সরল দিনের গদ্য: সৈকত বালা

এখনই শেয়ার করুন

মুক্তগদ্য: সরল দিনের গদ্য

লেখক: সৈকত বালা (বাংলা বিভাগ, বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন)

ফিরি করার পদ্ধতিটা বড় অদ্ভুত, ‘এ চেলেলেলেরে কেঁচুয়া শাক লিবে লাকি গো’। বস্তুত প্রথমদিন শুনে ভেবেছিলাম, কেঁচোর আবার শাক! তারপর দেখলাম, ও হরি! এতো কচু শাক। একটা লড়ঝরে সাইকেল, রক্তাভ কাপড়ে নীচের দিকটা আবৃত, পেশিবহুল নিটোল চেহারা আর রং অবিকল পাঁকের মতো। আর ওই পাঁকে পঙ্কজ হয়ে থেকে গিয়েছে ওর আদুড় গায়ে, গলায় ঝুলতে থাকা বিভিন্ন রকম তুলসি কাঠ, বেল কাঠের মালা। সঙ্গে পুরু ঠোঁট ভেদ করে আসা হাসিটুকু। দরদাম বিশেষ কিছু জানে না। ( সরল দিনের গদ্য : সৈকত বালা)

সবরকম আপডেট পেতে লাইক করুন বিবিধ-র ফেসবুক পেজ

নিজে একটা যা হোক করে বলবে। তারপর বাবা বা মা তার থেকে দু’ধাপ কমিয়ে দেবে। তারপর ‘লোকদেখানো’ রাগ দেখিয়ে বিষমভাবে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মাথাটা ঝাঁকিয়ে সাইকেল নিয়ে হনহন হাঁটা। তারপর যখন দেখবে কেউ নেই, তখন আবার ফিরে এসে ডাকাডাকি করবে- ‘কি গো নিলে না!’ তখন বাবা হাসতে হাসতে ওর বলা দামটা দিতেই ‘কত্তা একবার কেত্তনের আসরে আপনার পায়ের ধুলো পড়লি যে কি ভালো হতো!’- এই বলে গুনগুন করতে করতেই হঠাৎ ‘কেচু নেবে গো, কেঁচুয়া শাক!’…

কচুর সময় কচু। আর শাপলার সময় শাপলা। এই-ই ওর পুঁজি। (সরল দিনের গদ্য: সৈকত বালা)

আরও পড়ুন: সৌমিত্রের উদ্দেশ্যে গান গাইলেন সুজাতা! (দেখুন ভিডিও)

বেশ কয়েক বছর হল, কাছের মানুষ দূরের নতুনদের কাছে পরিচয় হিসেবে হরিণঘাটা শব্দটির পেছনে এখন ছোট করে ওই ‘টাউন’ শব্দটি বসায়। তা বসাক। টাউন কি গ্রাম, আমার কোনওকালেই কিছু এসে যেত না। আবার অনেকটা এসে অনেকটা চলেও যেতো, যদি কচু-কাকুর ওই অদ্ভুত ফিরি করার পদ্ধতিটা দীর্ঘদিন আমার কানে না যেত। বাবার কাছে শুনেছিলাম, ওর বাড়িটা বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি। ওখানের জলাভূমি থেকে ও ওসব তোলে। বাড়িতে নাকি একটা মনসা মন্দির আছে বেশ বড়সড়। আজ বিকেলে মাসকয়েক পর হঠাৎ যখন এল, দেখলাম চেহারা আরও পেটাই। ঝাঁকড়া চুল আরও ঝাঁকড়া।

বললাম, এই, তুমি নাকি গান জানো, একটা ধরো না গো! প্রথমে তো রাজি হয় না। কিন্তু আজ দেখি আমার থেকে আমার বোন আরও বেশি নাছোড়বান্দা! ও-ও পীড়াপীড়ি শুরু করল। ‘কাপালিক কাকু, শুরু করো না!’

সরল হাসি হেসে বলল, ‘ম্যামরি ভালা না গো। ভুলে যাই। আর যে গান আমি বুঝি না, তা গাই কি করে? তাছাড়া তোমরাই বা বুঝবা কি করে?’ বাবা কচুর দামটা দিতে দিতে বলল, তোমার বোঝাই আমাদের বোঝা। নাও শুরু করো তো তোমার গান! কালীতলায় মা আর পাড়া সম্পর্কের এক পিসি কথা বলছিলেন। ওরাও ওখান থেকে বলল, ‘একটু জোরে করো গো!’ লাজুক হেসে গৌরচন্দ্রিকায় শুনলাম- ‘মায়ের সাধনা শুরু করেছি, মা যা দেন! তবে আমি গাইতে গাইতে চলে যাব। আটকিও না।’

আরও পড়ুন: বসু বিজ্ঞান মন্দির থেকে নারীশিক্ষায় ভূমিকা, ‘জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী’ই থেকে গেলেন অবলা

বাড়ির সামনে, ক্লাব মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুরু হলো গান। প্রথমে গুনগুন। তারপর হঠাৎ যেই ‘ওগো ভগবান’ বলে সুরটা সরে গিয়ে বাঁজখাই স্বর বেড়িয়ে পড়ল, ওমনি আমার পায়ের কাছে শুয়ে থাকা আমার ন্যাওটা কুকুরটা তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে ঘেউ ঘেউ জুড়ে দিল। কোনওরকমে ওর মুখটা চেপে ধরলাম। কিন্তু ততক্ষণে পাশের বাড়ির দোতলার জানলা খুলে উঁকিঝুঁকি শুরু হয়ে গেছে। ওদিকে কালীতলা থেকে সেই পিসি আর মা ফিকফিক করে হেসে চলেছে। বোন দেখলাম দুদ্দাড় করে ঘরে চলে গেল। জানি, এখন ঘরে গিয়ে ও হাসবে। অথচ ওর কাপালিক-কাকু ওই গগনবিদারি শব্দে তন্ময় হয়ে গেয়েই চলেছে। দেখলাম, ধীরে ধীরে ওর শরীর শান্ত হয়ে এল। সাইকেলটা ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে শুরু করল মদির ছন্দে হাঁটা। ওর লাল ধুতি, অনাবৃত কালো পিঠে বিকেলের রোদ। আর লোক জড়ো হয়ে যাওয়া কালীতলার সব হাসির ওপর দিয়ে ওর আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া ডান হাত যেন পরিষ্কার বলেছিল, তোমাদের রাখাল জন্ম মুছে গেছে। যুবক জন্ম মুছে গেছে। তাই এই গান তোমাদের নয়। এ শুধু আমার। শুধুই আমার…

মিনিট পাঁচেক পরও ওর গলা পাচ্ছি দূরে। প্রাইমারি স্কুলের ওখান থেকেও। তন্ময় হয়ে দেখে যাচ্ছি ওর মদির চলন। হঠাৎ বোনের একটা ধাক্কায় সম্বিত ফিরল। ইষৎ বিরক্তি নিয়েই বলল, ‘কী ভাবছিসটা কী তখন থেকে?’ চকিতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আপনা থেকেই বলে উঠলাম, ওকে তারাশঙ্কর কেন দেখলেন না…!

আরও পড়ুন: ব্লগ: মৃত্যুর ওপারে প্রেম — অঙ্কনা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সরল দিনের গদ্য লিখলেন সৈকত বালা

সৈকত বালা: ফেসবুক প্রোফাইল

ছবি: ইন্টারনেট


এখনই শেয়ার করুন

2 thoughts on “সরল দিনের গদ্য: সৈকত বালা

  • July 18, 2020 at 8:16 pm
    Permalink

    লাস্ট টা দারুণ ভাই ❤ অনেকদিন পর পড়লাম তোমার লেখা। ভাল লাগল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *