ব্লগ: ঘাতকের কুঠারে লেখা সভ‍্যতার ইতিহাস— কৌশিক মুখোপাধ্যায়

এখনই শেয়ার করুন

অবশেষে ঘাতকের কুঠার নেমে আসে মাথার ওপর। কয়েক মুহূর্ত আগেই তার ঝকঝকে ফলায় ঠিকরে উঠেছিল উজ্জ্বল নিষ্ঠুর আলো। এখন রক্তাক্ত উল্লাস।
বৃহত্তর স্বার্থের রাজকীয় উদযাপন।

কয়েকটা লোক ছিল। তাদের কেউ দু’চোখে দেখতে পারত না, অনেকগুলো কারণে। প্রধান কারণ ছিল, তারা ছাপোষা; পয়সা নেই, পয়সা করার ফন্দিফিকিরও নেই। পেছনে দলভর্তি লোক নেই; ভিড় নেই। এই হাঁদা-ভোঁদা-বোকা লোকগুলো বড্ড বকবক করে। সবকিছু নিজের যুক্তিতে সাজাতে যায়।
আর বিরোধিতা করে।

কিন্তু এই প্যারালাইজড মানুষগুলো নিজে কিন্তু কোনও সমস‍্যা থেকেই বেরোতে পারে না। তাই সামাজিক গ্রহণযোগ‍্যতা নেই। আসলে তারা পাগলামি করে। অন‍্যদিকে আছেন আপনি। ব্রেকফাস্টে পাঁউরুটি, মাখন, ডিমসেদ্ধ, কলা খেয়ে ‘পরিধান’ করে নিলেন পরিপাটি গেঞ্জি, তার ওপর শার্ট বা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিটা বেশ খায়। তারপর সেট করে নিলেন থোবড়ার মাসলগুলো। আজ একটু চিন্তিত দেখাতে হবে। তার মধ‍্যেও যেন ফুটে বেরোয় যে আপনি সৎ, আপনি দয়ালু, আপনি পরোপকারী, আপনি উদার। কারণ, আপনি একটু ওপরতলার। সিংহাসন, মঞ্চ, অথবা বদ্ধদ্বার কোন সুখী বৈঠকে আপনার অবস্থান।
ম‍্যাকিয়াভেলি আপনাকে কানমুলে শিখিয়ে দিয়েছে, ‘শেয়াল আর সিংহ’। সাধারন মানুষ যেন আপনাকে দুর্বল না ভাবে, গরীব না ভাবে। তাই আপনি হেবি লোকেশন আর অ‍্যাঙ্গল দেখে সেলফি তোলেন। সেরা রেস্তোরাঁয় বসেন। বাদশাই খাবার। আর ঝাঁ চকচকে অ‍্যাপিয়ারেন্স।
আপনি মদ খান, আপনার মা তাতে কিচ্ছু মনে করেন না। করলেও ফেসবুকে তা দেখা যায় না। যেমন যায় না আপনার পরিবারের কারও ক্লান্তি, ভয়। তারা, আপনার মতোই… সদা হাস‍্যমুখ, হর-ওয়ক্ত খুশ।
আপনার এই দুর্বলতা প্রকাশে অনীহার একটাই কারণ, ইউ ওয়ান্ট টু রুল আদার্স ইন ইওর কনসাস অ্যান্ড সাব-কনসাস। তাই আপনাকে দুর্বল হলে চলবে না। আপনার ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলে মারাত্মক শাস্তি পেতে হবে। ‘ইনডিউসড ফিয়ার’ই ক্ষমতার উৎস!
আর ওইদিকে সমাজবর্জিত পাগলরা। কিছুই দেখে না, অথচ সামনের দিকে ঠায় তাকিয়ে। ওরা ভাবছে, ওদের ভূমিকা নিয়ে, সমাজে, সভ‍্যতায়, পৃথিবীতে। ওরা সাধারন। তাই প্রত‍্যেকে বন্দি তার নিজ নিজ চরিত্রে। নিয়তিপীড়িত চরিত্র এক একটা। তুমি যদি সাধারণ হও, তোমার বেরোনোর উপায় নেই তোমার নিয়তিনির্ধারিত নির্দিষ্ট ভূমিকা থেকে। সেই Joan of Arc-এর মত। ওরা চায় একটা স্বাধীন জীবন। জীবনকে তীব্রভাবে ভালোবেসে ওরা বাঁচতেও চায়। তবু নির্দিষ্ট মৃত‍্যুর দিকে এগিয়ে চলা ওরা কোনদিন আটকাতে পারে না। ট্র‍্যাজেডি।

একটা অটোমেটিক মেশিনের মতো। স্প্রিংটা গোটানো আছে হিসেব করে। আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে খুলতে থাকবে। অটোমেটিক।
বিশুদ্ধ ট্র‍্যাজেডির এটাই ব‍্যবস্থা। মেশিনটা দারুণ। সৃষ্টির আদিকাল থেকে তেল দেওয়া। আপনি, আপনারা, সবাই তেল দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রতিটি অত‍্যাচারী দিয়েছেন। অটোক্র‍্যাসি, ডেমোক্র‍্যাসি, নাজিজম, ফ্যাসিজম, কম‍্যুনিজম, সোশ‍্যালিজম— সব এক একটা স্মুদ যন্ত্রাংশ।
আপনার ওই মেশিনে ওরা পিষে মরে। মরছে। মরবেও। মহাভারতের ট্র‍্যাজিক মহত্বের মতো। তুমি যাদের হত‍্যা করতে চলেছ, তারা সকলেই মৃত। তবু অর্জুন বা ইদিপাসের মত ওরা প্রশ্ন করে। অর্বাচীন।
অবশেষে ঘাতকের কুঠার নেমে আসে মাথার ওপর। নিস্তব্ধতা। তারপর, সেইসব মৃতেরা আপনার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। ভয়ঙ্কর হাসতে থাকে।

 

একটা রিভলভার, কয়েকটা মৃত‍্যু, ক্ষুদিরাম কোনও ওয়েব সিরিজ চায়নি লিখলেন কৌশিক মুখোপাধ্যায়।

একটা রিভলভার, কয়েকটা মৃত‍্যু, ক্ষুদিরাম কোনও ওয়েব সিরিজ চায়নি বিবিধ ডট ইন

কৌশিক মুখোপাধ্যায়

যোগাযোগ: ফেসবুক

ছবি: s.studiobinder


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *