লেননের ‘ইম্যাজিন’ থেকে কবীর-শিবার ‘স্বপ্ন দেখা…’, সঙ্গী রূপম-ইমন-উপলরা

সাম্য: জন লেনন তাঁর ‘ইম্যাজিন’ বলেছিলেন, ‘ইউ মে সে আই অ্যাম আ ড্রিমার, বাট অ্যাম নট দি অনলি ওয়ান।’ এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, সেখানে কোনও দারিদ্র থাকবে না, কাঁটাতারের চোখ রাঙানি থাকবে না। ধর্মের ভেদ থাকবে না। সেই ‘ইম্যাজিন’ গানের বাংলা সংস্করণ ‘স্বপ্ন দেখার গান’ আসতে চলেছে কবীর চট্টোপাধ্যায় এবং শিবাশিস ব্যানার্জির যুগলবন্দিতে। গানটি লিখেছেন কবীর এবং অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছেন শিবাশিস। আগামী ২৫ এপ্রিল, রবিবার গানটি মুক্তি পাচ্ছে ‘কবীর এন শিবা’ ইউটিউব চ্যানেলে।

এই গানটির অন্য বিশেষত্বও আছে। অনেক শিল্পী মিলে গানটি গেয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেকেই বাড়ি থেকে মোবাইল ফোনে ভিডিও রেকর্ডিং করেছেন গানটির। গানটি গেয়েছেন এক ঝাঁক তারকা। রূপম ইসলাম, কবীর চট্টোপাধ্যায়, গৌরব গাবু চট্টোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্ত, ইমন চক্রবর্তী, রাহুল রাম, লগ্নজিতা চক্রবর্তী, দুর্নিবার সাহা, দীপ্তার্ক বসু, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, উজ্জ্বয়িনী মুখোপাধ্যায়, মধুবন্তী বাগচী, ঋষি পাণ্ডা গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন।

সঙ্গে থাকুন। ফলো করুন আমাদের ফেসবুক পেজ:

এই গানটি খুব সাধারণভাবেই তৈরি। বাণিজ্যিক কোনও উদ্দেশ্যে তৈরিও হয়নি। নবীন শিল্পীদের এই উদ্যোগে এক কথাতেই তারকা শিল্পীরা রাজি হয়ে গেছেন। বাংলা গানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক এটা। রূপম ইসলাম, ইমন চক্রবর্তী, উজ্জ্বয়িনী মুখোপাধ্যায়, উপল সেনগুপ্তদের মতো শিল্পীদের এগিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে সঙ্গীতমহলে আলোচনা তুঙ্গে। তাঁদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন অনেকেই।  শিল্পী নীলাঞ্জন ঘোষও এই উদ্যোগে এগিয়ে এসেছেন। যন্ত্রসঙ্গীতে সহায়তা করেছেন তিনি।

এই অভিনব উদ্যোগ কেন? ‘ইম্যাজিন’ গানেরই বা অনুবাদ কেন? গানটি সম্পর্কে কবীর এবং শিবাশিস বিবিধ-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কবীর জানান,

আমি এক বছর আগে এই সময়ে বিদেশে ছিলাম, ডাবলিনে আমার পিএইচডি-র কাজে। সেইসময় সবাই আমরা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলাম। সেইসময় আমার বন্ধু এবং সঙ্গীতশিল্পী শিবা (শিবাশিস) একটি মিউজিক্যাল সেশন করত ফেসবুকে। সেখানে যাঁরা দর্শক থাকতেন তাঁদের নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ কমিউনিটি তৈরি করে শিবা। প্রত্যেকের যেসমস্ত প্রতিভা আছে সেগুলো যাতে কাজে লাগানো যায়। সেই দর্শকদের মধ্যে আমার বান্ধবী অদ্বিতীয়া ছিলেন। অদ্বিতীয়াই ভাবে যে, সবাই মিলে যদি একটি গান বানানো যায়। সেই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে পরিকল্পনা হয় ‘স্বপ্ন দেখার গান’-এর।

শিল্পীরা এই গানটি পছন্দ করলেন কেন, সেই বিষয়ে কবীর বলেন,

এমন একটা অতিমারি পরিস্থিতিটতে সবাই চাই চারপাশটা কবে আবার মুক্ত হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা সময়ে বিভিন্ন মানুষ স্বপ্ন অনেকরকমের স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নগুলো যেকোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই দেখতে চাইবে যে, পৃথিবীতে কোনও অর্থকষ্ট থাকবে না, খালি পেটে হাহাকার থাকবে না। লেনন যেমন বলেছিলেন, ‘ইউ মে সে আই অ্যাম আ ড্রিমার, বাট অ্যাম নট দি অনলি ওয়ান।’ আমরাও ঠিক একইভাবে বাংলায় বলেছি,
‘স্বপ্ন দেখেই বেশ করেছি!
একলা তবু দেখছি না।
একদিন ঠিক জানি খুঁজে পাব
মানুষের আসল ঠিকানা।’

গানটির তৈরি সময়ের গল্প বলতে গিয়ে শিবাশিস জানালেন,

কবীর লেখার পর আমি একটা ট্র্যাক বানাই। দীপ্তার্ক বসু সেটা শুনে ভোকাল প্রোগ্রামিং পুরোটা সাজায়। আমি আর কবীর ছাড়াও এই গানটির জন্য অসম্ভব খেটেছে দীপ্তার্ক। আমি চেষ্টা করেছি এমন একটি অ্যারেঞ্জমেন্ট করার, যেখানে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ছাপ থাকে। আমি অনেক ভারতীয় ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করার চেষ্টাও করেছি।

এই গানটির কথা শুনেই অন্যান্য শিল্পীরা এগিয়ে এসেছিলেন। শিবাশিস বললেন,

প্রত্যেকেই খুব খুশি হয়ে গানটির জন্য কাজ করেছেন। প্রত্যেকে খুবই বড়মাপের শিল্পী। প্রত্যেকেই ভালবেসে কাজ। করেছেন। এই গানটি তৈরি করার পেছনে কোনওরকম অর্থনৈতিক চিন্তা আমার ছিল না। যাঁরা গাইলেন, তাঁদেরও ছিল না। প্রত্যেকেই একটি মুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে গেয়েছেন।

একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে কবীর জানিয়েছেন,

বাংলার বাইরে কিছু মানুষদের ধারণা আছে এখানে প্রত্যেক মিউজিশিয়ান একে অপরের পিঠে ছুরি মারে। এই বিষয়টা ভাঙতে হবে। বেশ কয়েকবছর আগে রূপমদা যখন আমাদের সবাইকে দিয়ে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ গাওয়ালেন তখনই বলেছিলাম আমি, শিল্পীদের যৌথ কাজ বেশি বেশি করে হওয়া উচিত।

গানটি প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল গতবছর লকডাউনেই। কিন্তু কিছুটা সময় লেগে যায় কাজটি শেষ করতে। পরে যখন লকডাউন উঠে যায়, তখন শিবাশিসের মনে হয়েছিল, এখন আর গানটি প্রকাশ করে লাভ নেই। কিন্তু করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ ফিরে আসতেই সিদ্ধান্ত বদল কবীর-শিবাশিসের। শিবাশিস বলেছেন,

গতবছর আমরা জানতাম না যে কবে এই দুর্বিষহ দিন শেষ হবে। তখন সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ। মাঝে মাঝে মনে হতো আমরাও হয়তো এই পৃথিবীতে থাকব না। তখন ভাবতাম একটা গান করে যাই। আমি না থাকলেও গানগুলো থেকে যাবে। এখন আবার দেশে করোনা পরিস্থিতির অবস্থা শোচনীয়। এই আবহে কেউ যদি গানটি শোনে আমার মনে হয়, সে একটা ইতিবাচক দিক দেখতে পাবে।

‘ইম্যাজিন’ গানটি রাজনৈতিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধবিরোধী, ধর্মের বিরোধিতা বিভিন্ন বিষয়ে অনেকেই লেননের এই গানটি ব্যবহার করেন। কবীর সেইটা অনুবাদে কীভাবে আনলেন? কবীর বলেন,

লেখার সময় রাজনৈতিক কিছু লিখব ভেবে লিখি নি। গানটি লেনন যখন লিখছেন সেদিন আর আজকের মধ্যে অনেকটা সময়কালের পার্থক্য। কিন্তু মূলভাব একই। আমি আমার সময়ের ছবিও তুলতে চেয়েছি। আমি পরবর্তীকালে যখন রাজনৈতিক মঞ্চে গিয়ে অনুষ্ঠান করি। মনে হয়, স্বপ্ন দেখার গান সেই মঞ্চের প্রয়োজন। কৃষক আন্দোলন, শ্রমজীবী ক্যান্টিনের মতো জায়গায় এই গানটি গাই আমি। বিশেষত লেনন সারা জীবন নাস্তিকতা নিয়ে কথা বলেছেন। ইম্যাজিন গানেও ধর্মের বিরুদ্ধে বলেছেন। আমি নিজেও নাস্তিক। সেটাই আজকের সময়ের আঙ্গিকে যখন দেখি তখন লিখছি, ‘নেই ধর্ম নেই, ধর্ম ধাতে সয় না!

কবীর এবং শিবাশিসের নতুন গান আসার খবরে উৎসাহী বাংলা গানের শ্রোতারা। ‘স্বপ্ন দেখার গান’ এর মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন অনেকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *