রোমহর্ষক ডাইরি: কেউ বলছে, কিছু হাসছে, কেউ হাসতে হাসতে কাঁদছে

এখনই শেয়ার করুন

 

বিবিধ ডট ইন:

রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা
হাসির কথা শুনলে বলে
‘হাসব না না, না না!’
সদাই মরে ত্রাসে– ওই বুঝি কেউ হাসে!

হাসতে কার না ভাল লাগে, আমরা সবাই প্রাণ খুলে হাসতে চাই। সামান্য হাসি এমনই একটা ওষুধ যা ক্ষণিকেই আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি ঝরিয়ে মন সতেজ ও তরতাজা করে দেয়। সুদীর্ঘ গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে হাসি নানাভাবে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থ্যতায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে। হাস্যরত কোনও দলের কাছে যদি আপনি হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হন, তাহলে হাসির কারণ না জেনেও আপনি সেই দলের সঙ্গে সাথে হাসতে আরম্ভ করবেন এবং হাসি থামাতে আপনাকে বেগ পেতে হবে। কারণ হাসি সহজেই সংক্রামিত হয়, আর ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয় পূর্ব আফ্রিকার দেশ ‘রিপাব্লিক অফ তাঞ্জানিয়া’-র একটি মহামারীর ঘটনা। যা মোটেই একটি হাস্যকর ঘটনা তো নয়ই বরং অদ্ভুত ও একই সাথে রোমাঞ্চকর।

১৯৬৩ সালের ৩০ জানুয়ারির ঘটনা, সুদীর্ঘ পরাধীনতার পর তাঞ্জেনিয়া সবে মাত্র স্বাধীনতা পেয়েছে ইংল্যান্ডের থেকে। তাঞ্জেনিয়ার পশ্চিম উপকূলবর্তী ভিক্টোরিয়ার লেকের কাছাকাছি কাসাসা নামক এক গ্রামে মেয়েদের একটি বোর্ডিং স্কুলে প্রথম ঘটনার সূত্রপাত, কোন একটি বিষয় নিয়ে দুটি মেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসতে আরম্ভ করেছিল, সেই হাসি দু থেকে তিন জন, তিন থেকে পাঁচ জনের মধ্যে ছড়াতে ছড়াতে দাবানলের মত অন্যান্য মেয়েদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এবং স্কুলের বারো থেকে আঠারো বছর বয়সী, ১৫৯ জন ছাত্রীর মধ্যে প্রায় ১০০ জনই এই অদ্ভুত হাসির রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় পড়ে।

আক্রান্ত ছাত্রীরা কোনকিছুই সুষ্ঠভাবে করতে পারছিল না, তারা না পারছিল ঠিক ভাবে পড়াশুনা করতে, না পারছিল নিত্য নৈমিত্তিক সাধারণ কাজগুলো করতে। তারা কেবল মাঝে মাঝে প্রবলভাবে হাসছিল কোন কারণ ছাড়াই।

যদিও শিক্ষক শিক্ষিকাদের এই হাসি আক্রান্ত করতে পারেনি তবুও তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব হয় আক্রান্ত ছাত্রীদের বাড়িতে খবর পাঠান ও আক্রান্তদের শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন কারণ তাদের মতে এরকম অদ্ভুত পরিস্থিতি যেখানে শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ অংশই অহেতুক নিজেদের মধ্যে হাসছে, এরকম পরিবেশে সুষ্ঠভাবে স্কুল পরিচালনা করা যায় না। পরবর্তীকালে ঘটনা শুরুর প্রায় দেড় মাস পর ১৮ মার্চে কাসাসার এই বোর্ডিং স্কুলটিকে সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যায় এবং বাড়ি ফেরার পর পরিবারের ছোট সদস্যরা এই বোর্ডিং স্কুল ফেরত এই হাস্যরত বালিকাদের দেখে খুব স্বাভাবিক ভাবে হাসতে শুরু করে এবং এই রোগ তাদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। নাসাম্বা গ্রাম যেখানে বেশিরভাগ ছাত্রীর বাড়ি ছিল, পরবর্তী এপ্রিল ও মে মাস জুড়ে প্রায় ২১৭ জন যুবক যুবতি আক্রান্ত হয় এই রোগে। ধীরে ধীরে এই হাসির রোগের শিকার হয় নাসাম্বা গ্রামের নিকটবর্তী অন্যান্য গ্রামগুলি।

অতিরিক্ত হাসির ফলে হাসির সাথে দেখা দিয়েছিল পেট ফুলে যাওয়া, শ্বাস প্রশ্বাসের গণ্ডগোল ও হঠাৎ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কেউ কেউ এই হাসিকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে প্রবল হাসির পরে উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করত আবার কেউ কেউ চিৎকার করত। এই পর্বে প্রায় আশে পাশের গ্রামের সব মিলিয়ে প্রায় ১৪টা স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়, কাসাসার মেয়েদের বোর্ডিং স্কুলটি ২১শে মে আবার খোলার পর দ্বিতীয়বার আবার বন্ধ করে দেওয়া হয় জুনের শেষ দিকে। এই অদ্ভুত রোগে ৩০ জানুয়ারি শুরুর পরের প্রায় আঠারো মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল ও রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় এক হাজার জনের বেশি এতে আক্রান্ত হয়েছিল এই পুরো সময়ে।

পুরো ঘটনার পেছনের কারণ:

‘ইন্টারন্যাশন্যাল সোসাইটি অফ হিউমার স্টাডিস’-র গবেষক ডক্টর এফ হামপেলমানের মতে, এই পুরো ঘটনাটির জন্য দায়ী যে রোগ সেই রোগটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মাস হিস্টিরিয়া, এমন এক ধরনের মানসিক রোগ, যা একটি বৃহত্তর জনসংখ্যার মধ্যে উদয় হয়। কোন জাতি বা কোন দেশের যখন বৃহত্তর জনসংখ্যা কোনভাবে মানসিক উদ্বেগে থাকে তখন সেই উদ্বেগ থেকে শুরু হয় ‘মাস হিস্টিরিয়া’।

এটা মূলত কোন কাজের জায়গা বা স্কুল থেকে শুরু হয় যেখানে দিনের অনেকটা সময় অনেকে একসাথে সময় কাটায়। তাঞ্জানিয়ার ক্ষেত্রে যা হয়েছিল সেটা হল দীর্ঘদিন পরাধীন জীবন কাটানোর পর তাঞ্জানিয়া সবে মাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল, বদলে যাচ্ছিল মূল্যবোধ ও আশেপাশের সময়। মা বাবা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যেও বাড়ছিল মানসিক চাপ যার থেকে মুক্তি পেতে শুরু হয় হাসি এবং এই হাসি ধীরে ধীরে বৃহত্তর সংখ্যার মধ্যে যখন বইতে শুরু করে তখন সে তার চরিত্র বদলে নেয়।

লিখলেন সনৎ মাইতি।


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।