্পগুলো বলার আছে, সেগুলো এই গান গেয়েই তো আমি বলে ফেলতে পারছি। আমার মনে হয় না, কথা বলে আমি গানের চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারতাম।’ দ্য বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড ব্যান্ড

ঠিকই বলেছেন তিনি। অঞ্জনের মতো শিল্পী, যে কিনা অনায়াসে তাঁর জানলা দিয়ে এক টুকরো পৃথিবী নিয়ে আসতে পারেন তাঁর গানে, দূরের মেঘেদের দেশে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি ছবি এঁকে দিতে পারেন, তাঁকে আর কীই বা আলাদা করে বলতে হবে! তাঁর গানে তিনি কয়েকদশকের গল্প বলে ফেলেছেন। তাঁর ডিজিটাল কনসার্টকে এমনভাবে সাজালেন যে, একটার পর একটা শিল্পীর আঁকা ছবি পাতা উল্টিয়ে দেখেছেন সকল দর্শক। তবে অবাক করা বিষয় হল, এতগুলো ছবি সুন্দর, সুস্পষ্টভাবে যে এঁকেছেন, তা পুরোপুরি অ্যাকোয়াস্টিক অ্যারেঞ্জমেন্টে। ভাবতে অবাক লাগলেও সত্যি এটাও যে, শুধুমাত্র এই অনুষ্ঠান অতিউচ্চমানের অডিও, ভিজুয়াল কোয়ালিটির সম্প্রচার তাঁর দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর বাড়ি থেকে। তিনি একা নন, এই কনসার্টের সকল টিম মেম্বার এবং অঞ্জন দত্তের সহযোগী সকল মিউজিশিয়ানকে এই আবহ তৈরি করার জন্য কুর্নিশ জানাতেই হয়। অঞ্জন দত্তসহ পাঁচজন মিউজিশিয়ানের একত্রে একটা ব্যান্ড পারফরম্যান্সকে উচ্চগুণমানের সঙ্গে যে প্রোডাকশন তৈরি হল, সেটা দৃষ্টান্ত। তবে ওই যে বললাম, অ্যাকোয়াস্টিক অ্যারেঞ্জমেন্ট! অ্যাকোয়াস্টিক গিটারে নীল দত্ত, অমিত দত্ত এবং বেস গিটারে প্রশান্ত মাহাতো আর কাহন ও সেকার্সে দেবপ্রতীম বক্সী— এই চারজন যেন একটা ম্যাজিক করলেন। অঞ্জন চেয়েছিলেন তাঁর জনপ্রিয় গানগুলি নতুনভাবে সাজিয়ে তুলতে। সত্যিই এই চারজন আর অঞ্জন মিলে এমন একটা মিউজিক্যাল জার্নিতে দর্শকদের নিয়ে গেলেন, যার প্রতিটা মুহূর্তে চমক লুকিয়ে, প্রতিটা গানে অভিনবত্ব। বিশেষ করে ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’-র ভোলটাই পাল্টে দিয়েছেন সবাই মিলে। ‘হান্ড্রেড মাইলস’-এর অরিজিনাল স্কেল প্রয়োগ করে নস্টালজিয়ায় ফিরে গেলেন অঞ্জন। নীল দত্তের মাঝেমধ্যে হারমনি কিংবা কয়েকটা অংশের গাওয়াগুলোও একটা আলাদা অনুভূতির সঞ্চার করছিল। ‘মেরি অ্যান’, ‘দার্জিলিং’, ‘আলিবাবা’, ‘আমার জানলা দিয়ে’, ‘বেলা বোস’, ‘হরিপদ’— এইরকম অঞ্জন দত্তের বেশকিছু জনপ্রিয় গানকে তাঁরা সবাই মিলে একটা অদ্ভুত ম্যাজিক করে অন্যরকম স্বাদে এনে ফেললেন। বিশেষভাবে আলাদা করে যাঁর কথা বলতেই হয়, তিনি কিংবদন্তি মিউজিশিয়ান অমিত দত্ত। অঞ্জন নিজে বারবার তাঁর মঞ্চে, এমনকী, এই ডিজিটাল কনসার্ট-এও বলেছেন বিশেষভাবে। অমিত দত্ত যে গানে থাকেন, সেখানে জাদু করেন। হাতের জাদুতে তিনি যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, সুখের ছবি আঁকেন। তাঁর গিটারে গানের কথা আর সুরের মধ্যে আলাদা করে একটা ভাষা লেখেন তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায়। এদিনও হল সেটা। পরিচিত ইলেকট্রিক ছেড়ে সেইদিন অ্যাকোয়াস্টিক গিটার হাতে তিনি একটার পর একটা চমক দিয়েছেন। দ্য বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড ব্যান্ড




 

কনসার্ট চলতে চলতে নিজেদের মধ্যেই খুনসুটি করতে করতে অঞ্জন বলছেন তাঁদের মধ্যেও একটা ছোটবেলা লুকিয়ে আছে। সেই ছোটবেলাকেই হয়তো ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন সেদিনের সন্ধ্যায়।  এই মহামারিকালে আমাদের ভাল থাকতে গেলে একটু নস্টালজিয়ায় ফিরে নিজেদের জীবনকে ওলটপালট করে দেখে নেওয়াটা প্রয়োজন। এই অন্ধকারময়, অস্থির সময় নিজেদের ছেলেবেলার সতেজ, সরল মনের মিষ্টি হাসিতে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। অঞ্জন যেন সেই কথাই, সেই গল্পটাই বললেন যেভাবে অঞ্জন নিজে বেঁচে আছেন। ডার্ক চকলেটের সোনালী র‍্যাপার খুলে যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া যায়, সেই ছেলেবেলাতেই অঞ্জন পড়ে আছেন। তাই তিনি সবাইকে সেই গল্পটাই বললেন। তাই হয়তো একটি হালকা, মিষ্টি গলাতেই সবকটা গান গাইলেন। কিন্তু অঞ্জন অনুষ্ঠানের শুরুতে বলছেন তিনি বেশিদিন নাকি আর থাকবেন না। সত্যি বুঝি? অঞ্জনবাবু, আপনি যেতে চাইলেও কি কোথাও যেতে পারবেন? যে মানুষ অস্থির সময় কালো শার্ট, কালো চশমায় একটা গিটার হাতে মঞ্চে উঠে একটা প্রজন্মকে লড়াই করার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছেন তাঁদের গল্প বলে, তাঁর কি এত তাড়াতাড়ি প্রস্থান সম্ভব? ঠিক যে কারণে আমার মতো অনেক তরুণ, অনায়াসে আপনার গানের ওপর ভর করেই সেই সময়ে ফিরে যেতে পারছেন, আপনার বলা গল্পের আয়নায় নিজেদের দেখতে পাচ্ছেন; যে কারণে আপনার সমসাময়িক এবং আপনার থেকে বয়সে বড় অনেক মানুষও আজও আপনার গান শোনেন। প্রায় তিন, চার প্রজন্মের মানুষ মিলে আপনার কনসার্টের ১৪০০-এর ওপর টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। ঠিক সেই কারণেই আপনি এত তাড়াতাড়ি কোথাও প্রস্থান করতে পারবেন না। আপনাকে এখনও অনেক গল্প বলতে হবে। তবে, পরেরবার যদি এই অনুষ্ঠান হয়, সেখানে বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত-র সঙ্গে নীল দত্তের গলায় গানও আরও শুনতে চাইব এবং ‘বেস্ট’ গানের লিস্ট আরও বড় করবেন আশা রাখি। আমাদের তালিকা অনুযায়ী আপনার ‘বেস্ট গান’-এর মধ্যে আরও অনেক গান… এবারের লিস্টে যে রাজকন্যা কম পড়িয়া গেছিল অঞ্জনবাবু!


এখনই শেয়ার করুন

One thought on “রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড’— অরিঘ্ন মিত্র

  • October 23, 2020 at 8:57 pm
    Permalink

    Thank you for the detailed review!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *