রিভিউ: ভক্তের চোখে আকিব-শিবাশিস-আকাশের ‘জোটজমাট কনসার্ট’: অরিঘ্ন মিত্র

১৩ সেপ্টেম্বর ছিল জোটজমাট কনসার্ট। শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, আকাশ চক্রবর্তী এবং আকিব হায়াতের ‘জোটজমাট কনসার্ট’ নিয়ে ‘ভক্তের চোখে‘ কলাম লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র

মিউজিক হল বিনোদনের মাধ্যম। মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্যই মিউজিসিয়ানরা মঞ্চে ওঠেন, গান তৈরি করে এইরকমটাই শুনে আসতে হয় সবাইকে। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার একটা কুৎসিত কৌশল মিউজিককে শুধুমাত্র বিনোদনের রসদ হিসেবে সাজিয়ে রাখা। মানুষের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া নাচো, গাও, আনন্দ পাও… তারপর বাড়ি গিয়ে ঘুমাও। তাই হয়তো ‘বড় লোকের বেটি লো, লম্বা লম্বা চুল’ এই গান যখন রিমেক করা হয় এবং সেই রিমেক গানের ভিডিওতে আকর্ষনীয় মনোরঞ্জনকারী উপাদান ঢেলে দেওয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে সেই গান বক্সঅফিসে বলা ভাল এখনকার ইউটিউব ভিউজে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে। কিন্তু শিল্পের সঠিক মর্যাদা দেওয়া হয় না। মানুষের চিন্তা ভাবনার অবকাশগুলো এই অর্থব্যবস্থা সুকৌশলে ঘুম পাড়িয়ে রাখে এইভাবে। কিন্তু ইতিহাস বলছে প্রতিটা শিল্প তৈরি হয়েছে সময়ের দাবি থেকে। পাহাড়, নদী, গাছপালার শব্দে মানুষের কান্না যখন মিশে গেছে তখনই তো সেটা জীবনের সুর, সেটাই মানুষের সিম্ফনি। কেউ কেউ দল বেঁধে, জোট বেঁধে তাঁদের স্বাধীনতার কথা চিৎকার করে একসঙ্গে বলতে বলতে কখন সেটা একটা সুরে গান হয়ে গেছে তাঁরা বোঝেনি, কিন্তু সেই গানই মুক্তির আলো কোন রাস্তায় সেটা তাঁদের দেখিয়ে দিয়েছে।

এই পৃথিবীতে বিভাজনের শুরু সেই ক্রীতদাস প্রথার সময় থেকেই, সেই বিভাজনই যত সময় এগিয়েছে বিভিন্নভাবে সেটার রূপ পাল্টেছে মাত্র। এই অন্ধকারময় একটা সময় যখন মানুষ নিজেদের বিভিন্ন পরিচয়ে, লিঙ্গে, জাতিতে, পোশাকে, বর্ণে বেশিবেশি করে বিভাজন করে ফেলছে তখনই অনেক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটা বিশাল জোট বাঁধলেন শিল্পী শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, আকাশ চক্রবর্তী এবং আকিব হায়াত তাঁদের অনলাইন ‘জোট জমাট কনসার্ট’-এ।
এই কনসার্ট কিন্তু নিখাদ মনোরঞ্জনের জন্য ছিল না, ছিল খানিকটা ভাবার জন্য, ভাবানোর জন্য।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ওঁরা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন, ওঁদের জোট শুধু তিনজনের নয়। ওঁদের সঙ্গে আছেন অন্যান্য শিল্পী বন্ধুরা, ওঁদের সঙ্গে আছেন অনেক মানুষ। কনসার্টের জন্য ধার্য করা নির্দিষ্ট স্টুডিওটার বাইরে গিয়ে একটা বিরাট বড় প্রেক্ষাগৃহে সবাই জোট বেঁধেছেন। মানুষের মধ্যে যে কল্পনাটুকু বেঁচে আছে সেটাকেই উস্কে দিয়ে দর্শকদের ঘরে গিয়ে একটা প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন ওঁরা। ঘরে বসে কনসার্ট দেখতে গিয়ে কখন যে এই প্রতিবেদন লিখছে সেই আমি ওঁদের তৈরি মঞ্চের সামনে গিয়ে নিষ্পলক চোখে বসে পড়েছিলাম, সেটা ঠাহর করে উঠতে পারিনি। মন দিয়ে আর কল্পনার চোখ দিয়ে তাকিয়ে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ অনুভব করতে পেরেছি। চারিপাশের শব্দ, দর্শকদের কানাঘুষো সবই শুনতে পেয়েছি। ওঁরা কিন্তু ক্যানভাসে একটা মঞ্চ, প্রেক্ষাগৃহ এঁকেছেন মাত্র কিন্তু এতটাই সুন্দর ভাবে আঁকলেন যে, নিজের কল্পনাকে আর চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখা সম্ভব হয়নি। আমি নিশ্চিত জোট জমাট কনসার্টের কোনো দর্শকই নিজেকে বন্দি করে রাখতে পারেননি। আকাশ বলেছেন শুরুতে ‘যাঁর কল্পনা জোর যত বেশি, তাঁর প্রেক্ষাগৃহ তত বেশি জমজমাট।’ কল্পনার সলতেতে আগুন জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে তিন শিল্পী কল্পনার জোরকে দৃঢ় করেছেন।

এই কনসার্ট যেন সিনেমার মতো একটা গল্প বলে চলল, শিবাশিস প্রথমে এসে গল্প শুরু করলেন। জোট বাঁধার গল্প বললেন। একটা জোট যেটা একটা শ্রেণির মানুষকে পদদলিত করে আর একটা জোট, যেটা সেই মানুষের হয়ে লড়াই করে। তাই শিবাশিসের গল্পে প্রথমেই জোট বাঁধার একটা গান ছিল, যে গানটার ট্র্যাকও শিবাশিস তাঁর সতীর্থদের সঙ্গে জোট বেঁধে বানিয়েছেন। এই কনসার্ট তো সেই মানুষদের কথা বলেছে যাঁদের স্বাধীনতা চাই। ‘ইতিহাস জানে যাঁরা জোট বাঁধে তাঁরাই হয় স্বাধীন’ এই চরম সত্যটা গানে গানে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই হয়তো এই কনসার্ট। যৌথখামারের স্বপ্ন বুনে চলা মানুষদের হয়তো আর একটু জোর দেওয়া, একটু পাশে দাঁড়ানো। চোয়াল শক্ত করা, হাতগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে আকাশের দিকে তোলা। ধর্মীয় মেরুকরণ এবং পুঁজির আগ্রাসনের আকালে এইরকম কিছু ছবিই হয়তো তাঁদের স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করে। শিবাশিস তাঁর ছ’টা গান এবং গান প্রসঙ্গে তাঁর কথাগুলো এমনভাবে সাজালেন, যেন রঙিন তুলির আলতু ছোঁয়ায় একটা স্বপ্নের বাড়ি ক্যানভাসে তৈরি করছেন কিংবা স্বপ্নের বাড়ির ভিত তৈরি হওয়ার পর ইটের গাঁথুনি দিয়ে পরপর সাজিয়ে একটা আকার দিচ্ছেন কনসার্টের। যে সুর শিবাশিসকে তাঁর জীবনবোধের কাছে নিয়ে গেছে সেই সুরেই তাঁর জীবনবোধ পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের কাছে। এমন একটা ‘Faith’-এর গল্প বলছেন যেখানে বিশ্বাসের সঙ্গে স্পর্ধা, জেদ এবং একটা আশা কিংবা স্বপ্নের কথা বলে। সেখান থেকেই কিছু প্রশ্ন, কিছু আক্ষেপ মিউজিক-এর আকার নিয়ে বেরোয় শিবাশিস এর কিবোর্ড এবং গানে।

আমাদের যেসব অনুভূতি বাজারে সহজে বিক্রি হয়ে যায়, ব্যবসা করে কিছু মানুষ সেই অনুভূতিগুলো নিয়ে, যাঁরা এই ব্যবসা করে সেইসব মানুষকে চিনিয়ে দিচ্ছেন শিবাশিস। বন্ধু হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে চাইছেন তাঁর গানে, কিন্তু শিবাশিস তো তাঁদেরই একজন যাঁরা দূর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পান কিন্তু কাছে গিয়ে তাঁদের জড়িয়ে ধরে চোখের জল মুছতে পারেন না, দুঃখটা ভাগ করতে পারেন না। কীভাবে পারবেন? মানুষ যে সুন্দরভাবে জোটবিহীন হয়ে গেছে, একা হয়ে গেছে। শিবাশিস বন্ধু হতে বলছেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে বলছেন, লড়াই এ জেতার আশার কথা বলছেন। শিবাশিস যখন গল্প শেষ করছেন তখন কারুর মনে হতেই পারে যে তাঁরা স্বপ্ন দেখেন না। কী দায় পড়েছে যে, জোট বাঁধতে হবে? তাঁরা হয়তো ভাবছেন তাঁরা তো বেশ দিব্যি আছেন। কিন্তু ওই যে, শুরুতে বলেছিলাম কনসার্টটা সিনেমার মতো। সিনেমায় এক একটা চরিত্রের আলাদা আলাদা ভূমিকা থাকে যেমন, ঠিক এখানেও তেমন। শিবাশিসের গল্প শেষ হওয়ার পর মঞ্চে আসলেন আকাশ চক্রবর্তী। আকাশের কাজটা ছিল শিবাশিস যেখানে শেষ করছেন সেখান থেকেই গল্পটা শুরু করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শিবাশিস জোট বাঁধতে বলেছিলেন, জোট কেন বাঁধতে হবে সেটাও বলেছিলেন। আকাশ এসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর কাজ শুরু করলেন কখন, কেন জোট বাঁধতে হবে। হবেই, জোট আমাদের বাঁধতে হবেই এইরকম অভিব্যক্তি নিয়েই যেন বলতে থাকলেন কথাগুলো, গাইতে থাকলেন গানগুলো। জল্লাদের দল তাঁদের তলোয়ার, ত্রিশূল নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। একের পর এক বন্ধুর মৃতদেহ পরে থাকছে আমাদের চোখের সামনে। তাঁদের অস্ত্র লাল রক্তে ভিজে যাচ্ছে। আমরা তাঁদের থামাতে পারছি না। এরকমই আমাদেরই একজন মৃত বন্ধুর কথা শোনালেন আকাশ।

মৃত বন্ধুর একটা চিঠি পড়ালেন আমাদের, তাঁর জীবনের শেষ চিঠি, বন্ধুর নাম রোহিত ভেমুলা। আকাশ বলছেন চিঠিটা ‘লেখকের ম্যানিফেস্টো’। কিন্তু চিঠিটা হয়তো পদ’দলিত’দের কান্নার দলিল। আকাশ মঞ্চে আসার আগে সেই চিঠি পাঠ করা হল, আকাশ এভাবেই বুঝিয়ে দিলেন, এই মিথ্যে কথার সমাজে নিপীড়িত মানুষদের যন্ত্রণা, তাঁদের না পাওয়ার খিদেই হল তাঁর গল্পের মূল চরিত্র। সেইজন্যই রোহিত ভেমুলার চিঠি। জাতিবিদ্বেষে দূরে ঠেলে দেওয়া মানুষদের কান্না কুড়িয়ে নিয়ে ভেমুলা পৃথিবী ছেড়েছেন। আমাদের কাছের মানুষ হয়েও ভেমুলারা অনেক দূরে চলে গেছেন এখন। আমাদের বন্ধু, আমাদের পড়শি যাঁরা চারিদিকে থাকেন, তাঁদের ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধু একটিমাত্র সম্প্রদায়কে শোষক করে তোলার জন্য। ভেমুলার চিঠি যে যন্ত্রণা দিয়ে গেল, সেই যন্ত্রণার রেশ ধরেই আকাশ তাঁর প্রথম গান তাঁর প্রসাদকাকুর ( প্রয়াত কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য) সুর করা ‘পড়শির ইতিহাস’ গাইলেন। আমাদের চারপাশের পড়শিদের নিয়ে সেই গান। ভেমুলার চিঠি যেভাবে স্বপ্নের বাড়ির ভিতটা নাড়িয়ে দিয়েছিল, দেখিয়ে দিয়েছিল যে ভূমিতে আমরা স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করছিলাম সেখানে স্বপ্ন দেখা যায় না। সেখান থেকেই আকাশ আবার একটু স্বপ্ন দেখালেন এই গানে। ঠিক পরের মুহূর্তেই এই অন্ধকার সময় এর কালো রাতটা ঠিক কতটা অন্ধকার সেটা খুঁড়ে দেখতে শুরু করলেন। চোখের জ্বলজ্বল করতে থাকল কিছু মানুষের অসহয়তার মুখ, কান্না বাজল তাঁদের হাহাকারের সুর। এই কোভিড-১৯ এর উপদ্রবে যে লকডাউন চলছে সেটায় যত মানুষ কর্মহীন হয়েছে, খাদ্যহীন হয়েছে তাঁদের জন্য যে মানুষরা জোটবদ্ধ হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় ছুঁটে গেছে সাহায্যের জন্য, বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিটি কিচেন খুলে কয়েকশো কিংবা কোথাও কয়েক হাজার মানুষের অন্ন জোগান দিয়ে চলেছেন তাঁদের জোটকে সংহতি জানাচ্ছেন গানে। চিনিয়ে দিচ্ছেন গরম ভাতের গন্ধ না পাওয়ায় মৃতদেহগুলোর ছবি ঠিক কেমন হয়। তখন আর চুপ করে আকাশের মঞ্চের সামনে বসে থাকা যাচ্ছে না, অ্যাড্রিনালিন বলছে উঠে দাঁড়িয়ে আকাশকেও সংহতি জানাও। রূঢ় বাস্তবের সম্মুখীন হয়ে পৃথিবীর কালো মেঘগুলো আকাশ দু’হাত দিয়ে সরিয়ে একটা খোলা আকাশ দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই চেষ্টা করতে করতেই কখনও কখনও রাষ্ট্র, প্রশাসনের কদর্য মুখগুলোর গালে থাপ্পড়ও মারছেন তাঁর গানের মাধ্যমে, পুরুষতন্ত্র সমাজের নৃশংস চেহারার সামনে রাইফেল ধরছেন।

আকাশ একটা মিছিলের কথা বললেন, যে মিছিলে আকাশের মতো সমমনস্ক অনেকেই ছিলেন। যাঁরা একটা লাল পতাকার মাঝখানে প্রীতিলতার মুখ দেখেছিলেন, আকাশও দেখেছিলেন। আকাশ একটা গান গাইলেন তাঁরই লেখা ‘প্রীতিলতার নিশান’। যেন প্রীতিলতার নিশান আঁকা লাল পতাকা ধরে আকাশ ছুটছেন একটা মুক্তির স্বাদ পাওয়ার জন্য, তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন তাঁরই মতো অনেক মানুষ। আকাশ এঁকেছেন তাঁর গানে এই ছবিটা। আমি দেখতে পেয়েছি, অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমার মতো অনেকেই এই ছবিটা দেখতে পেয়েছেন আমি জানি। শেষমেশ আকাশ একটা স্বপ্ন দেখতে পান, যেটা একটা সাদা আলো, কালো মেঘের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। আকাশ সেই স্বপ্নকে দুহাত দিয়ে সারা গায়ে মেখে নিচ্ছেন। তাঁর গান এবার ধীরে ধীরে শান্ত করছে পৃথিবীকে, যেন শোষিত মানুষদের জয় হল একটা যুদ্ধের শেষে। ‘ফিরতি পথের গান’ গেয়ে আগামীর জন্য একটা নতুন স্বপ্ন এঁকে দিয়ে সবার কাছাকাছি গিয়ে বেঁধেবেঁধে থাকার কথা বলে আকাশ তাঁর গল্প শেষ করলেন।
কিন্তু এখনও যে বাকি থাকল গল্প! যাঁরা স্বপ্ন দেখে প্রত্যেকটা মানুষের নিজের নিজের আলাদা গল্প থাকে। তাঁদের নিজেদের জীবনে নিজস্ব একটা লড়াই থাকে। তাঁদের গল্প কে বলবে? বলবেন আকিব হায়াত। এতক্ষণে তো বোঝাই গেছে এটা নিছক বিনোদনের কনসার্ট নয়। ওই যে বলেছিলাম শুরুতে, মিউজিককে শুধুমাত্র বিনোদন এর মাধ্যম বানিয়ে রাখা এই ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার একটা কৌশল। এই কনসার্ট ছিল গানে, কথায় মানুষের যন্ত্রণা খোঁড়ার কনসার্ট। রূপম ইসলাম যেমনটা তাঁর গানে একসময় বলেছিলেন,

‘গানে কেউ শুধু বিনোদন খোঁজে
আমি খুঁড়ি যন্ত্রনা
ফেলে ডাস্টবিনে যত উপদেশ
(আর) স্তোকের আবর্জনা’,

ঠিক তেমনই আকিব বলছেন, ‘আমার গান মূলত জীবনমুখী। আমি বিনোদনের কথা ভেবে গান লিখি না। আমার যদি গানের মাধ্যমে কিছু দেওয়ারই থাকে তাহলে সেটা অভিজ্ঞতা দেব আমার। কারুর কথা ভেবে গান আমি লিখি না তাই, নিজের জন্য লিখি।’ টাকা বানানোর কল হিসেবে অনেকে মিউজিককে ব্যবহার করেন, মিউজিক বিক্রি করেন, মিউজিকের দর্শন আর ক’জন দিতে পারেন? মিউজিকে পৃথিবীর গল্প ক’জন বলতে পারেন? আকিব বললেন। আকিব কনসার্ট শুরুর আগে গেছিলেন রতন কাহারের বাড়ি। ওই যে, শুরুতে বলেছিলাম ‘বড় লোকের বেটি লো’ গানকে রিমেক করে বিনোদনের রাংতা পরিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। রতন কাহার এই গানের আসল স্রষ্টা, তিনি যখন গানটি লিখেছিলেন খুব একটা বিনোদনের জন্য সুযোগ পণ্য হিসেবে গানটা তৈরি করতে পারেননি। পুরুলিয়া জেলার একটি গ্রামে সমস্ত প্রচারের আলোর বিমুখে ছিলেন এতদিন। শিল্পী হিসেবে তাঁকে কতটুকু মর্যাদা বা সাম্মানিক দিয়েছি আমরা? সেই খবর কেউ রেখেছে? রাখেনি, শিল্পের দাম কেউ দেয়নি, কারণ বিনোদন কই যে, দাম দেবে? আকিব তাঁর কাছে আমাদের নিয়ে যান। পর্দায় ভেসে ওঠে রতন কাহারের মুখ। রতন কাহারের সঙ্গে কথা বলে, আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে আসেন আকিব মঞ্চে। এবং প্রথাগত বিনোদনকে সরিয়ে রেখে জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। কীরকম গল্প?

রোজ রুটি, ডাল জোগাড়ের জন্য যাঁদের লড়াই করতে হয়, ভিড় বাসে ঠাসাঠাসি করে রোজ সকালে অফিস যেতে হয় আবার সন্ধেতে একইভাবে বাড়ি ফিরতে হয়। অফিস ক্যাবে বসে বসে গাড়ির কাঁচের বাইরে থাকা খোলা আকাশ যাঁদের ডাকে, কর্পোরেট জীবনের ক্লান্ত ভিজে শরীর যাঁদের কিছু কোডিং ল্যাঙ্গুয়েজে বন্দি কিংবা সেলস টার্গেটে নাজেহাল হয়ে যাওয়া একটা মন যাঁরা মাথা তুলে দাঁড়াতে ভুলে যায় এরকম অনেক মানুষের গল্প। কিছু না পাওয়া, কিছু আক্ষেপ, কিছু ফেলে আসা গল্প, অভিজ্ঞতার কথা দিয়ে তৈরি আকিবের গানগুলি যেন একটা শান্তির বৃষ্টি নামিয়ে আনল। মনটা যেন ধীরে ধীরে ভিজে যেতে লাগল। সদ্য জন্ম হওয়া একটা গান থেকে অপ্রকাশিত গান গেয়ে যেভাবে একটা অল্প কান্না, অল্প হাসির কোলাজ আঁকলেন, সেটা মনে রাখার মতো। ঘটনাগুলো আলাদা হলেও এই মানুষগুলোর অনুভূতিগুলো একইরকম তাই সহজে আকিবের গল্পগুলো নিজের মনে করে নিতে অসুবিধা হয়নি। আকিবের গল্প শেষ হল, তাহলে অনুষ্ঠান শেষ? না, অনুষ্ঠান এখনই শেষ হয়ে গেলে জোটের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? অনুষ্ঠান শেষ করতে গেলে তো সবাইকেই পাশে দরকার হয়, তাই না?
লেখার শুরুতে বলেছিলাম শিবাশিস, আকাশ এবং আকিব এই তিনজনেরই শুধু জোটে জোটটা জমাট বাঁধেনি। এঁদের সঙ্গে ছিলেন অনেক মানুষ, শুভাকাঙ্ক্ষী। নইলে কি আর নিজেদের মঞ্চ থেকে অপর শিল্পীদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো যায়? তাঁদের উদ্যেশ্যে ‘হ্যাপি বার্থডে সং’ গাওয়া যায়? অনুষ্ঠানের শেষে এই জোটের সমস্ত জোটসঙ্গীরা মঞ্চের সামনে এসে থিয়েটারের মতোই কার্টেন কলে সামিল হয়। কেউ মঞ্চের সামনে এসে কেউ মনে মনে সবার পাশাপাশি দাঁড়ায়। জোটকে আরও দৃঢ় করার সংকল্প নেয়।

প্রযুক্তির অনলাইন কনসার্ট এই করোনা পরিস্থিতিতে একটা নতুন আঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে মঞ্চের। অনুষ্ঠান পরিবেশনা, চিন্তা ভাবনার প্রয়োগ এই সমস্ত কিছুতে ব্যপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন শিল্পীর কনসার্টে। ঘরবন্দি অবস্থায় সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটাতেও সাহায্য করছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিল্পীর সঙ্গে দর্শকদের এই অভিনব যোগাযোগ। ‘জোটজমাট কনসার্ট’ এর শিল্পীরা যেভাবে সকলকে নিয়ে জোট বেঁধে অনুষ্ঠান করতে পারলেন, যেভাবে সবাইকে সামিল করে নিলেন অনুষ্ঠানে, যেভাবে দর্শকদের মনের চারপাশে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হয়ে গেল, যে প্রেক্ষাগৃহের কোনও সীমানা থাকল না, সেটা শুধু অভাবনীয়ই নয়, দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

 

প্রতিবেদনটি লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: