Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের

অস্বাস্থ্যকর এই অস্থির পৃথিবী আবার শান্ত হবে। এই দুঃসময়ের যবনিকাপাত হয়ে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখলেও সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা আমাদের অজানা। তা বলে কি থেমে থাকবে আমাদের অভিযান? স্তব্ধ হয়ে যাবে সবকিছু? এই অস্থির সময় উতরোতে, ফের উদ্যম, উৎসাহে ঘুরে দাঁড়াতে লাগে একটা ডানা, একটু সঞ্জীবনী সুধা। ফের আমরা উঠি, দাঁড়াই, শিরদাঁড়া সোজা করে এগিয়ে চলি গন্তব্যে। আসলে অভিযান থেমে থাকে না। এটাই দস্তুর।

তবে ‘আছে কেউ না কেউ এর নেপথ্যে’। এখানে ভাগবিভাগ নেই, তবে সঞ্জীবনী সুধা আলবাত আছে।

গতকালের সন্ধ্যায় সাক্ষাৎ হয়েছিল এক আধুনিক চারণকবির সঙ্গে অনলাইন একক-এর মঞ্চে। আর তিনি হলেন রূপম ইসলাম। এই চারণ শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য গান করেন না, তাঁর গানের মাধ্যমে আমরা পাড়ি দিই এক অভিযানে। আরও আক্ষরিক অর্থে বলতে গেলে বলতে হবে একক অভিযানে।

আরও পড়ুন: রিভিউ: রূপমের ‘একুশে একক’ যেন চেতনার অন্তরীপে এক চিলতে রোদ্দুর!

ব্যক্তিগত পরিসর, স্বাধীনতা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে! রাজনৈতিক জঞ্জালে আবদ্ধ বর্তমান সমাজ। এমতাবস্থায় প্রয়োজন শিশুসুলভ সরলতার। অ্যালার্ম আর টুথপেস্ট নিয়েই কি শুধু ভোর হতে পারে? নিজেদের চেতনাগুলোকে আমরা ক্রীতদাসে পরিণত করে নিয়েছি। নতুন ভোর আনতে গেলে আমাদেরও ইব্রাহিমের মতো নিজেদের ক্রীতদাস-সম চেতনাকে বলি দিতে হবে, হতে হবে মুক্ত। প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা সেদিনই আসবে, যেদিন চেতনার মুক্তি হবে। আবার এটাও সত্যি, যে প্রযুক্তি প্রতি মুহূর্তে ল্যাজে খেলাচ্ছে, তাকেও তো দরকার। তাছাড়া এই মুহূর্তে যে ‘আদমিকে ল্যাজে খেলাচ্ছে ভাইরাস’, সেকথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন আধুনিক চারণকবি রূপম ইসলাম।

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 4

নতুনকে খুঁজে পেতে গেলে পুরনো চিন্তার বেষ্টনী খণ্ডন করে বেরিয়ে আসাই হল একমাত্র পথ। সেই পথ নিয়ে যায় এক নতুন পৃথিবীর দিকে। গ্যালিলিও একদিন সেই পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। রূপম তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে দেখিয়ে যান বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নতুন পৃথিবীর লক্ষ্যে পৌঁছানোর পন্থা। যে পথে হেঁটেই হরিদাস একদিন ডানা পেয়ে মুক্ত খোলা আকাশে উড়েছিল। গীতিকবি রূপম সেই মুক্তির কথা শোনালেন গানে গানে।

আরও পড়ুন: ভূত আর রূপম! যুক্তিবাদে ভর করেই পূজাবার্ষিকী-র দ্বিতীয় গল্প শোনালেন গায়ক

নতুন পৃথিবীর কল্পনাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর আস্থা রেখে যদি স্বপ্নগুলো সাজানো হয় তাহলে হয়তো এই পৃথিবী অনেক বেশি সুখরঙিন হবে। রাতের অন্ধকারকে মুছে দিতে তো একটা ছোট্ট জোনাকিও পারে। জোনাকির আলোতে রাতের অন্ধকারের সৌন্দর্য পরিদর্শন মনকে দেয় মুগ্ধতা। সে যতই কাচের ওপারে থাক না, জোনাকিরা আলোর কথা বলে, ভালর কথা বলে। বর্তমান পৃথিবীতে কিছু ব্যাভিচারবাদী মানুষ হয়তো এরকম ছোট্ট জোনাকিকে রাতের অন্ধকারে কবর দিচ্ছে। কিন্তু নতুন সকাল যে আসবেই, নতুন সূর্য উঠবেই, সেই সূর্যের আলোকেই এই ধরিত্রীতে হবে আলোকস্নান। চেতনায় সেই স্বপ্নের জাগরণ ঘটাতেই এসেছিলেন এই চারণ। রকস্টার রূপম।

নতুন সূর্য উঠেছে আকাশে
নতুন আলোকে আলোকস্নান।

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 3

অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকলেই সমাজের সিংহভাগ মানুষ নিজেকে এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত বলে মনে করেন, তাঁদের সমাজকে বিচার করার মাপকাঠিও তাই অর্থ কিংবা অর্থনীতির অঙ্ক। সেই অর্থ-কূপে ঢুকে পড়ে কিছু ভালবাসাও। সেই মুহূর্তে মিথ্যে হয়ে যায় সেই সব প্রতিশ্রুতি, যেখানে বলা হয় ভালবাসাই হয়তো সব কিছু হতে পারে। খোলা আকাশে উড়তে ভালবেসে বাঁচতে চাওয়া মানুষ এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সমাজে অপদার্থরূপে গণ্য হয়।  আধুনিক চারণকবির নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে অর্জিত সম্পত্তি এবং আনুপাতিক প্রেমের বেড়াজাল ছিঁড়ে স্বাধীন আকাশে ডানা মেলার মধ্যেই রয়েছে সত্যিকারের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া হয়তো ভালবাসা অসম্পূর্ণ। তাই অসম্পূর্ণ ভালোবাসার মৈত্রী চুক্তি বাতিল হোক নতুন পৃথিবীতে। তাছাড়া গানওয়ালা তো সাফ জানিয়েছেন, ‘এত হিসেব কষে কি প্রেম হয়?’ ‘চতুর্থ বিশ্ব’-এর গল্প বলতে গিয়ে এভাবেই একের পর এক উঠে এসেছে গান: ‘অপদার্থ জন্ম আমার’, ‘আরজে’… আকস্মিক আলিঙ্গনে শেষবেলায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘ফিরে চলো’।

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 2

এবার বিশ্ব-পরিবর্তন। কিন্তু উল্টো পথে। আদৌ কি উল্টো? রূপমোচিত পথে। ঢুকে পড়েন তৃতীয় বিশ্বে।

মানুষের প্রতি ভালবাসাই হলো ভালবাসার সবচেয়ে বড় আঙ্গিক। চরম নৈরাজ্য,রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং হিংস্রতা নতুন পৃথিবীর পথে বাধাসম। নতুনকে গড়তে হলে ইতিহাস পড়তে হয়। কিন্তু কোথায় পাবে মানুষ সেই সমাজের মানুষের ওপর ঘটে চলা অত্যাচারের ইতিহাস? তার সন্ধানও মানুষ পাবে। মৃত নগরীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানবে সেই মাফিয়ারাজের সেই অস্পৃশ্যতার কাহিনী। রূপমের প্রতিটা গান হয়তো সেই ইতিহাসের সাক্ষ্যরূপে গণ্য হবে নতুন পৃথিবীতে নতুন প্রজন্মের কাছে।

বর্তমান পৃথিবীতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এতটাই তীব্র যে একটি তরতাজা প্রাণ তার চাপে নিজেকে শেষ করে দিলেও সেই মৃত্যু নিয়ে বাণিজ্য হয়।

যে রক্তে রোহিত-কণিকা থাকে

সেই রক্ত-নুন খায় আমার স্বদেশ

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 7

হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মনুষ্যত্ব এবং স্বাধীনতা। রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে মানুষের স্বাধীনতাকে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের লোভে। কিন্তু তবুও দমিয়ে রাখা যাবে না আধুনিক চারণকবির স্বপ্নের পৃথিবীর নবজাতকদের।

নবজাতক যেদিন যুবক হয়ে উঠবে, সেদিন হবে সে মানুষের সৈন্য।সমাজ বদলের শুরুই হয় যুবসমাজকে দিয়ে। রাষ্ট্রনেতাদের আঘাতে জবাব দিতে লড়াই করতেই হবে। যুদ্ধের আগের রাতে যতই ধার্মিক গল্পের প্রলোভন আসুক না কেন, তবুও লক্ষ্যে স্থির থাকতেই হবে। নতুন পৃথিবী গড়ার সৈন্য হতে হবে,তবেই ফিরবে রাজনৈতিক বন্ধন থেকে স্বাধীনতা। যতই যা হোক, ভোটের আগের রাতে বুদ্ধি হারালে চলবে না!

নতুনকে গড়ার স্বপ্ন দেখলেই সেটা সত্যি হবে এরকম তো নয়। কঠিন বাস্তবতাকে অতিক্রম করে, হৃদয় ভেঙে তৈরি হয় স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ। ধ্বংস মানেই শেষ নয়, সেই থেকেই সৃষ্টি হয় ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম। এই কল্পনাকে বাস্তব করতে গেলে ভক্তিবাদের বদলে যুক্তিবাদকে গ্রহণ করতে হবে। নিজের স্থিতাবস্থা ভেঙে ফেলতে হবে। নতুনকে গ্রহণ করতে গেলে পুরনো ব্যাধিযুক্ত চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হতে হবে। এই চিন্তা-ভাবনার উপনীত হয়েই তো সফল হয়েছিল নবজাগরণ। গীতিকবি রূপম তাঁর গানের কথায় কালকে মনে করিয়ে দিলেন সেই পুরনো ইতিহাসের নবজাগরণকে।

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 1

সুন্দর সময়ের অনুভব মনের ভাবনাগুলোও নানা-ভাবে আবর্তিত করছিল। সেই সময়ই তিনি গেয়ে উঠলেন,

খেলিছে জলদেবী সুনীল সাগর জলে
তরঙ্গ লহর তোলে লীলায়িত কুন্তলে

আর সেই গানের সুরে কম্পিত হল উপস্থিত সকল শ্রোতার হৃদরন্ধ্র।

আজকের পৃথিবীর স্বনামধন্য মানুষেরা নতুন পৃথিবী গড়ার এই তত্ত্বকে খারিজ করলেও একদিন সেটি প্রমাণ হবেই। শাসক যতই অত্যাচারী হোক না কেন, একজন শিক্ষক পারেন সমাজের বদল ঘটাতে। ‘হীরক রাজার দেশে’ উদয়ন পণ্ডিত শিক্ষার বীজ বপন করেই সক্ষম হয়েছিলেন বদল আনতে। তিনি তো শুধু গান করেন না, তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে তিনি মগজে বীজ বপন করে শিক্ষার। যেখানে কোনও দলাদলি নেই, আছে মানুষের স্বাধীনতার কথা। নতুন প্রজন্ম সেই শিক্ষার হাত ধরেই পৌঁছাবে প্রত্যয় পর্বতে।  আধুনিক চারণকবির স্বপ্নের পৃথিবী সেদিন হয়ে উঠবে স্বর্গের থেকেও সুন্দর।

তবে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণও রয়েছে। মানুষের স্বাধীনতার বদলে -ইজম বা দলাদলির অঙ্ক কষলে ‘শুনো না আমার গান’। একথা আর কেই বা বলতে পারেন!

Review: প্রেমের মোড়কে রাজনৈতিক বিবৃতি, মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল রূপমের 5

নতুন পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক তাই গণতন্ত্র।  চেষ্টা করলেও হয়তো প্রতিটি মানুষ জিততে পারে না, কিন্তু গণতন্ত্রকে জিততে হবেই। গণতন্ত্র জিতলে মানুষ ফিরে পাবে তার পূর্ব স্বাধীনতা। নিজস্ব মতামত পোষণের অধিকারের স্বাধীনতা। ধর্মবিহীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠা হবে রকস্টার রূপমের স্বপ্নের বিভাজনহীন স্বর্গীয় সুখরঙিন এক নতুন পৃথিবী। প্রেমের আড়ালে এমনই রাজনৈতিক বিবৃতি রূপমের। তাই তিনি ফের ডাক দেন,

ওঠো হে সৈন্য, লড়তে হবে

এভাবেই প্রায় তিনঘণ্টা গানে গল্পে এক অসাধারণ সন্ধ্যা উপহার দিলেন শিল্পী রূপম। একইসাথে আরও একজনের কথা বলতে হয়, যেই মানুষটা ওই সুন্দর সন্ধ্যাকে আরও চিত্তাকর্ষক করে তোলার কারিগর। প্রতিটি গানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পিছনে ছবি ফুটিয়ে তোলা, অসাধারণ আলোকসজ্জায় সমন্বিত এই কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছেন রূপসা দাশগুপ্ত। রূপম এবং রূপসা— দু’জনকেই জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ।

বিবিধ ডট ইন-এর রিভিউ কলামে রূপম ইসলাম একক কনসার্টে নিয়ে লিখেছেন মৌসুমি বাগ

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: