রিভিউ: রূপমের ‘একুশে একক’ যেন চেতনার অন্তরীপে এক চিলতে রোদ্দুর!

এখনই শেয়ার করুন

 

একটা অস্থির পরিবেশ। দেশ তথা রাজ্য জুড়ে। এরই মধ্যে চলতি বছরের প্রথম রূপম ইসলাম একক। স্বাভাবিকভাবেই অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে বর্তমান নানা সমস্যার কথা। আজ সামাজিক ও অসামাজিক আবহাওয়ায় চেতনা জরায় ভুগছে। চেতনার অন্তরীপে যে অন্ধকার, তার মধ্যে এই অনুষ্ঠান যেন এক ঝলক আলো। তা নিয়েই ‘ভক্তের চোখে‘ কলাম লিখলেন বিশ্বরূপ হাওলাদার

——————————————–

যদি একটু অন্যভাবে শুরু করি, তাহলে? ভাবো, চেতনা শুয়ে আছে জীর্ণ হলঘরে! তুমি তাকে রক্তপিণ্ডের মানুষও ভাবতে পারো; ক্ষতি নেই। আবার চেতনা ব্যক্তিগতভাবে একটি মানুষও হতে পারে। হতে পারে তার অনুভব করার ক্ষমতা আছে, প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা আছে। তার গতিবিধি একজন জীবন্ত মানুষের মতোই।

আজ সামাজিক ও অসামাজিক আবহাওয়ায় চেতনা জরায় ভুগছে। তাই তাকে সুস্থ করতে খানিকক্ষণ আগে মোজার্ট তাঁর আঙ্গুলের স্পর্শে পিয়ানো জুড়ে বিষাদ ছিড়য়ে গেছেন। রবার্ট ফ্রস্ট বাতলে গেছেন দু’টো পথ। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কানেকানে বলে গেছেন— তিনি কীভাবে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে চলে যেতে পারতেন! এসবের মাঝখানে কার্ট কোবেইন এসে চুপচাপ খানিকটা সময় কাটিয়ে চলে গেলেন। সবার মতে, চেতনার মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। নিরাশার নিরিখে কনভার্সের জুতো পরা একজন এসে বসলেন বহুদিন পুরোনো এক কাঠের চেয়ারে। যে-চেয়ার ব্যবহার করেছে আত্মহত্যা করতে চাওয়া বহুব্যর্থ শিল্পীরা।

কাঁচাপাকা চুলের মধ্যে দিয়ে দার্শনিক তুখোড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন চেতনাকে। জীবনের সম্ভবনা আদৌও আছে কি?— জানতে, সে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিল তাঁর স্পর্শকাতর পিয়ানোর বুকে। শোনা গেল হৃদস্পন্দন ধ্বনি। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিবেগ বাড়ল। চেতনা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। তাকিয়ে দেখো!

এ এক অদ্ভুত খেলা। পিয়ানো, পিয়ানো থেকে গিটার, আবার গিটার থেকে পিয়ানোতে ফিরে আসা। শুরু হল হরিশ নানজাপ্পার গল্প দিয়ে। একজন সাধারণ মানুষ গোটা মানবসম্প্রদায়ের জন্য কীভাবে প্রেরণা হতে পারে, সে-কথা গানের মাধ্যমে জানান দিল চেতনাকে; সূচনা হল এই সফরের। মনে করিয়ে দেওয়া হল মানুষই শেষ কথা। সবার উপরে মানুষ সত্য, ব্যক্তি বিশেষ সত্যি, তাহার উপরে নাই।

পথিক যেন আগেই তাঁর গন্তব্য জানেন। তাই “জন অফ আর্ক” গানের সূত্র ধরে রাজনীতি ও মাইথলজির গল্প দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন রাজনীতি ও সমাজ কীভাবে নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী বলি দিতে পারে এক ব্যক্তি বিশেষের, জন অফ আর্কের। আর সেই পরম্পরা; ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতেও ঘটে চলেছে সমান্তরালভাবে। বাতলে দিচ্ছে ‘হোক কলরব’ গানের মাধ্যমে।

গানে লেখা প্রতিটি লাইনের শরীর লুকিয়ে থাকে হাজার-হাজার গল্প। সময় অনুযায়ী শুধু গল্পের প্রেক্ষাপট বদলে যায়। চেতনাকে এই জীবন দর্শনের পথে দার্শনিক প্রথমেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে জীবন কতটা জরুরি, কিভাবে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠা যায়! তারপর বলে দিচ্ছে, কীভাবে তোমাকে ব্যবহার করা যেতে পারে সুবিধার্থে। সেখান থেকে দার্শনিক খুব মজার ছলে গানের মাধ্যমে প্রবেশ করছেন ভিন্ন মেজাজে। যেন হাল্কা জলপানের সাথে বলছেন ‘যিশুকেষ্ট’র গল্প। বললেন রক্ মিউজিক ছাড়াও কীভাবে বড় বড় লাফ দেওয়া যায় এবং কুমড়োর ঘ্যাটের উপকারিতা ইত্যাদি। এই ইত্যাদির মাধ্যমে দার্শনিকের গুপ্তচর চেতনার মনে পাচার করে দিয়েছেন জীবনের মন্ত্র। বাস্তবের কড়া দাওয়াই। দার্শনিক অভিজ্ঞতার পাতা থেকে বলছেন, ‘কেন পাখি হতে চেয়েছেন?’ স্বাধীনচেতার কথা বলতে-বলতে চেতনাকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দিলেন মুক্তিযুদ্ধের ‘বাংলাদেশ’-এ।

চেতনাকে বন্দুত্বের সুবাদে দার্শনিক শোনালেন, ‘শোনো আমরা কি সবাই’। জীবনের এত শত নৈতিকতার মাঝে ভালবাসার ঘোল ভাল করে ঘুলে দিলেন চেতনার বুকে। জীবনে ভালবাসা থাকলে ভালবাসার মানুষ চলে যাওয়া কতটা স্বাভাবিক, আর সে-চলে যাওয়া মেনে নেওয়াটা কতটা স্বাভাবিক হওয়া উচিত, বাতলে দিলেন গানে-গানে। একাকিত্ব ও আত্মমননের জন্য শোনালেন, ‘কেন করলে এরকম’। —চেনতাকে হাল ছাড়তে বারণ করেছেন দার্শনিক। এসবই দার্শনিকের বাতলে দেওয়া জীবনে হেঁটে যাওয়ার জন্য সাজানো রুটম্যাপ।

মইদুল ইসলাম মিদ্দার জন্য ব্যথার ডাকবাক্স থেকে জানানো হল যেকোনও অন্ধ দিগন্ত নিশিতে— হবে না তোমার সাথে দেখা। দার্শনিক এখানেও বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি ব্যান্ড নয়, ব্যান্ডের প্রতিটি ব্যক্তিবিশেষকে সমর্থন করছেন।

জীবনের প্রায় সবকিছুই চেতনা জানতে পেরেছে দার্শনিকের কাছে। দার্শনিক চেতনাকে আবার জীবন্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। নতুন ভোরের আলো দিয়েছেন। চেতনা জানতে পেরেছে স্বাধীনতার মানে। চিরকৃতজ্ঞ চেতনা এই নবজীবন লাভে দার্শনিকের কাছে যতটা পাখির মতো উড়তে শিখেছে, ঠিক এসবের শেষে সব ফেলে হাসিমুখে চলে যাওয়াটাও শিখে নিয়েছে। আনন্দ আর বিষাদের এক অদ্ভুত দলা পাকিয়েছে চেতনার অন্তরে। তার ভার নিয়েই চেতনার বাকিটা জীবন বেঁচে থাকা। হেঁটে যাওয়া নিজের খোঁজে।

আজ এই চেতনা আমাদের যে কেউ হতে পারে। আমি, তুমি বা আমরা সবাই। আমাদের চেতনার দার্শনিক হলেন রূপম ইসলাম। পুরো লেখায় এই দার্শনিক বড়ই রহস্যময়। রূপম ইসলাম আড়াল করে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দর্শন বহু রূপকের মাধ্যমে সঞ্চার করে দিচ্ছেন আমাদের মধ্যে। আজ আমরা শুধু ওঁর গান শুনছি। একটা সময় পর রূপম ইসলামের গান নিয়ে রিসার্চ করা হবে। মানুষ বুঝতে পারছে না সাহিত্যের এক গভীর টানেল থেকে চেতনার যাত্রা। স্মরণীয় হয়ে থাকবে রূপম ইসলাম একক— ‘একুশে একক’।

লিখলেন বিশ্বরূপ হাওলাদার


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।