মল বা পার্লারে গেলে হাঁ করে দেখে অনেকে, হুইলচেয়ারই শক্তি ‘শিক্ষারত্ন’ স্বরূপার

এখনই শেয়ার করুন

সমরেশ দাস: প্রতিবন্ধকতার সংজ্ঞা কী? খাতায় কলমে ‘বিশেষভাবে সক্ষম’ কথাটি ব্যবহার হলেও কার্যক্ষেত্রে আমরা কতটা মানি? এর উত্তর আমরা অল্পবিস্তর সবাই-ই জানি। পথেঘাটে মাঝেমধ্যেই সহ্য করতে হয় বিভিন্ন ‘বিশেষণ’। উঠে দাঁড়াতে সাহায্য পাওয়ার বদলে তাঁরা যে বাক্যবাণে বিদ্ধ হন, তা কী প্রতিক্রিয়া ফেলে তাঁদের মনে? বোধহয় মনে মনেই শক্তি সঞ্চয় করেন এবং একটা সময় যোগ্য জবাব দেন সব ব্যাঙ্গবিদ্রুপের। আসলে হুইলচেয়ার যাঁর নিত্য সঙ্গী, তিনি উড়তে জানেন। শিক্ষকতা শুরুর প্রথমদিকে যাঁকে সহ্য করতে হয়েছে গঞ্জনা, সেই মেয়ে কীভাবে ছ’বছর আগেই শিক্ষারত্নের খেতাব ছিনিয়ে নিতে পারেন? কিংবা ‘এভারেস্ট শৃঙ্গে’ পৌঁছনোর স্বপ্ন কী করে দেখতে পারেন তিনি? বর্ধমানের স্বরূপা সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন। হুইলচেয়ারে বসে বসেই যে ঘর তিনি বেঁধেছিলেন, সেখানে প্রতিবন্ধকতা শব্দটা ছিল না। বরং সাফল্য, ঘুরে দাঁড়ানো, সর্বোপরি, উঠে দাঁড়ানোর বীজমন্ত্রে ঠাসা ছিল সেই ঘর। আজ সাফল্যের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তিনিই মন্ত্র শেখাচ্ছেন আর পাঁচজনকে… লড়াইয়ের মন্ত্র।

বর্ধমানের স্বরূপা দাসের নাম আজ হয়তো অনেকেই জানেন। তবে জীবনের জার্নিটা শুরু হয়েছিল অন্যভাবে। পূর্ব বর্ধমানের নতুন পল্লীর এক ছোট্ট মেয়ে স্বরূপা। জন্মের ঠিক ৩-৪ মাস পরেই ধরা পড়ে স্পাইনাল কর্ডে ছোট্ট আঁচিলের মতো টিউমার। ১০ মাস বয়স যখন, তখন সারা পিঠ জুড়ে…। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দেন, ‘অপারেশন করতে হবে। আর যদি অপারেশন না করা হয়, তাহলে পরবর্তীকালে ব্রেনে অ্যাফেক্ট করতে পারে।’ এরপর এনআরএস-এ নিয়ে যাওয়া হয় স্বরূপাকে। তাঁর মায়ের জেদ ছিল বরাবরই। কারণ তিনি মনে করেন, স্বরূপা স্বাভাবিক একটা মেয়ে। তাই স্বরূপার সঙ্গে সঙ্গে লড়াই শুরু হয় পরিবারেরও। এরপর অপারেশন হয়। তিনদিন কোনও জ্ঞান ছিল না স্বরূপার। অপারেশনের পর তাঁর লোয়ার পোর্শন অকেজো হয়ে যায়। অপারেশন চলাকালীন বেশ কিছু নার্ভ নষ্ট হওয়ার ফলেই এই ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্বরূপা। যদিও চিকিৎসকদের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল লোয়ার পোর্শন অকেজো হওয়ার সম্ভাবনার কথা। এরপর থেকে হুইলচেয়ারই নিত্যসঙ্গী স্বরূপার। তবে তাঁকে সন্তানের মতো বরাবরই আগলে রেখেছে তাঁর পরিবার। লড়াই শুরু হয় তাকে নিয়ে। হারতে না পারার লড়াই, একপ্রকার নতুনভাবে বাঁচার লড়াই।

মল বা পার্লারে গেলে হাঁ করে তাকায় অনেকেই, হুইলচেয়ারই শক্তি ‘শিক্ষারত্ন’ স্বরূপার

২০০৫ সালে মাস্টার্স চলাকালীন আবেদন করেছিলেন স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায়। ২০০৬ সাল থেকেই শিক্ষকতা করছেন তিনি। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিতে চাইছিল না বলেই জানিয়েছেন তিনি। কারণ সেক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি হয়েছিল হুইলচেয়ার। যদিও পরবর্তীকালে শর্তের ভিত্তিতে রাজি হয় কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে মধ্যস্থতার কাজ করে স্কুল সার্ভিস কমিশন। যদিও স্কুলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। স্কুল সার্ভিস পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক করা সত্ত্বেও চাকরিক্ষেত্রে সবসময় একটা নজরদারি চলত স্বরূপার ওপর। একদিন এমনও হয়েছে, স্বরূপা পড়াতে পারছেন কি না, তা দেখার জন্য ক্লাসরুমে বসেছিলেন স্কুলেরই সেক্রেটারি। যদিও খুব একটা গায়ে মাখেননি স্বরূপা। নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাসী বরাবরই। তবে সেদিনই ঘটেছিল একটা কাকতালীয় ঘটনা। বাংলার প্রথমসারির একটি সংবাদমাধ্যমের তরফে এক প্রতিনিধি সেদিন স্বরূপার স্কুলে গিয়ে এই দৃশ্য দেখেন। তারপর প্রকাশ্যে আসে স্বরূপার লড়াইয়ের কাহিনি।

তবে শেষমেশ জিতেছিলেন স্বরূপা। মাত্র ২০-২৫ দিনের মধ্যেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পাশে পেয়েছিলেন তিনি। বন্ধু ভাবে স্বরূপাকে। আর স্বরূপা তো তাদের নিজের সন্তান বলেই দাবি করেন। ধীরে ধীরে স্কুল কর্তৃপক্ষেরও মন জয় করেছিলেন তিনি। সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। এই বিষয়ে স্বরূপার কোনও আক্ষেপও নেই। সময়ে বিশ্বাস রাখেন তিনি। স্বরূপা বলেন, ‘এখন এমন হয়েছে, আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে মেয়ের মতো ভালবাসে। সহকর্মীরাও বন্ধুর মতো আচরণ করে। আমাদের মধ্যে আর কোনও দূরত্ব নেই।’ তবে এখানেই থেমে থাকেনি।

মল বা পার্লারে গেলে হাঁ করে তাকায় অনেকেই, হুইলচেয়ারই শক্তি ‘শিক্ষারত্ন’ স্বরূপার

২০১১ সালে রাজ্যপালের থেকে পুরস্কার পেয়েছেন স্বরূপা। এরপর ২০১৪ সালে শিক্ষারত্ন পুরস্কার। এভাবেই চলছে জার্নি। তবে স্বরূপা বিশ্বাস করেন, ‘একটা পুরস্কার পাওয়া মানেই আমার দায়িত্ব বাড়ল। আর কাজই তো আমার ধর্ম।’ একসময় ভেবেছিলেন কবিতা লিখে সমাজ পাল্টাবেন। একটি কবিতার বইও প্রকাশ পেয়েছে স্বরূপার। তবে লেখালিখি এখনও চলছে। লিখছেন নাটকের স্ক্রিপ্ট। নিয়মিত থিয়েটার দেখাও তাঁর নেশা।

তবে বিশেষভাবে সক্ষম হওয়ার কারণে নানা সমস্যার মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। তিনি বলেন, ‘ট্রেন হোক বা বাস, এমনকী, অন্যান্য বহু জায়গায় বিশেষভাবে সক্ষম কেউ একা যাতায়াত করলে নানা হেনস্থার শিকার হন। আসলে আমাদের জন্য সব জায়গায় উপযুক্ত বন্দোবস্তই থাকে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, যখন হুইলচেয়ারে বসে আমি মার্কেটিং করছি বা পার্লারে যাচ্ছি কিংবা অন্য কোথাও যাচ্ছি, তখন অনেকেই হাঁ করে থাকেন। এমন ভাব করেন যেন আমরা অন্য গ্রহের প্রাণী। আজ স্বাধীনতার এতবছর পরও আমাদের প্রান্তিক মনে করা হয়। আমি যখন চাকরি পাই, তখন কেউ কেউ বাড়িতে এসে জানতে চেয়েছিল, আমি পুরো মাইনে পাই কি না। আমাদের লড়াইটা কিন্তু এই চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধেই। এর জন্য আমাদের আত্মবিশ্বাসটা বাড়াতে হবে, সবকিছু জয় করার জন্য। আজ আমাকে হয়তো কেউ সম্মান করছেন, শ্রদ্ধা করছেন। কিন্তু কীভাবে আদায় করতে হয়েছে এগুলো? ৩৬ বছরের লড়াই আছে এর নেপথ্যে। তবে এখানেই শেষ নয়। এই লড়াই আজও করতে হচ্ছে। আর ভবিষ্যতেও হয়তো।’

তবে এই বিষয়ে তাঁর মুখে আক্ষেপের কথাও শোনা যায়। স্বরূপা বলেন, ‘যেখানে তৃতীয় লিঙ্গ বা সমকামী মানুষদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা হয়, যেখানে কন্যাসন্তান জন্মালে এখনও মেরে ফেলার ঘটনা কানে আসে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য সমাজ কতটা ভাববে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমাদের সমাজ অনেক ক্ষেত্রে এখনও মধ্যযুগীয় অন্ধকারেই রয়েছে।’

মল বা পার্লারে গেলে হাঁ করে তাকায় অনেকেই, হুইলচেয়ারই শক্তি ‘শিক্ষারত্ন’ স্বরূপার

আসলে লড়াইটা মানসিকতার বিরুদ্ধে। এমনটাই বিশ্বাস করেন স্বরূপা। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, শারীরিক বা দৈহিকভাবে কেউ প্রতিবন্ধী হয় না, প্রতিবন্ধী হয় মানসিকতায়। যাদের মানসিক চিন্তাভাবনা আধুনিকতা থেকে বহু পেছনে পড়ে রয়েছে, তারাই আসলে প্রতিবন্ধী। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া দরকার, আমরাও পারি। সাহায্য বা করুণার হাত নয়, আমরা চাই সহযোদ্ধার হাত।’

মাসুদুর রহমান যাঁর রোলমডেল, তাঁর কাছে প্রতিবন্ধকতা বলে কিছু থাকে কি? বোধহয় নয়। তারই দৃষ্টান্ত যেন বর্ধমানের স্বরূপা।

 


এখনই শেয়ার করুন

One thought on “মল বা পার্লারে গেলে হাঁ করে দেখে অনেকে, হুইলচেয়ারই শক্তি ‘শিক্ষারত্ন’ স্বরূপার

  • September 15, 2020 at 3:51 pm
    Permalink

    ভীষণ সুন্দর লেখা। প্রতিবন্ধকতা শরীরে নয়, মূলত মানসিকতাতেই থাকে এই চরম সত‍্যটা ভীষণ মানি। এনারা কেবল প্রতিবন্ধী মানুষদেরই নন, সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের কাছেও একটা খুব বড়ো অনুপ্রেরণা। অনেক শুভেচ্ছা!!💐💐💐

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *