টাবো থেকে কাজা: এক অলৌকিক যাত্রাপথ (তৃতীয় পর্ব)

এখনই শেয়ার করুন

টাবো থেকে কাজা: এক অলৌকিক যাত্রাপথ

অর্ক দত্ত

আদিগন্ত হিমালয়ের কোলে লুকিয়ে থাকা স্পিতি ভ্যালি গেলে অনাস্বাদিত সৌন্দর্যের সন্ধান মেলে। প্রতিটি বাঁকেই লুকিয়ে আছে অজস্র মণি-মানিক্য।

দ্বিতীয় পর্বের পর

তৃতীয় পর্ব

হিমালয় যেহেতু ভঙ্গিল পর্বত তাই ভূ-বিজ্ঞানীরা এর ভাঁজে ভাঁজে রহস্যের উদঘাটন করতে পারবেন, কিন্তু আমাদের মত সাধারণ পর্যটকের সাদা চোখে যা প্রতিভাত হবে তাও কিন্তু কম চিত্তাকর্ষক নয়। অনেক জায়গাতেই শিলাস্তরে ঊর্ধভঙ্গ বা অধোভঙ্গ রেখা সুষ্পষ্টভাবে সজ্জিত। চতুর্দিক থেকে ধৌলাধার, পিরপঞ্জাল ইত্যাদি সুউচ্চ পর্বতশ্রেণী বেষ্টিত এই বৃষ্টিচ্ছায় (যেহেতু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম) অঞ্চলে বায়ুর প্রবল গতিবেগ প্রস্তর রাশির ক্ষয় এবং তার সঞ্চয়, উভয় কাজেই সিদ্ধহস্ত। তার সাথে সঙ্গ দেয় বিভিন্ন অস্থায়ী জলধারা, সেটা বরফ গলনের ফলে সৃষ্ট হতে পারে বা নামমাত্র বৃষ্টির কারণে উৎপন্ন।

এইসব সরু সরু কিন্তু সদা-চঞ্চল জলরাশি যখন পাহাড়ের ওপর থেকে ক্রমশ নীচের দিকে আসে, তার গতিবেগ হ্রাস পায় কিন্তু পার্শ্বক্ষয় বেশি হয় বলে প্রস্থে বড় হতে থাকে। এইভাবে পাহাড়ের প্রায় পাদদেশ বরাবর অঞ্চলে চলে আসার পর ওই জলের সাথে মিশে থাকা বন্ধু-বান্ধবদের (নুড়ি-পাথর-কাঁকর-বালি-মাটি ইত্যাদি) মধ্যে কিছুজন ঢাল বরাবর সঞ্চিত হয়ে তিনকোনা ত্রিভুজ আকৃতির যে বিশেষ গঠন তৈরি করে সেটাই হল, ‘অ্যালুভিয়াল ফ্যান’ বা ‘পলল ব্যঞ্জনী’। শেষে পাহাড়ের একেবারে নীচের দিকে, নদী সংলগ্ন অঞ্চলে ওই ‘ফ্যান’গুলি পরস্পর জুড়ে গিয়ে নরম মাটি-কাদা-ঝুরো বালি মিশ্রিত প্রায় সমতল ভূমি বা ‘বাজাদা’য় পরিণত হয়। এর কিছুটা ওপরের দিকে পলল ব্যঞ্জনীর মধ্যে অবস্থিত ক্ষুদ্র ও হালকা কণাগুলি বায়ুর তীব্র গতির সাথে তাল মিলিয়ে অপসারিত হয়ে গেলে পড়ে থাকে কিঞ্চিৎ বড় ধরণের নুড়ি-পাথর, যারা আবার একে অপরের সঙ্গে মিলে মিশে ‘পেডিমেন্ট’ সৃষ্টি করে।

সত্যি বলতে কী, স্পিতির হাত ধরে চলতে চলতে প্রতি মুহূর্তেই এই রকম রাশি রাশি রত্ন-সম্ভারের সন্ধান পাওয়া যায়। কোনও একটি নদী-বাঁক ঘুরেই হয়তো দেখা গেল সে তীব্র গতিতে ‘জিগজ্যাগ’ ছন্দে ‘ইন্টারলকিং স্পার’গুলির সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে অপসৃয়মান। এক ঝলক তাকিয়ে এইরূপ গতিপথ দর্শনে বিস্মিত হলেও, ভাল করে দেখলে কিন্তু সহজেই বোঝা যায়, নদী পর্বতগাত্রের কঠিন শিলাস্তরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে হার স্বীকার করতে বাধ্য হলেও নরম শিলাকে ভেঙেচুরে সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছে, তাই তার এইরূপ মায়াবী গতিপথ। এই একই সূত্র কিন্তু বায়ুপ্রবাহও অনুসরণ করে। তারাও ওপর-নীচে বা পাশাপাশি থাকা দু’রকমের শিলাস্তরের মধ্যে কোমল খণ্ডগুলোকেই টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে নিয়ে যায়। গতিশীল বায়ুর সঙ্গে লড়াই-এ জয়প্রাপ্ত কঠিন শিলা, বীর দর্পে মস্তক উঁচু করে উল্লম্ব স্তম্ভ বা টেবিল আকৃতির ‘জুইগেন’ অথবা উঁচু-নিচু ভূমি বা ‘ইয়ারদাঙ’ সৃষ্টি করে। এছাড়াও নদীতীরের দুই পার্শ্বে প্রায়শই দেখা যায় সুউচ্চ কিন্তু সূচাকৃতি প্রস্তরখণ্ডের ঘন সন্নিবেশ।

টাবো থেকে শুরু করে ধানকার-কাজা-মাড হয়ে লোসার পর্যন্ত বিস্তৃত স্পিতি এবং পিন উপত্যকার সমগ্র অঞ্চলের পরতে পরতে বিরাজমান তিব্বতি সংস্কৃতির অনাড়ম্বর অবিস্মরণীয় মাধুর্য। ধর্মের সঙ্গে ইতিহাসের, ভূগোলের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার অকল্পনীয় জোটবন্ধন। কমিক, হিকিম, কিবের, যেদিকেই যাওয়া যাক, সবসময়ই মনে হবে, পৃথিবীর মধ্যে ‘এ এক অন্য পৃথিবী’। শহুরে যান্ত্রিক সভ্যতার বাইরে অন্য এক স্বর্গরাজ্য। রুক্ষ প্রকৃতি যেখানে শান্ত, সমাহিত, নিস্তব্ধ।

শ্বাসবায়ুর অপ্রতুলতা, প্রবল তুষারপাত, কৃষিকাজের প্রতিকূল পরিস্থিতি, সবকিছুকে অতিক্রম করেই অতিবাহিত হয় এখানকার অধিবাসীদের প্রাত্যহিক দিনলিপি। সঙ্গে থাকে প্রস্তর-লিপির অদ্ভুত ভাস্কর্য, পর্বত-গাত্রের জ্যামিতিক চিত্র, স্বপ্ন-নীল নৈসর্গিক দৃশ্যপট ও তুষারশুভ্র মেঘচন্দ্রহার। ক্ষণে ক্ষণে বিচ্ছুরিত হয় জ্যোতির্ময় বজ্রশিখা আর কৃষ্ণবর্ণ রাত্রির সুরম্য ছায়াপথ। সীমাহীন সৌন্দর্য্য-পথের ধূলিকণায় মিশে থাকে গুরু রিনপোচের অলৌকিক অমোঘ উপস্থিতি।

——————————–

ভ্রমণ বিভাগে লিখলেন অর্ক দত্ত

অন্যান্যা লেখা:

পাহাড়ে পাইন (প্রথম পর্ব)— অর্ক দত্ত
পাহাড়ে পাইন (দ্বিতীয় পর্ব)— অর্ক দত্ত

পাহাড়ে পাইন (প্রথম পর্ব) বিবিধ

অর্ক দত্ত

যোগাযোগ: arkadatta100@gmail.com


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।