রিভিউ: ‘উই শুড নট ট্রাই টু বি হোয়াট উই আর নট’, ভক্তের চোখে অঞ্জন: ঈশান পাল

পৃথিবীর আকার পুরোটা না হলেও কিছুটা গোল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন টাইমজোন, আলাদা আলাদা স্থাপত্য, আলাদা আলাদা বৈচিত্র্য, আলাদা খাবার, আলাদা পোশাক, আলাদা ভাষা। কিন্তু ওই যে আগেই লিখেছি, পৃথিবীর আকার পুরোটা না হলেও কিছুটা গোল। ছোটবেলার ভূগোল বইয়ে পড়া, ‘অনেকটা কমলা লেবুর মতো’। হয়তো বা আমাদের জীবনের মতো! ঠিক যেমন একটা বৃত্তে আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি, হাঁসফাঁস করছি, দমবন্ধ লাগছে, মুক্তি খুঁজছি, বিনোদন খুঁজছি; হয়তো পাচ্ছিও। কিন্তু সেটাও সেই বৃত্তের মধ্যেই। বিভিন্ন দেশের মানুষ যখন বিভিন্ন টেকনিক্যাল বাধাবিপত্তি টপকে ভার্চুয়ালি ঢুকে পড়েন দত্তবাড়ির বৈঠকখানায়, তখন এটাকে একটা গ্লোবাল কনসার্ট বা গ্লোবাল আড্ডা না বলে উপায় কী! আড্ডা শুরু হল জয়িতাকে লেখা অর্ণবের চিঠি দিয়ে।

প্রিয়বন্ধু! নিজের বাড়ির অন্দরমহলে ডেকে এনে, ‘ওয়েলকাম টু মাই বাড়ি…’ বলে, আপ্যায়নের প্রথম ধাপেই প্রিয়বন্ধু ক্যানো? অঞ্জন কি আর একটা বৃত্তের মধ্যে টেনে আনছেন আমায়?

রিভিউ অঞ্জন দত্ত

নীল গিটারটা হাতে তুলে নিলেন এবং গাইলেন, ‘এ শহর’।

গানটি অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ‘দ্য বংস্ এগেইন’ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। গানের কথা অঞ্জন দত্তর। গেয়েছেন নীল নিজেই। অঞ্জন গল্প বলছেন। তাঁর বাড়ির, তার পাড়ার। ‘পুরোনো গিটার’ গাইতে গাইতে আক্ষেপের সুরেই বলছেন, ‘এই গানটা সচরাচর কনসার্টে গাওয়া হয় না’। মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গানটা কিন্তু এই বাড়িতে বসেই লেখা। বলছেন, ‘বাড়ির অনুষ্ঠান বাড়ির মতোই হবে। হলের অনুষ্ঠান হলের মতন। হলে যেগুলো হয়, সেগুলো এখানে সম্ভব নয়। আবার হলে যেগুলো সম্ভব নয়, সেগুলো এখানে সম্ভব।’ অঞ্জন বলছেন, যা অবস্থা এখন, এই পৃথিবীতে, সেখানে নিজের মতো করে একটু আশা-ভরসা, একটু ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তাঁর এই অনুষ্ঠান।

বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন আমাদের বর্তমান লিমিটেশন্‌স-কে। অঞ্জন বলছেন, ‘আমি চাইলেও এই বাড়িটাকে হল বানিয়ে ফেলতে পারব না। আপনারা চাইলেও বাড়িটাকে অডিটোরিয়াম বানিয়ে ফেলতে পারবেন না।’ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ভক্তরা, যাঁরা এই অনুষ্ঠান দেখছেন, তাঁরা অলরেডি ভার্চুয়ালি ‘Carpe diem’-এর হাত ধরে ঢুকে পড়েছেন অঞ্জনের বাড়ির বৈঠকখানায়। দায়িত্ববান হোস্ট হিসেবে অঞ্জন তাঁদের বাতলে দিচ্ছেন এই অনুষ্ঠান উপভোগ করার উপায়; অবশ্যই বিভিন্ন দেশের টাইমজোন অনুযায়ী।

 

আমরা ভার্চুয়ালি আমাদের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখছি রোজ, প্রতিনিয়ত। পুজোর সেল থেকে রেস্টুরেন্ট— সবটাই এখন মুঠোফোনে। এটাই ‘নতুন স্বাভাবিক’। আসলে এটাও বোধহয় একটা বৃত্ত। এখানেও আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। অক্সিজেন নিচ্ছি দত্তবাড়ির বৈঠকখানায়।

পিট সিগারের লিটল বক্সেস-এর অনুপ্রেরণায় অঞ্জনের তৈরী ‘ছোটো বাক্স’ প্রায় সবারই শোনা। ছক ভেঙে অঞ্জন শ্রোতাদের শোনালেন ‘লিটল বক্সেস’। সত্যিই তো আমরা আটকে পড়েছি একটা বাক্সে। একটা বাক্স থেকে বেরোলে আর একটা বাক্স। তারপর আর একটা…।  স্বপ্ন, খিদে, ঘুম, ভালোবাসা, আদর— সবটাই বাক্সের ভেতর। এই গোটা পৃথিবী যখন একসাথে এক অচেনা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে, ঠিক তখন দত্ত বাড়ির বৈঠকখানায় বসে আশার আলো দেখাচ্ছেন অঞ্জন। বলছেন, ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার কথা।

 

বাড়িতে পুরনো বন্ধু এলে যেমন আমরা আড্ডা দিই, ফেলে আসা সময় নিয়ে, অঞ্জন সেভাবেই স্মৃতিচারণ করছেন। তাঁর কথায় ফিরে ফিরে আসছেন বাদল সরকার। ফিরে ফিরে আসছে কলকাতা। কলকাতার ট্রাম, বাস, রাস্তাঘাট, রাস্তার ধারে শিবমন্দির, ক্লান্ত ট্রাফিক পুলিশের ঘুম— সবকিছু। বন্ধুত্বের গান, ‘ছিলে বন্ধু’ গাইছেন নীল। নিজের লেখা, একটা আপাদমস্তক বন্ধুত্বের গান ‘ফাইনালি ভালোবাসা’ ছবিতে নীলের গলায় ব্যবহার করেছিলেন অঞ্জন।

ইদানীং চারপাশে মুখোশ পরে, কখনও বা মুখোশের আড়ালে বেঁচে আছি আমরা। আগেও ছিলাম হয়তো। তবে এখন ভয়ে; মৃত্যুভয়ে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও নীল শোনাচ্ছেন ভালোবাসার গান। গাইছেন, ‘আমি আসব ফিরে তোমার পাড়ায়’। আচ্ছা, ‘কাঞ্চন’ কি প্রেমের গান নয়? আলবাত প্রেমের গান। অঞ্জন তো বলেইছেন, স্রেফ নিখাদ ভালবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই ওঁর এই অনুষ্ঠান। কিন্তু শুধুই ভালবাসা? অঞ্জন গাইছেন, ‘এখনও তাই’। চোখের সামনে ভেসে উঠছে আশার আলো। অঞ্জন গাইছেন, ‘তবু প্রেম করতে পারে অনেকেই হিরোশিমায়’।

 

স্বপ্ন দ্যাখাচ্ছেন অঞ্জন। গান গাইছেন। নতুন আশা জোগাচ্ছেন। অঞ্জন গাইছেন ভালো থাকার গান। গোটা দেশ, গোটা শহর যখন প্যান্ডেমিকে জর্জরিত, বিকেলের আলো মেখে রাস্তার কলে কয়েকটা ছেলের চান অঞ্জনকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে। একদিন থামতে হবে জেনেও সব নেগেটিভিটি দূরে সরিয়ে রেখে অঞ্জন চাইছেন, তাঁর জীবনের শেষ দৃশ্যটা য্যানো ওই বিকেলের আলোয় হাসিমুখে সাবান মেখে স্নানরত বাচ্চাদের আনন্দের দৃশ্যে ফ্রিজ হয়ে যায়!

গল্প করতে করতে ততক্ষণে অঞ্জন ঘরের ভেতর থেকে আমার হাত ধরে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন কলকাতার রাস্তায়। আমি দেখতে পাচ্ছি রাস্তার কলের ঘোলাটে জলে সাবান মেখে চান করছে কলকাতার যিশু। তাদের আনন্দ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মুহূর্তে ভুলে যাচ্ছি নিজের দুঃখ, কষ্ট, ভীষণ চেয়েও না পাওয়ার যন্ত্রণাগুলো। আমি হাঁটছি অঞ্জনের হাত ধরে। অঞ্জন আমায় কোলকাতার গল্প শোনাচ্ছেন। আচমকা রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গ্যালো।

 

আমি আবিষ্কার করলাম, ধর্মতলার মোড়ে আমি। ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। কোথাও কেউ নেই। সিম্‌ফনির সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আমি। দূর থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। ঠিক তখনই হঠাৎ দ্যাখা হয়ে গ্যালো পুরনো প্রেমিকার সাথে। এতদিন ধরে জমে থাকা অভিমান, প্রেম, রাগ চাগাড় দিয়ে উঠছে আবার। অঞ্জন গাইছেন, ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে, আমরা ধরা পড়ে যাব দেখো ঠিক’। গান শেষ করেই সাময়িক বিরতি নিলেন অঞ্জন।

আমি বাস্তবে ফিরছি। ঠিক তখনই নীল গাইছেন ‘মন খারাপের বিকেলে কেউ গলা সাধে না…’। সত্যিই তো ‘কান্না পেলে এখন আমি আর কাঁদি না…’। এই ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীবনের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে বড় হয়ে গেছি আসলে। পল সাইমনের ‘I am Just a Poor boy’ গাইছেন নীল। নীল গাইছেন, ‘But the fighter still remains’। অঞ্জন গিটার হাতে গেয়ে উঠছেন টম জোন্সের ‘Green, Green Grass Of Home’। ডেডিকেট করছেন তাঁর স্ত্রীকে, তাঁর প্রবাসী বন্ধুদের। তরুণ বন্ধুকে জানাচ্ছেন, ‘ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট আশা’গুলো রেসপেক্ট করতে। অঞ্জন বার্তা দিচ্ছেন আগামীর জন্য— ‘Let us live for the little things of life..’

রিভিউ অঞ্জন দত্ত

 

তাঁর ভক্ত প্রত্যূষ এই মুহূর্তে কোভিডের সাথে লড়ছে। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে সেও ঢুকে পড়েছে দত্তবাড়িতে। অঞ্জন জানেন, প্রত্যূষ ভাল হয়ে যাবে, যাবেই। আমি দেখছি, প্রত্যুষের হাত ধরে অঞ্জন হাঁটতে বেরিয়েছেন দার্জিলিংয়ের রাস্তায়। শুধু অঞ্জনই পারেন এভাবে ভালোবাসতে; আশার যোগান দিতে; স্বপ্ন দ্যাখাতে।

ছোটবেলায় যখন গ্রাম থেকে উঠে এসে শহরের স্কুলে ভর্তি হই, তখন আমার বাড়িতে টিভি ছিল না। একটা সময় আমার বাড়িতে সুমনের ‘তোমাকে চাই’ নিয়ম করে বাজানো হতো। বাবা শুনতেন। মা, দিদি তখনও গ্রামের বাড়িতেই। আমি একা। বন্ধু বলতে টুকাই আর আমার ওয়াকম্যান। ওটা বাবা আমস্টারডাম যাওয়ার সময় কিনেছিলেন। বাবা শুনতেন সুমন, অঞ্জন, ডিলান, লেনন। আমিও শুনতাম, বুঝতাম না কিছুই। শুনতাম। ‘ভেংচি কেটে দ্যাখ’, ‘টিভি দেখো না’, ‘আলিবাবা’— আরও কত কত গান, বারবার শুনতাম। ক্যানো শুনতাম? বন্ধুদের বাড়িতে টিভি ছিল। আমার বাড়িতে ছিল না। তাই কি ওয়াকম্যানে ‘টিভি দেখো না’ শুনতে ভালো লাগত? ওই বয়সে কি ওভাবেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম?

 

এ এক অদ্ভুত ‘আমি’র মুখোমুখি আমায় দাঁড় করিয়ে দিলেন অঞ্জন। অঞ্জন বলছেন, ‘We shouldn’t try to be what we are not..’

আমাদের লিমিটেশনগুলো সাথে নিয়ে, যতটা পারা যায়, ওভারকাম করে প্রাণ খুলে আনন্দে বাঁচতে শেখাচ্ছেন অঞ্জন। শেখাচ্ছেন ‘বাড়ি থেকে’ কনসার্ট দ্যাখার পজিটিভ দিকগুলো। আমি শুনতে শুনতে ভাবছি, এই পজিটিভিটি এই দু’ঘণ্টার কনসার্টের পরও নিজের জীবনে, আই মিন যে বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি, সেখানেও কাজে লাগাতে হবে আমায়। মনে রাখতে হবে, ‘We shouldn’t try to be what we are not..’

এই কনসার্টটাও য্যানো একটা বৃত্ত। দত্ত বাড়ির বৈঠকখানা থেকে কলকাতার রাস্তা হয়ে দার্জিলিংয়ের পাহাড় ঘুরে পুরনো স্মৃতির ফাইল ঘেঁটে, আবার কখনও আয়নার সামনে একটা অন্য ‘আমি’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবার ঢুকে পড়া দত্তবাড়ির বৈঠকখানায়। যেখানে এই মুহূর্তে চব্বিশ বছরের জয়ী ই-মেল করেছে তাঁর মায়ের বন্ধু ছেষট্টি বছরের অর্ণবকে। আবার ‘প্রিয়বন্ধু’!

না, আবার চেনা ছকের বাইরে চলে গেলেন অঞ্জন। বৃত্তটা সম্পূর্ণ হতে দিলেন না। বললেন, আজ এসো। অনেকটা রাত হয়েছে। বাকি আড্ডা তিরিশে আগস্ট দেওয়া যাবে। আড্ডা শেষের আগে মনে করিয়ে দিলেন, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’। এই মহামারির সময়ে ঘণ্টাদু’য়েক আমাকে একটা টাইম ট্রাভেল করালেন অঞ্জন। অনেকটা অক্সিজেন ভরে দিলেন মস্তিষ্কের  কোষগুলোতে।

আমি অপেক্ষা করব অর্ণব আর জয়ীর পরের ই-মেলগুলো শোনার জন্য মিস্টার দত্ত। আজ উঠি! অনেক রাত হল।

 

ছবি: ঈশান পাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *