কেঞ্জাকুড়ার ‘মুড়ি’ মেলা

 

বিবিধ ডট ইন: দুধ সাদা মুড়ির সাথে লাল মাটির দেশ বাঁকুড়ার প্রেমগাথা অনেকেরই অজানা। ‘একরঙা এই জীবন ছেড়ে একটু পালানোর
তার বেশি হায়, কেই বা কী চায়
বেচা-কেনার হিসেবে খুশির খেলায়।
মোরা সবাই যাব রে,
সবাই যাব রে,
সবাই যাব যেরে মেলায়।’ পশ্চিমবঙ্গে মেলার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আর প্রতিটা মেলার পেছনেই লুকিয়ে আছে নানান লোকগাথা, যা আজও বর্তমানের সাথে হারিয়ে যাওয়া বঙ্গ ঐতিহ্যের মিসিং লিঙ্ক! আজও গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে শোনা যাবে এমনই অনেক মেলার গল্প, যা অনেকেরই ধারণার বিশ বাঁও বাইরে। কালের নিয়মে হারিয়ে যেতে চলেছে বেশ কিছু মেলা। মেলা তো অনেক রকমের হয়৷ মেলা মানেই মনের মনতাজে কোনও এক অজানা সত্তা গেয়ে ওঠে মহীনের গান, ‘পেরিয়ে মাঠের সীমানা ওই মেলা বসেছে,
চরকি ঘোরে, পাঁপড় ভাজায়
মাতালিয়া ঢোলকে মনকে মাতায়।
তোরা কে কে যাবি রে,
কে কে যাবি রে,
কে কে যাবি রে তোরা আয়।

পয়সা যদি নেই পকেটে ভাবনা কী আছে?

কিনতে মানা, চড়তে মানায়

ভিড়ে মেশা আনন্দের কি আসে যায়?
তোরা কে কে যাবি রে,
কে কে যাবি রে,
কে কে যাবি রে তোরা আয়।’

কিন্তু তা বলে শুধু মুড়ি নিয়ে আস্ত একটা মেলা? হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। শীতের কোনও এক দুপুর রোদে খোলা আকাশের নীচে দারকেশ্বর নদীর চর যেন অজান্তেই হয়ে ওঠে ‘মুড়িময়’।

মুড়ি একটি আঞ্চলিক ভাষা, সংস্কৃতে যার অর্থ ভৃষ্টান্ন। বাঁকুড়া জেলার ১ নম্বর ব্লকের কেঞ্জাকুড়া গ্রাম। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে দারকেশ্বর। আর তার ঠিক পাশেই রয়েছে সঞ্জীবনী মাতার আশ্রম। জানা যায়, ফি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে এই আশ্রমেই বসে হরিনাম সংকীর্তনের আসর। তা চলে পয়লা মাঘ থেকে মাঘ মাসের ৪ তারিখ অবধি। আর আসরের শেষ দিন, অর্থাৎ ৪ মাঘ বসে মুড়ি মেলা!

আশেপাশের গোঁসাইডিহি, মনোহরপুর, ঘাসতোড়া, রায়নগর, বদড়া, শালডিহা, পিঠাবাইদ, ভালাইডিহা প্রভৃতি গ্রাম থেকে মানুষ মুড়ি বেঁধে নিয়ে আসেন দ্বারকেশ্বরের চরে। বালি সরিয়ে ছোট ছোট গর্ত করলে সেখানে জমে মিষ্টি এবং সুস্বাদু জল, স্থানীয় ভাষায় একে চূয়াঁ বলা হয় । সেই চূয়াঁ থেকে জল সংগ্রহ করে মুড়িতে মেখে চলে খাওয়া-দাওয়া। বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা হয় মুড়ি খাওয়ার নানা উপকরণ । চপ, পকোড়া, বেগুনি, আলু পোড়া, বেগুন- টমেটো পোড়ানো, সরষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ কুচি ইত্যাদি। কথিত আছে, আশ্রমের আশপাশের এলাকা এক সময় ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা হরিনাম সংকীর্তন শুনে সন্ধ্যার পরে আর বাড়ি ফিরতে পারতেন না। সঙ্গে করে বেঁধে আনা মুড়ি বাতাসাই ছিল তাঁদের ভরসা। সেই রেওয়াজই ধীরে ধীরে মেলার চেহারা নিয়েছে।

ঠিক কবে থেকে এই মেলা হচ্ছে, তা ধারণা করা না গেলেও আন্দাজ প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসছে এই মেলা । কথিত আছে, এখানে মুড়ি খেলে নাকি জীবনীশক্তি বেড়ে যায়। মেলায় হাজির হওয়া গ্রামবাসীদের জন্য প্রতিদিন দুপুরে খিচুড়ি প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে সঞ্জীবনী মাতার আশ্রমে। দ্বারকেশ্বরে স্নান সেরে নদের চরে চলে খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়া। উৎসব চলে গোটা দিন। ফের একটা বছরের অপেক্ষা নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে নিজের নিজের গ্রামের পথে পা বাড়ান আট থেকে আশি।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: