সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন-এর সাহিত্য বিভাগে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি লিখলেন গোপালনগর গিরিবালা বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার অম্বুজা রাউত

জেলা মুর্শিদাবাদ। রাঢ় বাংলার চুনাপাথরের ডেলা মেশানো রুক্ষ লালচে মাটি। সবুজ প্রায় চোখে পড়ে না বললেই চলে। কেবল মাঝেমধ্যে ঈষৎ হলদেটে প্রায় পাকা ধানের ক্ষেত। লাল মাটির আলের পাশে হলদে ধানক্ষেত যেন  মাতিসের একটুকরো ক্যানভাস! সময়টা ভাদ্র-আশ্বিন— দ্বারকা নদীর সরু ধারার পাশে কাশবনে উৎসবের ছোঁয়া। খটখটে নীল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের ভেলা পোস্ট কার্ডের ছবির মতন মসৃণ, সুন্দর। গ্রামের নাম খোশবাসপুর। আর সেখানে থাকে এক নবীন কিশোর; খানিক যত্নবিহীন ঝাঁকড়া চুলের, মায়া-মাখানো চোখের নবীন কিশোর; নাম সিরাজ।

বাবা আদর্শবান, গান্ধী অনুরাগী স্বাধীনতা সংগ্রামী, সৈয়দ আবদুর রহমান ফিরদৌসী, যিনি পূর্ণ আস্থা রাখতেন অনুশাসনে। আট সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড়, এবং সবচেয়ে খেয়ালখোলা সিরাজকে তাই নিয়ে এলেন নিজের কাছে, নবগ্রামে। ভর্তি করালেন নবগ্রামেরই গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে। কিন্তু শৈশবে মাতৃহারা নবীন কিশোর, আমাদের গল্পের নায়ক, সিরাজের মন পড়ে থাকে খোশবাসপুরে— দ্বারকার চরে, হিজলের জঙ্গলে, কাশবনে, কুশের আগায় বসা ফড়িংয়ের ডানায়। আর?

আর তার দু’চোখ ভরে রঙিন স্বপ্নের মতো লেগে থাকে পেট্রোম্যাক্সের আলো! গম্ভীরা গান, ছোকরির নাচ, ক্যাপালের কৌতুকপূর্ণ হাসি মস্তিষ্কের মধ্যে ক্যালাইডোস্কোপিক নকশা তৈরি করে! আর কি মন টেঁকে অ্যালজেব্রায়? একবার, দু’বার, বারবার বাড়ি থেকে পালিয়ে সো…জা আলকাপের দলে। আলকাপ যে তাঁকে ম্যাজিকের মত টানে! আসর-বন্দনা দিয়ে শুরু, তারপর ক্রমে দু’দলের মধ্যে ছড়া, কাপ, বৈঠকী গান ও সবশেষে খেমটা পালা দিয়ে শেষ। এক একটা গোটা রাত যে কোথা দিয়ে কেটে যায়, নবীন কিশোর বুঝতেই পারে না! কেবল মনে মনে জল্পনা করে, ‘আমি মাস্টার হলে কাপটা এইভাবে ধরতাম! কিংবা ছোকরিকে বলতাম, ওইভাবে হাত ঘোরাতে!’ (সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি)

বাঁশিটা বড় মন দিয়েই বাজাতো নবীন কিশোর। কে জানত, অবিলম্বে এই বাঁশিই তাকে আলকাপের দলে ভিড়বার টিকিট এনে দেবে! মাত্র ন’বছর বয়সে কবি-মা আনোয়ারা বেগমের মৃত্যু যাকে বিচলিত করেনি, সেই আপনভোলা বালককে মায়ায় ভুলিয়েছিল আলকাপ লোকনাট্য। তবে মাতৃবিয়োগের গভীরতাকে উপলব্ধি করার মানসিক বয়সও  হয়তো হয়নি সিরাজের তখন। মায়ের চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে পরিণত সিরাজ লিখছেন, ‘ওই বয়সে মার মৃত্যু হলো, কিন্তু এই মৃত্যু আমাকে ছুঁল না। প্রকৃতি আমাকে কেড়ে নিয়েছেন কবে, আমার আসল মা যে তিনিই! আশ্চর্য নির্বিকার থেকে গেলাম । বিধবা মাসী ‘মা’ হয়ে বাড়ি এলেন।’ মাসি আকলিমা বেগম দিদির মত কবি না হলেও সাহিত্যপাঠ ও চর্চাকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু, নবীন কিশোরকে তিনি ঘরে আটকে রাখতে পারলেন না! সে রাখাল রাজা বাঁশিটি নিয়ে বাড়ি ছাড়লে। এবার আর দু-তিন সপ্তাহের জন্য নয়, একেবারে পাকাপাকিভাবে আলকাপ দলে নাম লেখানো হল। পেট্রোম্যাক্সের আলোর বলয় যেন শিল্পীর আলোর আসন! একমনে চোখ বুজে বাঁশিতে ফুঁ দেয় যখন কিশোর, দর্শকদের সাক্ষাৎ শাপভ্রষ্ট কিন্নর দর্শন হয়!

পাঁচের দশকে রাঢ় বাংলার বিনোদন জগতে কান পাতলে শোনা যায় একটাই নাম: ঝাঁকসু ওস্তাদ, গ্রামের মানুষের আদরের ‘ঝাঁকসা’। কর্ণসুবর্ণের কাছে ভরাট-এ ওস্তাদ ঝাঁকসার দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সাঁওতাপাড়ার দল বায়না পায়। বাঁশি বাজানোর জন্য ডাক পড়ে সিরাজের। জুহুরীর চোখ রত্ন চিনতে ভুল করে না। প্রতিপক্ষ দলের আউলা-বাউলা সিরাজ নামের কিশোরটি নির্বাচিত হল ঝাঁকসুর দলের আপাত বাজিয়ে হিসেবে। তারপর ওস্তাদের দলের সাথে নলহাটির কাছে গোবিন্দপুরে গান গাইতে যায় সাঁওতাপাড়ার দল। বিপক্ষে ছিলেন গোবিন্দপুরের বিখ্যাত আলকাপ মাস্টার, মনকির হোসেন। দু’দিন গান গাওয়ার পর ঝাঁকসা চলে যায়, সাথে লটবহর নিয়ে নবীন কিশোর। ছোকরি সুধীর দাসের নাচ, গানের গলা আর সিরাজের বাঁশিতে ভর করে ঝাঁকসু ওস্তাদের আলকাপ দল তখন গ্রামবাংলার একছত্র তারকা দল! মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘি,ভগবানগোলা,জীবন্তি ,কান্দী ছাড়িয়ে শো-য়ের আমন্ত্রণ আসতে লাগল পশ্চিমবঙ্গ তথা বিহার, ঝাড়খণ্ড, মায় ছত্তিসগড়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে! (সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি)

মনের মধ্যে চেপে-চুপে রাখা ইচ্ছেটা এবার ডানা মেলার সাহস পেল। অকৃপণ যত্ন নিয়ে যেমন একটু একটু মাটি দিয়ে প্রতিমাশিল্পী মৃন্ময়ী রূপ দেন চিন্ময়ীকে, ঠিক তেমনি ভাবে সিরাজ গড়ে তুলেছিলেন নিজের আলকাপ দল। মাত্র পনের বছর বয়সে, ১৯৪৫ সালে নিজের বাপ-দাদার ভিটে, খোশবাসপুরে নিজের আলকাপ দল খোলেন সিরাজ। দীর্ঘদিনের প্যারফর্মান্সের অভিজ্ঞতা তাঁকে এনে দিয়েছিল ওস্তাদের তাজ! বিপুল জনপ্রিয় হলেন ‘মাস্টার সিরাজ’, ওরফে ‘সিরাজ ওস্তাদ’। দলের গান লেখা, সুর করা এবং ছোকরির প্রশিক্ষনের গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। ‘ছোকরি’ বাছাই পর্ব দীর্ঘায়িত হত: দশ-বারো বছরের বালককে দীর্ঘ সময় ধরে মেয়েলি ঠাটবাঁট শিখিয়ে রীতিমতো নতুন মানুষ করে গড়ে তোলাটাই যে আলকাপের বৈশিষ্ট্য। দলের মাথা অর্থাৎ ‘মোড়লের’ সাথে থাকত একজন ভাঁড়, আলকাপের ভাষায় ক্যাপাল। আলকাপ স্বতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ তামাসা প্রধান লোকনাট্য।

বছর কয়েক পর, সিরাজ যোগ দেন সাঁওতাপাড়ার আধুনিক আলকাপ দলে। আধুনিক আলকাপের বৈশিষ্ট্য হল, এরা পুরনো ধাঁচের কাপ ছেড়ে বৈঠকী গান ও পরিবেশনায় নতুনত্ব আনছিল। তবে দলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে সাঁওতাপাড়ার দল থেকে ১৯৫৩ সালে তিনি চলে যান মহালন্দির কাছে ডাঙাপাড়ার দলে। ১৯৫৪ সালে আবার যোগ দেন ছোটবেলার স্মৃতি-বিজড়িত নবগ্রাম থানার পলাশগ্রামের আলকাপ দলে। দু’বছর পর সাহিত্য চর্চার তাগিদে সিরাজ পুরোপুরি আলকাপ ছেড়ে দেন।

আমাদের গল্পের নবীন কিশোরের বড় হয়ে ওঠা এই আলকাপের হাত ধরেই। বাকিটা সব গল্পের মত একই রকম: কিশোর বড় হয়ে গেল আর কলকাতায় চাকরি নিলে! মস্ত লিখিয়ে হলেন!

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন মুক্তকেশী বিদ্যালয় থেকেই। তারপর বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি, ১৯৫০এ। কিন্তু বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, নিজের দল গড়া সিরাজের মন থেকে আলকাপ মুছে যায়নি কোনও দিন! ১৯৮২ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় উনি একটি প্রবন্ধ লেখেন, শিরোনাম: ‘আলকাপ, নাট্যরীতি এবং আর্ট থিয়েটার’। লুপ্তপ্রায় এই লোকনাট্যকে হ্যাজাগের আলো থেকে রিডিং ল্যাম্পের আলোকবৃত্তে নিয়ে এলেন ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। নিজের আলকাপ দলের কথা, ওস্তাদ ঝাঁকসুর কথা যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠল ধনঞ্জয় সরকার, গঙ্গা, শান্তি, ফজল, সুবর্ণদের জীবন আখ্যানে। (সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি)

সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সফল সাংবাদিক। কিন্তু এই আপাদমস্তক সাফল্যের মধ্যে আমৃত্যু সযত্নে লালন করে গেছেন আদ্যন্ত বোহেমিয়ান সত্তাকে। আলকাপ জীবন তার একটা প্রকাশ মাত্র। সৈয়দ সিরাজ ‘মায়া’ শব্দটি বড় সুচতুরভাবে ‘মৃদঙ্গ’-র সাথে জুড়েছেন। নিজের যাপন, ভালোলাগা, সদ্য কৈশোর থেকে যৌবনকালের প্রাক-পর্যায়ের নেশা সবকিছু যেন মায়া! ঠিক যেন এক রাতের আলকাপ আসর! মুহূর্ত কাল পর, শহুরে আলোতে বুদবুদের মত মিলিয়ে যাওয়া এক মায়া, যার রোমন্থন আজীবন মস্তিষ্কের কোষে কোষে ছড়িয়ে দেয় দ্রিমি দ্রিমি মৃদঙ্গ বোল!

  

অম্বুজা রাউত

অ্যাসিসট্যান্ট টিচার (গোপালনগর গিরিবালা বালিকা বিদ্যালয়)

যোগাযোগ: ambuja.routh@gmail.com


এখনই শেয়ার করুন

One thought on “সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ জীবন: অন্য বোহেমিয়ান রাপসোডি

  • October 20, 2020 at 10:42 am
    Permalink

    মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়লাম – আহা! দৃঢ় হোক তোর কলম। ভালোবাসা নিস্।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *