সমকামী পেঙ্গুইন কাপল: রয়-সিলো থেকে স্পেহেন-ম্যাজিক

এখনই শেয়ার করুন

সমকামী পেঙ্গুইন কাপল: রয়-সিলো থেকে স্পেহেন-ম্যাজিক লিখেছেন কন্ট্রিবিউটর সনৎ মাইতি। চাইলে আপনিও কন্ট্রিবিউটর হিসেবে লিখতে পারেন। লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন অথবা মেইল করুন আমাদের। মেইল আইডি: bibidho.in@gmail.com

 

কথায় বলে, প্রেমের পোকা মাথায় ঢুকলে মানুষের আর হুঁশ থাকে না, মানুষ প্রেমে অন্ধ হয়ে পড়ে। প্রেম ‘জাতপাত’, উঁচুনিচু, গরিব-বড়লোক কোনও ভেদাভেদই মানে না। এমনকী, প্রেমের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের সেই সেকেলে ভাবনাও দূর হয়েছে। যুগে যুগে সমকামীকে সমাজ অস্বীকার করলেও আজ এই ২১ শতকে এসে সমলিঙ্গের প্রেমকে প্রকৃতিগতভাবে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। তাছাড়া আইনও সম্মতি দিয়েছে সমকামিতাকে। তবে মনুষ্য সমাজে সমকামী সম্পর্ক যুগ যুগ ধরেই হয়ে আসছে। কিন্তু শুনলে অনেকেই হয়তো অবাক হতে পারেন, মানুষ ছাড়া আরও বিভিন্ন পশুপাখিদের মধ্যেও সমকামিতা লক্ষ্য করা যায়। যাদের মধ্যে অন্যতম হল মানুষের মতোই দু’পায়ে হেলেদুলে ঘুরে বেড়ানো মিষ্টি পেঙ্গুইন।

আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্ত ট্রাম্পকে কী বলে আশীর্বাদ করলেন বীরেন্দ্র সেহবাগ?

রয়, সিলো এবং ট্যাংগো

সালটা ১৯৯৮। নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্ক চিড়িয়াখানার ঘটনা। সেখানে বাস করে চিনস্ট্রিপ প্রজাতির দুই পেঙ্গুইন। খুবই প্রেমময় তাদের সম্পর্ক। নিজেদের মধ্যে সবসময় মশগুল হয়ে আছে। কখনও গলা ছাড়িয়ে একসাথে ডেকে উঠছে, তো কখনও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। যাকে বলে একদম মাখো মাখো প্রেম। এপর্যন্ত তো সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাঁধল তখন, যখন চিড়িয়াখানার এক কর্মচারী লক্ষ্য করলেন, এই প্রেমিক দম্পতির সম্পর্ক আদৌ স্ত্রী-পুরুষের ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্ক নয়, আসলে তারা দুজনেই পুরুষ। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে খবরটা চাউর হতেই তারা ঠিক করলেন, এধরনের ‘অসামাজিক সম্পর্ক’  আর বেশিদিন চলতে দেওয়া যায় না; এর একটা বিহিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তাই তারা ঠিক করলেন রয় ও সিলো নামের এই দুই পুরুষ পেঙ্গুইনের খাঁচায় কিছু নারী পেঙ্গুইন ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই যৌন আবেদনময়ী নারী পেঙ্গুইনদের দেখে রয় ও সিলো নিশ্চয়ই একে অপরকে ভুলে যাবে এবং সুন্দরীদের পিছু নেবে। যেমন ভাবা, তেমন কাজ— রাতারাতি রয় ও সিলোর কাছে কিছু নারী পেঙ্গুইনদের ছেড়ে দেওয়া হল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, যা ভাবা হয়েছিল, হচ্ছে তার সম্পূর্ণ উল্টো। অর্থাৎ রয় ও সিলো মেয়ে পেঙ্গুইনের পেছনে ছুটে বেড়ানো তো দূরের কথা, ওদের দিকে তাকিয়ে দেখছে না পর্যন্ত। এতেও  চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিজেদের হার স্বীকার করলেন না। বরং রয়-সিলোকে আলাদা করার জন্য নিত্যনতুন ফন্দি আঁটতে লাগলেন।

সমকামী পেঙ্গুইন কাপল: রয়-সিলো থেকে স্পেহেন-ম্যাজিক

ইতিমধ্যে রয় ও সিলো আর একটা অবাক করা ঘটনা ঘটাল। তারা নিজেদের খাঁচার সামনে পড়ে থাকা খানিক ডিমের মত দেখতে একটি পাথর তুলে এনে নিজেদের বাসায় রাখল এবং সেই পাথরটিকে পরস্পর নিয়ম করে তা দিতে শুরু করল। এই ঘটনা চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের প্রচলিত ভাবনাকে প্রায় নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তখনই প্রথম তারা সব কিছু ভুলে এই দম্পতির প্রেমকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেন ও বুঝতে পারলেন, রয় ও সিলো সত্যিই একে ওপরকে সত্যিই খুব ভালোবাসে, হোক না তারা দুজনেই পুরুষ।

আরও পড়ুন: আত্মহত্যার মুখ থেকে শ’য়ে শ’য়ে মানুষকে ফিরিয়ে এনেছে যে দম্পতি

কিছুদিন পর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ রয় ও সিলোর সমকামী সম্পর্ককে সম্মান জানিয়ে তাদের বাসায় থাকা পাথরটিকে সরিয়ে অন্য পেঙ্গুইন দম্পতির বাসা থেকে চুরি করা একটি ডিম তাদের বাসায় রেখে এল। মাসখানেক সেই ডিমে নিয়ম করে তা দিয়ে রয় ও সিলো ‘জন্ম’ দেয় এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের। এই মেয়ে পেঙ্গুইনটির নাম চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ রাখে ‘ট্যাংগো’। পরবর্তীকালে ট্যাংগোর মধ্যেও সমকামী আচরণ লক্ষ্য করা যায়। ‘তানুজি’ নামে এক স্ত্রী পেঙ্গুইনের সাথে সংসার পেতে ছিল সে।

 

স্পেহেন ও ম্যাজিক

সমকামী পেঙ্গুইন কাপল: রয়-সিলো থেকে স্পেহেন-ম্যাজিক

স্পেহেন ও ম্যাজিক ‘সিডনি সি লাইফ অ্যাকোরিয়াম’-এর প্রথম সমকামী পেঙ্গুইন যুগল এবং পাশাপাশি তাদের জুটি অ্যাকোরিয়ামের কর্মীদের কাছে বিস্ময়কর। সেই বিস্ময় শুধুমাত্র তারা যে সমকামী, তার জন্য নয়। বরং তাদের পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা এবং তাদের পিতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার জন্যও বটে। সাধারণত বেশিরভাগ পেঙ্গুইন দম্পতিদের মধ্যে পিতা-মাতা হিসেবে যেখানে দায়িত্বশীলতার অভাব দেখা যায়, সেখানে স্পেহেন ও ম্যাজিক নামের গিটো প্রজাতির এই দুই সমকামী পেঙ্গুইন অন্যান্য সব পেঙ্গুইনদের থেকে অনেকটাই আলাদা। তারা প্রথমবারের দম্পতি হিসেবেই পুরো অ্যকোরিয়ামের সবচেয়ে বড় বাসা বানানো এবং সেই বাসায় তারা দায়িত্ব নিয়ে অ্যাকোরিয়াম কর্তৃপক্ষের দেওয়া নকল ডিমকেই তা দিয়েছিল। অ্যাকোরিয়ামের ম্যানেজার এই দুই গে পেঙ্গুইনকে পরীক্ষা করার জন্য প্রথমবারে একটি নকল ডিম দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নকল ডিমটিকে নিয়ে তাদের দায়িত্ববোধ দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর তাদের একটি সত্যিকারের ডিম দেওয়া হয় এবং ২০১৮ সালের অক্টোবরে সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর স্পেহেন ও ম্যাজিকএর দর্শক সংখ্যা বাড়তে থেকে এবং অ্যাকোরিয়ামে বেড়াতে আসা মানুষজন খোঁজ নিতে থাকে তাদের।

আরও পড়ুন: শ্রমিকদের কথা ভেবেই ম্যাগি আবিষ্কার, নামেও লুকিয়ে রহস্য

ঠিক সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার ‘সমপ্রেম বিবাহ’কে আইনি স্বীকৃতি দেবার জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন সমকামীরা। সমলিঙ্গের বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি না দেবার সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা ছিল, এই সময়েই স্পেহেন ও ম্যাজিকের কাণ্ড সংবাদপত্রে আসে এবং এই দুই পেঙ্গুইন অস্ট্রেলিয়ার ‘গে রাইট্‌স মুভমেন্টে’র সিম্বল হয়ে ওঠে রাতারাতি।

 

কন্ট্রিবিউটরের অন্যান্য লেখা:

সান্তা হতে চান? প্রশিক্ষণ দেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

কন্ট্রিবিউটর: সনৎ মাইতি

যোগাযোগ: ফেসবুক প্রোফাইল   ফেসবুক পেজ


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।