সাক্ষাৎকার: ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ কনসার্টের আগে এক্সক্লুসিভ আড্ডায় অঞ্জন দত্ত

আগামী ৩০ আগস্ট রাত আটটায় ‘প্রিয় বন্ধু আবার‘ কনসার্ট। তার আগেই কনসার্ট নিয়ে আড্ডায় অঞ্জন দত্তবিবিধ ডট ইন-এর তরফে অঞ্জন দত্তের সঙ্গে আড্ডায় ঈশান পাল

ঈশান: ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ কনসার্টের প্রস্তুতি কেমন চলছে?

অঞ্জন: রিহার্সাল চলছে। রিহার্সাল করছি নিয়মিত।

 

ঈশান: আপনি আগের অনুষ্ঠানেই বলেছিলেন, ‘বাড়িটা বাড়ি, অডিটোরিয়ামটা অডিটোরিয়াম। বাড়িটাকে হল বানানোর কোনও ইচ্ছে আমার নেই।’ কিন্তু বাড়িতে বসে এই প্রোজেক্টটা রূপায়ন করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন আপনি এবং নীল?

অঞ্জন: আসলে আমরা তো জানি না, আবার কবে অনস্টেজ লাইভ কনসার্ট করতে পারব। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমরা যাঁরা লাইভ কনসার্ট করি, নাটক করি, গানবাজনা করি, প্রথমেই এটা আমাদের মানতে হবে। লাইভ কনসার্ট এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। ‘Carpe Diem’ আমাদের অনেক ক’টা অনুষ্ঠান করেছে। ওরা যখন আমাদের সাথে যোগাযোগ করে, তখন আমার মাথায় এটাই প্রথম আসে যে, বাড়ি থেকে এমন কিছু করতে হবে, যেটা বাড়ি থেকেই করা যায়। যেটার জন্য একটা স্টেজ বা একটা অডিটোরিয়াম লাগে না এবং ইট হ্যাজ টু বি ভেরি ইন্টিমেট।

গানের অনুষ্ঠান করলেও সেটা ভীষণ ইন্টিমেট হতে হবে বা অন্যকিছু করলেও সেটা ভীষণ ইন্টিমেট হতে হবে। তখন প্রথমেই আমার মাথায় রেডিওর কনসেপ্টটা আসে। মানে আমি শুধু শুনছি। ‘প্রিয় বন্ধু’ যখন আমরা প্রথম করেছিলাম আমরা কিন্তু শুধু শোনার জন্যই করেছিলাম। দেখার জন্য নয়। মানে আমি পড়ছি, মাঝে মাঝে গান হচ্ছে।

আরও পড়ুন: রক্ মিউজিক করি বলেই উচ্ছৃঙ্খল হব— এটা অর্থহীন: দীর্ঘ আলাপচারিতায় চন্দ্রাণী

তারপর এই কাজটার শুরু। আসলে এখন অনেক কিছু পাল্টে গেছে। এখন আর কেউ চিঠি লেখে না। এখন সবাই ইমেইল করে, হোয়াটসঅ্যাপ করে।

ই-মেইলে যোগাযোগ হচ্ছে। আমি সেগুলোই পড়ছি। দু’জন মানুষ কথা বলছেন, ই-মেইলে। আমি পড়ছি। অডিয়েন্স শুনছেন। তাঁরা না দেখলেও পারেন। দেখলে তাঁরা দেখবেন একজন পারফর্মার দুটো চরিত্র তৈরি করেছেন। শুধুমাত্র তাঁর গলা দিয়ে। আসলে এটা পুরোটাই একটা ‘এক্সারসাইজ’। একটা স্পোকেন এক্সারসাইজ। এটা কিন্তু একটা চ্যালেঞ্জ। আমার একটা সুবিধা হচ্ছে, আমার বাড়িটা একটু বড়। এক্ষেত্রে সুবিধে হচ্ছে, আমার বাড়ির অন্য একটা ঘর থেকে নীল গানগুলো গাইবে। দু’টো আলাদা ডাইমেনশনে, দুটো আলাদা ক্যামেরায় বিষয়টা দেখা যাবে।

যখন ই-মেইলগুলো পড়ব, তখন দর্শক আমাকে দেখবেন। আবার এর মাঝে মাঝে যখনই গান ঢুকে আসবে, তখনই দর্শক নীলকে দেখতে পাবেন।

এই অনুষ্ঠানে আমিই অর্ণব, আমিই জয়ী। আমিই দু’জনের চিঠি পড়ছি। Here we are not creating any illusion.

It’s like a challenge. It’s like a test, that what I am able to do. এই প্যান্ডেমিকে আমার মনে হয়েছে Instead of taking a shortcut, It’s important for any artist to take challenges. আমি চাইলেই কোনও দক্ষ মহিলা শিল্পীকে বলতে পারতাম, জয়ীর সংলাপগুলো পাঠ করার জন্য। আমার বাড়ির আর একটা ঘরে আমি তাঁকে জায়গা করে দিতাম, তখন তিনটে ক্যামেরা দিয়ে লাইভ হতো। আমি সেটা চাইনি। আমার মনে হয়েছে, It could have been very তথাকথিত, could have been very সহজ। এই যে একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গোটা পৃথিবী যাচ্ছে, এত কিছু ঘটে যাচ্ছে, এত মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে, আমার মনে হয়েছে, আমার নিজেরও এই পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জিং কিছু কাজ করা উচিত। It is not taking easy way out.

মানে আমি রবীন্দ্রনাথের গান গাই বলে বাড়ি বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে চারটে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে ফেললাম, এটা নয়। তাঁকে ভাবতে হবে, বাছাই করতে হবে কোন গানগুলো বাড়ি থেকে গাওয়া যায়, কোন গান গুলো বাড়ি থেকে গাইলে সত্যিই মিনিংফুল হয়। দেখো, দু’টো রাস্তা আছে। একটা হচ্ছে— আমি বেরোতে পারছি না খুব সহজেই। অনুষ্ঠানটা করে ফেললাম। আর অন্যটা হচ্ছে— আমাকে খাটতে হবে। সেখানে আমার মনে হয়েছে সহজ রাস্তায় না হেঁটে, জয়ীর কণ্ঠের জন্য কাউকে না ডেকে, নিজেই সেই এক্সারসাইজটা করা এবং সেই ব্রিলিয়ান্সটাকে বের করার এই চ্যালেঞ্জটা আমি নেব।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার: ১২ ফুট বাই ১২ ফুট ঘরেই ‘মঞ্চ’ কাঁপাচ্ছেন, তৃতীয় এককে নয়া চমক, খোলাখুলি বললেন রূপম

আমি কিন্তু জয়ীর সংলাপ বলার সময় মেয়েদের মতো করে কথা বলব না। সেটা করলে আমার গলা একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষের গলার মতো শোনাবে। আমি আমার মতো করে কথা বলব। তার মধ্যে ভয়েস মড্যুলেশন থাকবে, ছোট ছোট inflections থাকবে। চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সেগুলো সব থাকবে। আসলে আমি তখন অঞ্জন দত্ত থাকব না, আমাকে তখন অর্ণব বা জয়ী হতে হবে। তাঁদের উচ্চারণ আলাদা, ইংরেজি বলার ধরন আলাদা। এটা ভীষণ কঠিন। আমি নিজে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে ‘প্লে-রিডিং’ দেখেছি। সেখানে একজনই একটা চেয়ারে বসে তিনটে মেয়ে আর তিনটে ছেলের চরিত্রে একাই অভিনয় করছে। এটা ভীষণ ডিফিকাল্ট। আমি অনুশীলন করছি। আমার মনে হয় এটা একটা অন্য ডাইমেনশন দিতে পারে।

আমি নীলের সাথে অমিত দত্তকে গিটার নিয়ে বসতে বলতেই পারতাম। নীলকেও কিন্তু যথেষ্ট চাপ নিতে হচ্ছে। সবক’টা গানের অন্যরকম সুর, আলাদা আলাদা লেয়ার্স তৈরি করতে হবে। ওঁকে কিন্তু বেশ কিছু গ্যাজেট ব্যবহার করতে হবে। একজনই করছে পুরোটা। এটা কঠিন। কিন্তু কোনও ইলিউশন নেই। একটা মানুষ একা একটা কাজ করছে। সহজ রাস্তাটা ছেড়ে, কঠিন রাস্তাটা বেছে নিচ্ছে। পরিশ্রম করছে। এটা আমরা করছি।

আমি কিন্তু কয়েকটা কাগজ নিয়ে বসে পড়ব না। আমি ল্যাপটপ নিয়েই বসব। ই-মেইল পড়ব, হাসি পেলে হাসব, কান্না এলে কাঁদব।

কিন্তু কোথাও কোথাও মুখটা ভীষণ ইমপর্ট্যান্ট হয়ে পড়ে। অনেকে ভাবে, আরে এ তো একটাই লোক বলছে।

মানুষের ইমোশনটা ছুঁতে হবে। প্রথমেই বললাম না ইন্টিমেট হতে হবে! সেই জন্যই আমার কাছে মনে হয়েছে এই চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো করা দরকার।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘শহরে ক্যাকটাস’

■ ঈশান: এই ধরনের কাজ একা  করার অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়েছে?

■ অঞ্জন: হ্যাঁ, হয়েছে। দু’বার। ‘প্রিয় বন্ধু’ই করেছিলাম। একবার লেক ক্লাবে আর একবার চিটাগাঙে। আমিই পড়েছি একা, দু’জনের চিঠি।

 

■ ঈশান: আগেরবার যখন ‘প্রিয় বন্ধু’ করেছিলেন, তখন সমসাময়িক রাজনীতির কথা উঠে এসেছিল। এই গল্পের সময়কাল অনুযায়ী সমসাময়িক রাজনীতির কথা উঠে আসবে?

■ অঞ্জন: হ্যাঁ, নিশ্চয়। সেটা না থাকলে তো গল্পটা হয়ই না। এই গল্পটার সময়কাল কিন্তু ২০০০ সালে ঢুকে গেছে। আমি গল্পটা শেষ করেছি প্যান্ডেমিকের আগেই। ফলে সেই সময়টা অবশ্যই উঠে আসছে। ‘প্রিয় বন্ধু’তে ভারতবর্ষের বেশ কিছু জায়গা ছিল, তারপর জয়িতা ঢাকা চলে যায়। ঢাকাতে গিয়ে কী হয়, সেটা কিন্তু কেউ জানে না। বাঙালি কিন্তু অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। এবার গল্পটা ইন্টারন্যাশনাল। এবার কোলকাতা, ঢাকা, লন্ডন, আমেরিকা, বার্মা— বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে গল্পটা। অর্ণব কিন্তু মানিকতলায়। মেয়েটি যখন কলকাতায় আসছে, অর্ণব তখন চলে গেছে আমেরিকায় কনসার্ট করতে। এঁদের দেখা হয় না। এঁরা মেইলে মন উজাড় করে কথা বলতে পারে। কিন্তু এঁদের সামনাসামনি দেখা হয় না। আর একটা জিনিস, এখানে কোনও ফোন নেই। ফোন করলেই তো ডায়লগ হয়ে যাবে। সহজ হয়ে যাবে। হয়তো ফোন করেছে— কখনও বেজে গেছে, কখনও ধরেনি, হয়তো বা নেটওয়ার্ক পায়নি। কোথাও ফোন হারিয়ে গেছে। এগুলো আমাকে তৈরি করতে হচ্ছে। কারণ আজকের দিনে ফোন না করাটা অদ্ভুত। একটা খুব ডেসপারেট সিচুয়েশন, ফোনে পাচ্ছে না। তখনই মেইল করছে বা Whatsapp করছে। এই জিনিসগুলো আছে। এখানে কিন্তু বেশ কিছু দেশ উঠে আসছে। কখনও অর্ণব লন্ডনে, কখনও কলকাতায়, ঢাকায়। এবার যখন পৃথিবীর এতগুলো দেশ উঠে আসছে গল্পে, তখন সেখানকার সমসাময়িক রাজনীতি, মানুষের সমস্যা তো থাকবেই। ফলে ভারতবর্ষের সমস্যাগুলো যেমন থাকবে, এই হিংসাত্মক ঘটনা, মারামারি— এই যে ভায়োলেন্সটা হচ্ছে, এটা কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও হচ্ছে। ঠিক সেভাবেই প্রায় গোটা পৃথিবীর সমস্যাগুলোও থাকবে। একটা রাইটিস্ট ফোর্স উঠে আসছে, নিও ন্যাৎসিরা আসছে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা উঠে আসছে, ইকনমি ফল করছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় হচ্ছে— এগুলো আমাকে রাখতে হচ্ছে। এমন নয় যে, অর্ণব বা জয়ী কেউই এই বিষয়গুলো নিয়ে পণ্ডিত। এঁরা কেউই রাজনীতির লোক নয়। কিন্তু চারপাশে যা ঘটছে, সেটা ওঁরা দেখছে, জড়িয়ে পড়ছে। গল্পের প্রয়োজনে এগুলো প্রচ্ছন্নভাবে উঠে আসছে।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে রূপম ইসলাম একক— প্রিয়ম সেনগুপ্ত

■ ঈশান: ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ শ্রুতিনাটকে চরিত্রগুলোর নাম প্রায় একই থাকলেও, চরিত্র রচনার সময়কাল অনুযায়ী আদতে তাঁরা কতটা পাল্টেছে?

■ অঞ্জন : ‘প্রিয় বন্ধু’তে অর্ণব জয়িতাকে পাল্টায়, ‘প্রিয়বন্ধু আবার’-এ জয়ী অর্ণবকে পাল্টাবে।

অর্ণব কিন্তু প্রিয়বন্ধুতে পাল্টায়নি। ও সেই মানিকতলার বাড়িতেই থেকে গিয়েছিল। জয়িতা কিন্তু ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরছিল। অর্ণব জয়িতাকে ওঁর রুটটা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। সেই সময় দাঁড়িয়ে জয়িতা কিন্তু ভীষণ আধুনিক একটা মেয়ে। শ্রুতিনাটকে একজন মহিলা গাঁজা খাচ্ছে,মদ খাচ্ছে, একে বিয়ে করেছে, তাকে বিয়ে করেছে— এগুলো তখন জাস্ট ভাবা যেত না। ‘প্রিয়বন্ধু আবার’- এ কিন্তু জয়ী আরও আধুনিক। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমি রিপিটেশন করতে পারি না। দেখো আধুনিকতায় গাঁজা, মদ, সিগারেটটা ফ্যাক্টর নয়। আধুনিকতাটা তাঁর অ্যাটিটিউড, জীবনবোধ এগুলো দিয়ে আসছে। জীবনের অনেক ধাক্কায় ম্যাচিউর হয়ে এখানে জয়ী অর্ণবকে পাল্টে দেবে। আমাকে এখন অনেক খুঁজতে হচ্ছে যে, আগে কোন জায়গাটা কমপ্লিট ছিল না। আসলে আজ আমার শহরটাও তো পাল্টে গেছে। রাস্তাঘাট, তাঁদের নাম সব পাল্টেছে। অর্ণবেরও তেমন গানের শো হয় না আজকাল। ফলে ওঁকে সিনেমায় কাজ করতে হয়। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করতে হয়। সেখানেও সে ঝোলাচ্ছে, ডোবাচ্ছে। মাঝে মধ্যে বাইরে কনসার্টে ডাক পায়। ব্যাপারটা হল, এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে অর্ণবের কী অবস্থা, এগুলো লিখতে হচ্ছে। ফলে এটা চ্যালেঞ্জিং হলেও ভীষণ ইন্টারেস্টিং হয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ‘স্বাধীনতা আমি মানছি না’, সাফ জানালেন স্লিপিং পিলসের মনীষী

■ ঈশান: ‘প্রিয় বন্ধু’ একটি ভীষণ জনপ্রিয় শ্রুতিনাটক। ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ সেটার সিক্যুয়েল। যাঁরা অনুষ্ঠান দেখবেন বলে টিকিট কেটেছেন, তাঁদের প্রত্যাশা অনেক। আপনি লাইভে এসে বলছেন, ‘ম্যাজিশিয়ান ফেলও করতে পারে’। অনুষ্ঠানের আর সাতদিনও বাকি নেই। এই মুহূর্তে দর্শকের প্রত্যাশার চাপ কতটা আপনার কাছে?

■ অঞ্জন: প্রত্যাশার চাপ তো নিশ্চয়ই থাকছে। দু’টো জিনিস হতে পারে। এক হতে পারে, ব্যাপারটা একদম জমল না। লোকজন খুব রেগে গেলেন। বললেন, ‘আর কোনদিন এর অনুষ্ঠান দেখব না। ভরসা করে টিকিট কেটেছিলাম, টাকাটা জলে গেল।’

আর একদল হয়তো বললেন, ‘ধুর! এর দ্বারা আর নতুন কিছু হবে না। তাই এবার ‘প্রিয় বন্ধু’-টাকে ধরেছে। এবার ওটাকে চটকাচ্ছে।’ অনেকে এই মানসিকতা নিয়েও দেখতে বসবেন। তাঁরা বলবেন, ‘কই দেখি তো কীভাবে ডোবাচ্ছে…! এই ডোবাবে এবার। আর কিছু পায়নি, তাই বাড়ি বসে একটা শ্রুতিনাটক করেছিল, ওটাকে এখন চটকাচ্ছে।’

আসলে বিষয়টা কিন্তু সেরকম নয়। আমার মাথায় অন্য অনেক কিছু এসেছিল। একটা মনোলগও এসেছিল। যে একটা মানুষ ফোনে কথা বলে, জাস্ট বসে বসে ফোনে কথা বলে। করতেই পারতাম আমি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই চ্যালেঞ্জটা নিই, এই চ্যালেঞ্জটা নেওয়া দরকার। লেখার ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জটা মারাত্মক। এবার যদি মানুষের রিপিটটিভ মনে হয় তাহলে গেলো। আমাকে লেখার সময় এটাও মাথায় রাখতে হয়েছে যে কনসার্টে এমন বেশ কিছু মানুষ থাকবেন যাঁরা কিন্তু প্রিয় বন্ধু শোনেননি। তাঁরাও তো টিকিট কেটেই এসেছেন কনসার্টে। সুতরাং প্রিয় বন্ধুর রেফারেন্স আমার কাছে বিশাল ইমপর্ট্যান্ট নয়। গল্পের তাগিদে কোথাও হয়তো সেই রেফারেন্স থাকবে। কিন্তু একদম নতুন করে আমায় শুরু করতে হচ্ছে। আলাদা করে এটার একটা আইডেন্টিটি হবে।

‘প্রিয় বন্ধু আবার’ ক্যান নট বি ‘প্রিয় বন্ধু’। হয়তো কনসেপ্টটা একইরকম। ওখানে চিঠি ছিল। এখানে ই-মেইল। ইটস লাইক টু ডিফারেন্ট সংস অন কলকাতা। একটা ‘আমি আসব ফিরে তোমার পাড়ায়’ আর অন্যটা ‘পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব’ । ‘প্রিয় বন্ধু’ এবং ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ এই দুটো কমপ্লিটলি আলাদা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই দর্শকদের জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ থাকছে। সেটা এখানে বলছি না। বললে হয়তো তোমার বুঝতে সুবিধা হতো, কিন্তু ওটা কনসার্টের সন্ধের জন্য তোলা থাক।

আরও পড়ুন: কনসার্টের আগে এক্সক্লুসিভ আড্ডায় সিধু-পটাসহ ব্যান্ড ‘এসো বন্ধু’

■ ঈশান: আপনি বলছেন এটার একটা অন্য আইডেন্টিটি হবে। এটা কি আপনার ব্যান্ডের সঙ্গে একটা আলাদা অ্যালবাম আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে? যদি এটা হয় তাহলে জয়ীর কণ্ঠের জন্য আপনার পছন্দের শিল্পী কে?

■ অঞ্জন: সিডি আজকাল কেউ কেনে না। তবে পরে আমার নিজের যদি মনে হয়, যদি মনে হয় দর্শক চাইছেন, তখন অডিও-ভিজুয়াল একটা উপস্থাপনা হয়তো করা যেতে পারে, ইউটিউব রিলিজের জন্য। এখানেও একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। আগে রেকর্ড হতো, তারপর সিডি তারপর কিছু লোক জোর করে ‘এটা লাইভ করুন, লাইভ করুন’ বলে অনুষ্ঠান করিয়েছে। এখন কিন্তু কমপ্লিট উল্টো। আগে লাইভ হচ্ছে।

আর জয়ীর চরিত্রটা কে করতে পারে এটা একদমই আমার মাথায় আসছে না। আসলে এমন দাঁড়িয়েছে না চরিত্রটা, এতগুলো ভাষা জানে জয়ী! এটা আমার কিছুতেই মাথায় আসছে না।

 

■ ঈশান: ‘প্রিয় বন্ধু’র গল্প দু’টো নিয়ে ভবিষ্যতে ছবি তৈরির পরিকল্পনা আছে?

■ অঞ্জন: একদম না। এটা হয় না। আমাকে অনেকে অনেকবার বলেছে। এটা কোনওভাবেই হয়না। নাটক থেকে সিনেমা হয়নি, এমন তো না। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস এতটাই মাধ্যম-নির্ভর যে, সেটা অন্য মাধ্যমে জাস্ট ভাবা যায় না। বেলা বোসকে নিয়ে কতলোক ছবি করতে বলেছে, রঞ্জনা আমি আর আসব না গানটা নিয়ে কতলোক ছবি করতে বলেছে। ওটা দু’মিনিটের গল্প। ওটা নিয়ে ছবি হয় না। একটা ছেলে বারবার আসছে, বারবার মার খাচ্ছে, বারবার পালাচ্ছে এরকম হয় না কি?

‘প্রিয় বন্ধু’ নিয়ে ছবি করতে প্রচুর লোক বলেছে। অনেক টেলিভিশন চ্যানেল অ্যাপ্রোচ করেছে। কিন্তু হয় না। এরকম বিষয় নিয়ে সিনেমা বিদেশে হয়েছে, আমি দেখেছি। কিন্তু কী বোরিং!

কাজেই এটা এরকমই থাক। অডিও রেকর্ড করে করা যায়। এটা কিন্তু রেডিওতে করা যায়। কিন্তু আমাদের এখানকার রেডিওগুলো তো এখন পাল্টে গেছে। রেডিও এবং রেডিও অডিয়েন্স দু’য়েরই প্রোফাইল বদলে গেছে। এখন লোকে বাড়িতে আর রেডিও শোনে না, গাড়িতে শোনে। ফলে আপাতত লাইভ অনুষ্ঠানেই এটা থাক। এটাতে লোকে বাড়িতে বসে নিজের মনে, একটু কফি খেতে খেতে বা একটু বিয়ার খেতে খেতে এটা শুনবেন। আগে কত ইন্টিমেট শো হতো! একটা গিটার নিয়ে গাইছি, কথা বলছি। মানুষ শান্ত হয়ে শুনছেন। এখন চারপাশে ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার। কিন্তু কিছু করার নেই, সময়টা পাল্টে গেছে। কিন্তু এই প্যান্ডেমিকের সময় মানুষ আবার শান্ত হচ্ছে। বাড়িতে বই পড়ছে। বাড়িতে একা একা বসে এই ‘প্রিয় বন্ধু আবার’ শুনবে। সিনেমাটা থাক। ‘প্রিয় বন্ধু’ নিয়ে সিনেমা আমি করব না।

আরও পড়ুন: কনসার্ট ‘একসাথে একা’, আড্ডায় তমালকান্তি হালদার এবং সৌম্যদীপ

■ ঈশান: আপনি নিজে বারবার বলছেন মানুষ খুব কষ্টে আছে। এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর সোশিও-ইকোনমিক অবস্থায় একটা বদল এসেছে। সামান্য ডালভাত জোগাড় করতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। তারমধ্যেও দু’শো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মানুষ কেন এই অনুষ্ঠানটা দেখবেন?

■ অঞ্জন: এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর অবস্থা ভীষণ খারাপ। অনেক মানুষ সত্যিই ভীষন কষ্টের মধ্যে আছেন। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি একটা অন্য কথা বলি। এখন যদি আমি একটা ছবি করতে যাই, তাহলে আমাকেও অনেকবার ভাবতে হবে। যদিও আমি ভীষণ অল্প টাকায় ছবি করি। কোনওদিন আমি খুব বেশি টাকার ছবি করিনি। কিন্তু এখন তার থেকেও কমে করতে হবে। যত কম লোক নিয়ে করা যায়। কিছু করার নেই। রিটার্নস কোথা থেকে আসবে? সবাইকে এখন অনেক বেশি এফর্ট দিতে হবে। ভুল করা যাবে না। খুব অল্প লোকই দেখবে, খুব অল্প লোকের জন্যই করো। ভ্যাকসিন বেরোলেও বিশাল কিছু সুবিধা হবে না। একটা হিউজ কোল্যাপসের দিকে আমরা যাচ্ছি।

এবার তোমার প্রশ্নের উত্তরে ফিরি, আমার দর্শক কিন্তু মধ্যবিত্ত। তাঁরা বেশিরভাগ বাড়িতে আটকে আছে। এর মধ্যে লোকজনের মাথা খারাপ হয়ে যাবে, যদি সে তাঁর মনটা ঠিক না রাখতে পারে। শুধু পেটে দু’মুঠো ভাত জুটলেই মন ঠিক থাকে না। তখন আসে তাঁর বিনোদনের জায়গা। সে কী করছে, সে অ্যামাজন দেখছে বা কিছু একটা দেখছে। এবার সে যদি বাড়ি বসে গার্বেজ দেখে সে সেটাই পাবে আবার সে যদি বাছাই করে দেখে সে ভাল জিনিসটা পাবে। মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসছে বাড়িতে থেকে থেকে, সে গান শুনছে, বই পড়ছে কিন্তু তাতেও সে মন ভাল রাখতে পারছে না। একটা লোক বাইরে বেরোতে পারছে না, সে সিনেমা যেতে পারছে না, চিড়িয়াখানা যেতে পারছে না। সে শুধু খাচ্ছেদাচ্ছে আর সেভিংসের ওপর বেঁচে আছে। তাঁকে তো তাঁর মনের শান্তিটা দিতে হবে। এই ছোট ছোট বিনোদনগুলোও ভীষন জরুরি। কিন্তু এটা তাঁদের কথা ভেবেই বললাম, যাঁরা এই সময়ে দু’শো টাকা খরচ করার ক্ষমতা রাখেন। এটা যদি নর্মাল সময়ে হতো, টিকিটের দাম অনেক বেশি হতো। আমার একটা নাটকের টিকিটের দামই পাঁচশো টাকা। যেহেতু এমন খারাপ একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা সবাই যাচ্ছি, তাই টিকিটের দামটা ইচ্ছে করেই দু’শো টাকা রাখা হয়েছে। যাতে অনেকে ভাবতে পারেন যে, আজ একটু অনলাইনে পিৎজা অর্ডার না করে বরং অনলাইনে ‘প্রিয় বন্ধু আবার’-অনুষ্ঠানটা দেখি।

টিকিট কাটতে ক্লিক করুন

আপডেট থাকুন। ফলো করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ:

 

আর্কাইভ: প্রেরণা   ক্লিনিক   ব্লগ   বিজ্ঞান   লাইফস্টাইল   খেলা   ভ্রমণ   অ্যাঁ!   এন-কাউন্টার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *