‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’: অরিঘ্ন মিত্র

বিবিধ ডট ইন: শুনেছি অনেক শিল্পীরা বলছেন, ডিজিটাল কনসার্ট এখন একটি আন্দোলন। কথাটা ঠিকই, এই যে ছোটবেলায় গল্প শুনতাম গ্রামে মড়ক লাগত। সত্যজিতের ‘গণশত্রু’-তে দেখেছিলাম মড়ক নিয়ে রাজনীতি। কখনও কেউ ভেবেছিল সব কিছু ওলটপালট হয়ে বাস্তবও গল্পের মতো কিংবা গণশত্রুর চিত্রনাট্যের মতো হয়ে যাবে? স্বভাবিক জীবনযাত্রা টুক করে দরজার খিল এঁটে ঘরের ভেতর ঢুকে যাবে? দীর্ঘদিন ঘর থেকে না বেরিয়ে মানুষ ঠিক একটা বছর কাটিয়ে ফেলতে পারবে? বিনোদন প্রিয় মানুষ অনলাইনে কনসার্ট দেখবে? এইসব কিছু হচ্ছে। কনসার্টও দেখছে, একদম টিকিট কেটে রমরমিয়ে দেখছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা চলছে বিভিন্ন কনসার্ট নিয়ে। (‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’: অরিঘ্ন মিত্র)

আরও পড়ুন: গবেষক সুধীর চক্রবর্তীকে উৎসর্গ, নতুন সংকল্পের কনসার্ট দোহারের

যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলা গান এবং গানের শিল্পীরা খুব একটা প্রচারের আলো পান না, তাঁরাই দেখছি ডিজিটাল কনসার্ট নামক এই মঞ্চে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকী, ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশের মধ্যেও শীর্ষে বাংলা। এই সমস্ত শিল্পীরা প্রায় স্রেফ একটা প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে মানুষের সামনে ঘরের ড্রয়িং রুমে ঢুকে কনসার্ট করে ফেলছে, এটাকে আন্দোলন বলা চলে না? নাকি বিপ্লব বললেও কম বলা হবে? কিন্তু খেলাটাও এখানে থামছে না। একটা শব্দ ঘুরে ফিরে আসছে এই আন্দোলনে, সেটা হল ‘একক’।  এই শব্দটার সঙ্গে আজকাল সাংস্কৃতিক আন্দোলন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলন হয়তো শুরু করেছিলেন রূপম ইসলাম অনেক আগেই, যেটা ডিজিটাল কনসার্টে এক্সটেন্ড হয়েছে। তাই ‘একক’ শব্দটা শুনলেই আজকাল মনটা ছটফট করে ওঠে। এই গত ৩০ ডিসেম্বরের রূপমের অনুষ্ঠান ঘোষিত হয়েছিল ‘ফেসবুক লাইভ’ নামে। তারপর যখন ‘একক’ শব্দটা ঘোষণা হল। সঙ্গে সঙ্গে একটা সৈন্যদল যেন বুকের ভেতরে মার্চ করতে করতে হেঁটে গেল। এই অনুভূতি সবার বোঝার নয়, যাঁরা এই আন্দোলনের পাশে আছেন তাঁরা বুঝবেন। এই একক আন্দোলনের আর এক যোগ্য উত্তরসূরী হলেন তমাল কান্তি হালদার।

আরও পড়ুন: ‘ভ্রম’— স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যবর্তী স্টেশন, গানে গানে বলছে লক্ষ্মীছাড়া

তমালের গান আমি প্রথম শুনেছিলাম যখন কলেজে পড়ি, এক বন্ধু শুনিয়েছিল। এই দু’-তিন বছর আগে। একটা মানুষ নির্লিপ্ত, বেদনায়, যন্ত্রণায়, আনন্দে বলছে ‘কাঁদবি না, বল, কাঁদবি না।’ ওই প্রথম শোনা। তারপর পিয়ানোর টুংটাং আমায় অনেকবারই তাঁর কাছে নিয়ে গেছিল। কিন্তু কোনওদিন হয়তো মনের দরজায় টোকা মেরে ভেতরটা দেখার কথা ভাবিনি। শিল্পীর কথা না শুনে, সামনে থেকে অনুভব না করলে পুরোটা কি জানা যায় সবসময়? অনেকদিন ধরে শুনছি তমাল তাঁর অনুষ্ঠানকে এমন একটা মাত্রায় নিয়ে গেছেন যেটা নাকি অভাবনীয়, অদ্ভুত, অভিনব, অতুলনীয়, ব্যতিক্রমী এবং স্বয়ংক্রিয়। সম্পূর্ণ নিজে এক হাতে, বাড়ি বসে নাকি তিনি পুরো অনুষ্ঠানটি সাজিয়ে ফেলেন। আমি যে এই ‘কলাম’ লিখছি দুর্ভাগ্যক্রমে প্রত্যেকবারই ভেবেছি শিল্পীর অনুষ্ঠান দেখতেই হবে কিন্তু দেখা হয়ে ওঠেনি বিভিন্ন কারণে। শুনেছি তিনি নাকি অনুষ্ঠানের মধ্যে ম্যাজিকও করেন, অনেক যন্ত্রসঙ্গীত নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেন। লোভনীয় সমস্ত খবর আমার কাছে আসত, আক্ষেপ হত, এমন একজন শিল্পীর অনুষ্ঠান দেখতে পারছি না ভেবে। কিন্তু এই শেষ একক অনুষ্ঠানটি দেখে আক্ষেপ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। (‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’: অরিঘ্ন মিত্র)

আমি আমার এক সহকর্মী বন্ধুর বাড়িতে বসে দু’জন দেখছিলাম অনুষ্ঠান। এইরকম মিউজিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স আমরা দু’জনেই এর আগের কোনও অনুষ্ঠানে পাইনি। শুধু হাঁ করে দেখছিলাম একটা মানুষ নিজে একা হাতে কী অদ্ভুতভাবে যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার করছেন, গাইছেন! মিউজিশিয়ান হিসেবে সত্যিই তমাল অসাধারণ। নিখুঁত, নিপুণতায় যে এইভাবে একটা অনুষ্ঠান কোনও সহযোগী ছাড়া তিনি করতে পারছেন, সেটাই অবিশ্বাসযোগ্য। এটা সত্যি বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এটা বোঝার জন্য তমালের একক অনুষ্ঠান দেখা উচিত।

আরও পড়ুন:  ‘ভক্তের চোখে’ রূপমের বছরশেষের একক: ঈশিকা চট্টোপাধ্যায়

ক্যামেরা, লাইভ স্ট্রিমিং পরিচালনা, দর্শকের প্রতিক্রিয়া কমেন্ট দেখে দেখে পড়া, লাইট, ট্র্যাক চালিয়ে তাঁর সঙ্গে একাধিক যন্ত্রসঙ্গীত নিজে হাতে বাজিয়ে গাওয়া, এই সবকটি বিভাগের দায়িত্ব তমাল একাই সামলেছেন। কী অবাক করা একটা বিষয়! এই অনুষ্ঠান ছিল ‘মিনি একক’। এই ক্ষুদ্র সংস্করণে যদি এত চমক থাকে, তাহলে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের অনুষ্ঠানে তমাল কী করে থাকেন! শুনেছি তিনি অনুষ্ঠানে ম্যাজিক করতেন। যাই হোক, আমার লেখায় বেশি আক্ষেপের সুর হয়তো বেশি করে বেরিয়ে পড়ছে।

মূলত এই একক একটা উদযাপনের অভিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তমালের একদম প্রথমদিকের একটি কাজ অপ্রকাশিত হয়ে বহুদিন পড়েছিল। অ্যালবামের নাম ‘অসুখ’। যেটা তমালের খুব নিজস্ব, ব্যক্তিগত একটা কাজ। আমি নিজে কিছু ক্রিয়েটিভ কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি নিজের কাজে যে আবেগ জড়িয়ে থাকে, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সন্তানসম ভালবাসা মিশে থাকে তাতে। আর সেই কাজ যখন অপ্রকাশিত অবস্থায় স্মৃতির পাতায় ধুলো জমে, তখন সেটা আর এক অস্বস্তি। মনের ভেতরটা প্রতিনিয়ত ছটফট করতে থাকে একটা তাড়নায়। এই ছটফটানি বেশ কয়েকদিন ধরেই তমালের চোখে মুখে ধরা পড়ছে। এই শীতে তমাল তাঁর সেই অপ্রকাশিত গানগুলি এক এক করে প্রকাশ করছেন। আর নতুন গান নিয়ে আরও একবার সঙ্গীতযাপনে বারবার জড়িয়ে পড়ছেন, নেশায় মাতাল হচ্ছেন, এই বন্ধন ছিঁড়ে বেরোতে পারছেন না। ওই যে আন্দোলনের কথা বলছিলাম, এই সময় দাঁড়িয়ে পেশাগতভাবে নিজের গান বাজনাকে ঘিরে ধরাটাই একটা আন্দোলন। আমার মতে ‘ইচ্ছে’ বনাম ‘ভাত’ এর লড়াই, বড্ড কঠিন এই লড়াই। যাঁরা এই ‘ইচ্ছে’-র পক্ষে তাঁরাই সংখ্যায় কম। প্রতিনিয়ত তাঁদের আন্দোলন দানা বাঁধছে। কর্মসূত্রে শিল্পীর সঙ্গে আমার একদিন দীর্ঘ কথপোকথন হয়, সেই কথোপকথনে আমি কিছু তথ্য জেনেছিলাম। কিন্তু মনের অন্যদিক তাঁর কথার মধ্যে জড়িয়ে থাকা অনেকগুলো যন্ত্রণার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। (‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’: অরিঘ্ন মিত্র)

আরও পড়ুন: জমজমাট নাট্যআননের প্রতিষ্ঠাদিবস! নাটক ‘গণেশ গাথা’ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের গানে থাকবেন দুর্নিবার

অনুষ্ঠানে তমাল ‘অসুখ’ অ্যালবাম-এর অন্তত তিন’টি গান গাইলেন। গাইলেন আরও বেশ কিছু নতুন-পুরোনো গান। শিল্পীরা সবসময়ই মানুষের কথা বলে, হয়তো অনেকের কথা ভেবে গান লেখেনও। কিন্তু একইভাবে নিজের জন্যেও শিল্পীরা কলম ধরেন। তমালকে সেদিন দেখে মনে হচ্ছিল বহুদিন ধরে যেন অনেক কথা জমিয়ে রেখেছেন বুকের মধ্যে। সে তাঁর কথা বলতে চান। গানে কিংবা কথায়। আজ যেন সেই না বলা কথা, যন্ত্রণা চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে আর দর্শকাশনে বসে থাকা সকল শ্রোতা সাদরে সেই যন্ত্রণা মেখে নিচ্ছেন। তমালের দর্শক যাঁরা, তাঁরা সবাই যেন তাঁর খুব কাছের কেউ। নইলে কী সৎ, সরলভাবে কতগুলো কথা স্রেফ হাসতে হাসতে বলতেন কীভাবে? তমাল তাহলে ভালোবাসতে জানেন! সেটাই তো প্রেম, সেটাই তো এই অস্থির সময়ের সবচেয়ে বেশি চাহিদা।

আরও পড়ুন: সৃজিতের চোখে ‘ফেলুদা ফেরত’: ডাঁহা ফেল পরিচালক?

একদিন বাড়িতে ফিরে দেখেন তাঁর ছোট সন্তান ঘুমাচ্ছে আর যত্ন করে আদর করছেন তাঁর মা। তমাল সেই দৃশ্য দেখে স্নিগ্ধতার ছোঁয়া পেয়েছেন। বুঝেছেন এই পৃথিবীর সকল যন্ত্রনা লাঘব হয় ‘মা’ শব্দের কাছে। তিনি ধীরে ধীরে সেই স্নিগ্ধতার পরশ মেখে একটা রক্তপাতহীন, ধর্মহীন, জাতহীন, শ্রেণীহীন পৃথিবীর কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন। তমাল যেভাবে বর্ণনা করছেন, আমার ‘চিলড্রেন্স অফ মেন’ সিনেমার দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। দৃশ্যপট এইরকম, দীর্ঘ ১৭ বছর কোনও মনুষ্য সন্তান জন্মায়নি, ধর্মযুদ্ধে মেতে আছে পৃথিবী। দু’টি ভাগে বিভক্ত বিশ্ব। হঠাই একজন মহিলা সন্তানসম্ভবা হন। যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই একদিন সেই সন্তান ভূমিষ্ট হয়। সেই মা যখন কোলে করে তাঁর সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে আসছে একটি বাড়ি থেকে সমস্ত উভয়পক্ষের সৈন্যবাহিনী বিস্ময় ভরা চোখে তাঁকে দেখছেন। বন্দুক নামিয়ে রেখে দিচ্ছেন, গ্রেনেডের বিকট শব্দ থেমে যাচ্ছে, গোলাগুলি বন্ধ, বারুদের গন্ধ নিমেষে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ধীরেধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে সেই শিশুকে তাঁরা। এইরকম কিছুক্ষণ চলার পর তাঁর মা এই যুদ্ধক্ষেত্ৰ থেকে বেরিয়ে আসলে আবার গুলি, বোমা, বারুদ তার জায়গা দখল করে নেয়। তমালের একক সেই ছোট্ট দৃশ্যের মতোই ছিল। ক্ষণিকের জন্য নিজের যন্ত্রণায় প্রলেপ দিয়ে, শ্বাস নিয়ে একটা আন্দোলনে সামিল হয়ে যাওয়া আবার, একবার নিজেকে খুঁজে নেওয়া। ঠিক এই জায়গায়ই তমাল নিজের একককেও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেন, জায়গা করে নেন ‘একক’ শব্দটার গুরুত্বে। (‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’: অরিঘ্ন মিত্র)

আরও পড়ুন:  দেবদূত করিমুল! থেমে নেই ‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’র সফর

‘ভক্তের চোখে’ তমালের একক ‘অসুখ শুরু’ লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *