দুঃখ যে, একটা প্রতিভা ইয়ার্কিতেই ফুরাইল: ঈশ্বর প্রসঙ্গে কেন বলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র?

বিবিধ ডট ইন:  গ্রামের ছেলের শহরে আগমন। কলকাতার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মশার উপদ্রব সহ্য না করতে পেরে বলেই বসলেন, ‘রেতে মশা দিনে মাছি/ এই তাড়য়ে কলকাতায় আছি’। এই কথাটি কলকাতাবাসীর কাছে অপ্রিয় মনে হলেও সত্যি। কারণ তৎকালীন কলকাতাকে গ্রাস করে বসেছিল ডেঙ্গু। পরবর্তীকালে এটি প্রবাদে পরিণত হয়। এই প্রবাদের প্রবর্তক আর কেউ নন, বিখ্যাত কবি তথা সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।

কলকাতায় মামাবাড়িতে এসেছিলেন হওয়া বদল করতে। তখন তাঁর বয়স তিন। মামাবাড়িতে আসার পরই ধরলো অসুখে। ডাক্তার দেখে বললেন ঠান্ডা গরম জনিত সর্দি কাশি। তারই মধ্যে কলকাতার পরিবেশ ও মশার উপদ্রব যেনো আগুনে ঘি ঢেলেছে।
জন্ম কাচড়াপাড়ায় হলেও পারিবারিক কারণবশত বেড়ে ওঠা কলকাতার মামাবাড়িতে। ছোটবেলাতে পড়াশুনাতে অমনোযোগী হলেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বেশ একটি আশ্চর্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মুখে মুখে বানিয়ে দিতেন কবিতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ তাড়াতাড়ি চুকলেও নিজ উদ্যমে রপ্ত করেছিলেন বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষা।

প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে সেরকম কোনো ডিগ্রি অর্জন না করতে পারলেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তৎকালীন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ এর পরামর্শে ও যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহায়তায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ সংবাদপত্রে সম্পাদনার কাজে লেগে পড়েন। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন , তারই মধ্যে চলা রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে নিজ স্বাধীন মত প্রকাশ করতেন। একারণেই সাংবাদিকতার ইতিহাসে সন্ধ্যা, যুগান্তর, এর পরেই সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার নাম উঠে আসে। বাঙালীদের কাগজ রোজ পড়ার অভ্যাসটি তৈরির পিছনে মূল কারিগর হলেন এই ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।

এরই মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত খ্যাতি লাভ করেছেন। সাংবাদিকতার কাজের পাশাপাশি তিনি কবিতাও লেখা শুরু করেছিলেন। ব্যঙ্গের আশ্রয় নিয়ে গুরুতর আলোচনা। পরে ধীরে ধীরে যুক্ত হল কিছুটা গোঁড়ামি ও কিঞ্চিৎ অশ্লীলতা। এতকিছুর পরও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর প্রতিটি লেখার মধ্যে থাকত জীবনবোধের পরিপূর্ণতা।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সবকিছুর মধ্যেই নিজের ছাপ ফেলে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। কবিগান বাঁধা কবিয়ালদের কাছ থেকে রপ্ত করা ব্যঙ্গের মাধ্যমে নিজ মত পোষণ করার পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সমাজের খারাপ দিকটি সম্বন্ধেও সরব হয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই মতের সঙ্গে সমাজের উঁচুতলার লোকেদের মতের মিল থাকত না অনেক সময়, সে সবের তোয়াক্কা তিনি করতেন না। বাঙালিকে প্রথম বাংলা আধুনিক কবিতার স্বাদ কার্যত তিনিই দান করেন। শব্দ নিয়ে খেলতে বেশ পছন্দ করতেন। এজন্যই লিখেছিলেন, ‘মাস খাও মাস উদর ভরিয়া’ (১ম মাস বলতে ৩০ দিনে এক মাস, ২য় মাস অর্থে মাংস) আবার ‘তানপুরা আছে মাত্র, তান পুরা নাই’ (১ম তানপুরা হল বাদ্যযন্ত্র আর ২য় তান পুরা অর্থে সম্পূর্ণ তান)। তাঁর লেখায় শব্দের প্রয়োগ অত্যন্ত লক্ষণীয়।

এই মানুষটিকেই আবার অনেকে দেখেছেন নিজ স্ত্রী দূর্গমনির প্রতি বিরূপ আচরণ করতে। সমালোচকেরা বলে থাকেন, কুৎসিত ও হাবাগোবা স্ত্রীকে তিনি পছন্দ করতেন না। আবার এমনও শোনা যায় যে, কোনও এক সুন্দরী নারীর প্রতি প্রেম ছিল তাঁর এবং সেই কারণেই নিজ স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ করতেন ঈশ্বর গুপ্ত।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র নিজ সীমা বহুবারই ছাপিয়ে গেছেন। বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধাচরণ করে বিদ্যাসাগরকে হয়তো ব্যঙ্গ করছেন, আবার কোথাও তাঁর সেই সিদ্ধান্তকেই সঠিক হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। আবার কোথাও বেশি দামে বিদেশি পণ্যের বিক্রির বিরুদ্ধেও সরব হচ্ছেন, আবার কোথাও ইংরেজদের অত্যাচার সম্বন্ধে প্রতিবাদের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিলেন পত্রিকার সাহায্যে। আবার কোথাও নিজে ভুল প্রমাণিত হলে সেটাকে বদলেছেনও। কোথাও ‘নীরব’ জাতির উদ্দেশে লিখেছেন, ‘তুমি মা কল্পতরু আমরা সব পোষা গরু/ শিখিনি শিং বাঁকানো, কেবল খাবো খোল বিচালি ঘাস’।

এককথায় বলতে গেলে, গোটা সমাজব্যবস্থার ওপরই সমস্যা ছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর। ধর্মবিশ্বাস, সংস্কার, শিক্ষা, সবকিছুর ওপরই। একারণেই তাঁর লেখা কোথাও হয়তো শালীনতার মাত্রা অবলম্বন করেছে। ‘সংবাদ প্রভাকর’ই একমাত্র নয়, ‘পাষণ্ড পীড়ন’, ‘সংবাদ সুধারঞ্জন’, ও ‘সংবাদ রত্নাবলী’র মতো পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। বাংলা সাহিত্য হয়তো ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের কাছে সারাজীবন ঋণী হয়ে থাকবে। ইয়ার্কি, অশ্লীলতার ঘেরাটোপে বন্দি তাঁর লেখায় খানিক আশাহত হয়েই হয়তো বঙ্কিমচন্দ্র লিখতে বাধ্য হয়েছেন, ‘তিনি সুশিক্ষিত হইলে, তাঁহার যে প্রতিভা ছিল তাহার বিহিত প্রয়োগ হইলে, তাঁহার কবিত্ব, কার্য এবং সমাজের উপর আপত্য অনেক বেশি হইত… দুঃখ যে একটা প্রতিভা ইয়ার্কিতেই ফুরাইল।’ এ কথার যথার্থতা বিচারের ভার বঙ্কিমচন্দ্র এবং ঈশ্বরচন্দ্র দু’জনেই পাঠকের হাতে দায়িত্বভার তুলে দিয়েছেন। তবে ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় যে, সেই পাঠকবর্গ আবার স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবনা ও লেখনী শক্তির উন্মোচন ঘটার মাঝে মূল কারণ ছিলে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর উৎসাহ। বাংলা সাহিত্যের আধুনিককালের প্রথম কবি, তথা সাংবাদিকের পাশাপাশি প্রথম লেখনিশক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ এর বিরোধিতা করায় ঈশ্বরগুপ্ত গুপ্ত আজকের এই বাংলা সাহিত্যের নজরে তাঁর দুইকাধে দোষ গুণ বয়ে নিয়েও বাঙালির মনে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন এবং আগামীদিনেও থাকবেন, এমনটাই আশা করা যায়।

লিখেছেন অর্ঘ্য মৈত্র

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: