সাহিত্য

জেলফেরত নজরুলকে প্রথম সম্বর্ধনা জানিয়েছিল মেদিনীপুর, উদ্যোগে মহিলারা

বিবিধ ডট ইন:  অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর কলেজে ( ডে কলেজ) ১৯২৪ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এক তরুণ জেলফেরত কবিকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের সভা। শহরের অভিন্ন বয়সি মেয়েরা সেই সভার আয়োজক ছিলেন । পঁচিশ বছরের যুবকটি উদাত্ত কণ্ঠে স্বরচিত গান, কবিতা শুনিয়ে শ্রোতাদের করেছিলেন বিমুগ্ধ। তাদের মর্মে বেজে ওঠে অগ্নিবিনার সহস্র বিপ্লবের দামামা।

আরও পড়ুন: পুলওয়ামা কাণ্ডের মূল চক্রী এখনও জীবিত? চাঞ্চল্যকর দাবি গোয়েন্দাদের

সেদিনের সেই গায়ক যুবক বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, মেদিনীপুর শাখার আমন্ত্রণে সম্বর্ধনা নিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি শহরে এসেছিলেন কবি। শহর জুড়ে কবিকে ঘিরে ওঠে প্রবল উন্মাদনা, সকলেই শুনতে চান এরকমই গান কবিতা। পরিষদের একাদশ বার্ষিক অধিবেশনে তাঁকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের বিষয়টি সংস্থার কর্মকর্তা খ্যাতনামা উকিলবাবুদের মাথায় এসেছিল।

আরও পড়ুন: একবোতল মদ আনিয়ে রেখো, বিদ্যাসাগরকে চিঠিতে লিখেছিলেন মধুসূদন

সেই সময়ে ব্রিটিশ বিরোধিতা প্রবল আকার নিয়েছে, একদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ইংরেজ বিরোধী বক্তৃতা অন্যদিকে বিদ্রোহী নজরুলের উত্তেজনাপূর্ণ গান কবিতা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছে, এর মধ্যেই গ্রেফতার হয়ে গেলেন নজরুল। গ্রেফতারের কারণ তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার ১২ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। ব্রিটিশ বিরোধিতার অভিযোগে সংখ্যাটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। তল্লাশি চলে পত্রিকা দফতরে। ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর কবির নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তিনি চলে যান কুমিল্লায়। সেখানেই গ্রেফতার। বিচারাধীন বন্দি হিসাবে কবিকে রাখা হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। পরের বছর ১৬ জানুয়ারি বিচারক এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ১৭ জানুয়ারি কবিকে আনা হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।

আরও পড়ুন: ২২ বছরের কেরিয়ারে ইতি! WWE-কে বিদায় জানালেন জন সিনা

১৯২২ সালে ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের পর ২২০০ কপি শেষ হয়ে যায় এক বছরে,যা বাংলা কবিতার জগতে অনন্য নজির। রবীন্দ্রনাথ তরুণ কবির প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানালেন। ১৪ এপ্রিল নজরুলকে আনা হয় হুগলি জেলে। রাজবন্দিদের প্রতি জেল অধ্যক্ষের অমার্জিত আচরণের প্রতিবাদে যুবক কবি শুরু করলেন অনশন। অনশনের ৪০ দিনে রবীন্দ্রনাথের হস্তক্ষেপে জেল কর্তৃপক্ষ রাজবন্দিদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নজরুল অনশন ভাঙেন মাতৃসমা বিরজাসুন্দরীর হাতে লেবুজল খেয়ে। ১৮ জুন কবিকে আনা হয় বহরমপুর জেলে। তিনি মুক্তি পান ১৫ ডিসেম্বর। বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করেছিলেন, কাজীকে সম্বর্ধনা দেবেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, মেদিনীপুর শাখা তাদের একাদশতম বার্ষিক অধিবেশনে জনপ্রিয় কবিকে সম্বর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আরও পড়ুন: স্ত্রীর চিতায় ঝাঁপ দিয়ে ‘সহমরণ’ স্বামীর!

সে বছর অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে এসেছিলেন ঐতিহাসিক ও ভারততত্ত্ববিদ নরেন্দ্রনাথ লাহা। এসেছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, নরেন্দ্র দেব ও শৈলেন্দ্রনাথ বিশী। নজরুলের প্রাণেরসখা পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ও। স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রগণ্য জেলা মেদিনীপুরের আহ্বানে সাগ্রহে সাড়া দিয়েছিলেন। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘মেদিনীপুরেই প্রথম কাজীকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করা হয়। তারপর বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা, মহকুমা পল্লী তাঁকে অভিনন্দিত করে।’’

আরও পড়ুন: উত্তরঙ্গ: জেলে থাকাকালীন লেখা সমরেশ বসুর উপন্যাস

২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় মেদিনীপুর কলেজে শুধুমাত্র মহিলারা কবিকে প্রকাশ্যে সম্বর্ধনা জানান। এক যুবককে প্রকাশ্যে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের মহিলাদের! মেদিনীপুর শহরের মহিলাদের এইরকম সভা সম্ভবত সেই প্রথম। সেদিন সন্ধ্যায় হার্ডিঞ্জ স্কুল (বর্তমান বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠ) প্রাঙ্গণের সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দনের উত্তরে তিনি শুনিয়েছিলেন নিজের গান। চতুর্থদিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় শহরের নওরংপুর ডাঙার অর্ধসমাপ্ত ইদগায় সম্বর্ধনা দেওয়া হয় কবিকে।মাত্র ৪ দিনেই নজরুল হয়ে উঠেছিলেন মেদিনীপুরের আত্মজন, তাঁদের জাতীয়তাবাদী চেতনা নজরুলের মনকে কতখানি ছুঁয়ে গিয়েছিল, তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙার গান’-এর উৎসর্গ করেছেন ‘মেদিনীপুরবাসীর উদ্দেশ্যে’।

আরও পড়ুন: ‘রায়চৌধুরি’ পদবি ভাল লাগত না উপেন্দ্রকিশোরের, কেন জানেন?

১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন নজরুল। কবি পরিবার পড়েন আর্থিক অনটনে, আবার পাশে দাঁড়ায় মেদিনীপুর। মেদিনীপুর কলেজের ছাত্র সংসদের অধীন ‘রবীন্দ্র শরৎ বঙ্কিম পরিষদ’-এর উদ্যোগে ২৪ অগস্ট ১৯৪৮ সালে ডায়মন্ড গ্রাউন্ডে (এখন অরবিন্দ স্টেডিয়াম) প্রদর্শনী ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয়। খেলায় অংশ নিয়েছিল মেদিনীপুর কলেজ একাদশ বনাম কাঁথি কলেজ একাদশ। চ্যারিটি ম্যাচের টিকিট বিক্রি ও ডোনেশান কার্ড থেকে পাওয়া তিনশো আকাশ টাকা আজহারউদ্দীন খান ও আর একজন ছাত্র কবিপত্নীর হাতে দিয়ে আসেন ২৮ অগস্ট।

আরও পড়ুন: ইংরেজ হওয়া সত্ত্বেও ‘নবান্ন’ নাটকে মুগ্ধ হয়ে বিজনকে চিঠি লিখেছিলেন বাটলার

এর পরেও আরেকবার মেদিনীপুর শহরে এসেছিলেন নজরুল। ১৯২৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি। মেদিনীপুর শহরে শিল্প প্রদর্শনী হচ্ছিল। দেবেন্দ্রলাল খানের উদ্যোগে তাঁর কাছারি বাড়িতে হয় প্রদর্শনী, কবি সন্ধ্যায় কাছারি বাড়ির ছাদে কয়েকটি গজল শুনিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: বলাইচাঁদ থেকে বনফুল, এই নাম পরিবর্তনের নেপথ্য-রহস্য জানলে অবাক হবেন

কিন্তু প্রথম মেদিনীপুর সফরের সঙ্গে একটি দুঃখজনক ঘটনার যোগ রয়েছে। মেয়েরা যে সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করেছিলেন তার শেষে এক শিক্ষক কন্যা কমলা দাস গান শুনে নিজের গলার হারটি পরিয়ে দেন কবিকণ্ঠে, একান্তই ভক্তি এবং আবেগ থেকে কাজটি করেছিলেন তিনি। কিন্তু সামাজিক গঞ্জনা থেকে বাঁচতে না পেরে কমলা আত্মহত্যা করেন।

লিখেছেন ঋষা নাগ

Leave a Comment
Share

Recent Posts

কাঠমান্ডুর রাস্তায় ইংরেজিতে তুখোড় কথা বলা পথশিশুর দায়িত্ব নিলেন অনুপম খের

  বিবিধ ডট ইন: সম্প্রতি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু ঘুরতে গিয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা অনুপম খের। স্যোসাল…

November 3, 2021

আফগানিস্তানে বিদেশি মুদ্রা নিষিদ্ধ করল তালিবান!

    বিবিধ ডট ইন: ১৯৯৬ থেকে ২০০১ অবধি তালিবান ক্ষমতায় থাকার সময় একের পর…

November 3, 2021

সদ্যোজাতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই! সামাজিক বয়কটের মুখে পরিবার

  বিবিধ ডট ইন: 'রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা, এমন কেন সত্যি হয়না আহা!'…

November 3, 2021

এবার ফতোয়া নয়, বাকস্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করছে তালিবান!

  বিবিধ ডট ইন: আফগানিস্তানের দখল তালিবানদের হাতে চলে যাবার পর থেকেই যে দেশের একাধিক…

November 3, 2021

অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে ফিরছেন যুবরাজ?

  বিবিধ ডট ইন: অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছেন যুবরাজ সিংহ? সম্প্রতি যুবরাজের…

November 2, 2021

NEET UG: রাজ্যে প্রথম, সর্বভারতীয় স্তরে ১৯ নম্বরে সোনামুখীর সৌম্যদীপ

  বিবিধ ডট ইন: সদ্য প্রকাশিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট নিট এর প্রকাশিত ফলাফলে…

November 2, 2021

This website uses cookies.