আফগানিস্তানে অনাহারে দিন কেটেছে সৈয়দ মুজতবা আলির

বিবিধ ডট ইন: সৈয়দ মুজতবা আলি ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উপন্যাসিক, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা। তিনি প্রধানত রম্যলেখক হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁকে এই একটি শব্দে ব্যাখ্যা করতে গেলে তাঁর পাণ্ডিত্যকে খর্ব করা হবে।

সৈয়দ মুজতবা আলি ১৯০৪ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর মাধ্যমিক তথা ছাত্রজীবন সিলেটেই কাটিয়েছেন। তিনি জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট, বিশ্বভারতী থেকে স্নাতক, মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।

প্রবন্ধের মত গুরুগম্ভীর সাহিত্যকে রম্যের আঙ্গিকে পরিবেশন করে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সবসময়ই। হিটলারের প্রেম থেকে শুরু করে ওমর খৈয়ামের কবিতা কোনওটাই বাদ পড়েনি।

শান্তিনিকেতনে পড়ালেখার পর আফগানিস্তান সরকারের অনুরোধে ‘কাবুল কৃষি কলেজে’ ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আফগানিস্তান অভিজ্ঞতা নিয়েই তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘দেশে বিদেশে’ বইটি।

‘দেশে বিদেশে’ মুজতবা আলির প্রথম বই। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল এই ভ্রমণকাহিনি। এর মাধ্যমেই মানুষের সাথে তাঁর প্রথম পরিচিতি ঘটে। দেশে-বিদেশে হলেও এটি মূলত তাঁর আফগানিস্তানের সফর ও অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা।

ভ্রমণ কাহিনিটি শুরু হয় হাওড়া স্টেশন থেকে পেশোয়ারের দিকে ট্রেন যাত্রা দিয়ে। তিনি বাংলাদেশের পরিচিত প্রকৃতিকে খুঁজছিলেন ট্রেনের বদ্ধ কামরার ভেতর থেকে। ট্রেন এগোনোর সাথে সাথে মুজতবা আলির আফগানিস্তান সফরের বর্ণনাও এগোতে থাকে।

ট্রেনে এক পাঠান বৃদ্ধের সাথে আলাপ হয় মুজতবা আলির। তিনি বলেছেন,

পাঠানদের উগ্র, রসকষহীন, আত্মকেন্দ্রিক ভাবলে ভুল করা হবে, মেহমানদারিতে তারা মাহির।

পাঠানরা অলস এবং আড্ডাবাজ জাতি হলেও তাঁরা আরামপ্রিয় নন। গালগল্প-আড্ডায় মশগুল থাকা স্বভাবের ভেতরেও তাদের অকৃত্রিম দেশপ্রেম আবিষ্কার করে মুজতবা আলি অবাক হয়েছিলেন।

পেশোয়ারে নেমে লেখক আশ্রয় নেন পাঠান আহমেদ আলির বাসায়। সেখান থেকে লেখক রওনা দেন আফগানিস্তানের পথে। তবে ওই দেশের চাঞ্চল্যকর অবস্থা দেখে লেখক শংকিত হয়ে ছিলেন। আফগান আইনে খুন বড় নগন্য বিষয়।

গন্তব্যস্থলের দিকে লেখকের যাত্রা এগিয়ে যেতে থাকে। পেশোয়ার থেকে তাঁর কাবুল যাত্রার বর্ণনা শুধু সাহিত্য নয়, তথ্যগুণেও অমূল্য। অচেনা দেশকে পাঠকের চোখের সামনে ছবির মতো করে ফুটিয়ে ধরেছে তাঁর কলমের জোর।

অবশেষে রেডিও ধ্বনি শুনে লেখক বুঝতে পারলেন, তিনি কাবুলে এসে পৌঁছেছেন। লেখক দাবি করেছেন, আফগানিস্তানের ইতিহাস না জেনে ভারতবর্ষের ইতিহাস জানা অসম্ভব। ভারতবর্ষ আর আফগানিস্তানের ইতিহাস এমনভাবে মিলেমিশে রয়েছে যে, এই দুই দেশকে আলাদা করাকে লেখক কুসংস্কার হিসেবে মন্তব্য করেছেন।

মুজতবা আলি কাবুল থেকে আড়াই মাইল দূরের খোঁজামোল্লা গ্রামে ছিলেন। কাবুল নিয়ে লেখকের সোজাসাপ্টা অভিমত,

পুরনো কোনও মসজিদ নেই, কোনও পুরাতাত্ত্বিক প্রদর্শনী নেই, কেবল বাগান রয়েছে।

এরইমধ্যে মুজতবা আলি ছুটিতে একবার দেশ থেকে ঘুরে এসেছিলেন। ফিরে এসে দেখেন আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ভীষণ গরম। এমনিতেই উপজাতিগুলির মধ্যে কোন্দল লেগেই থাকে। এরকমই এক অস্থিতিশীল অবস্থায় এক কুখ্যাত ডাকাত সর্দার কাবুল শহর দখল করতে আসে। এমন সময় ব্রিটিশ রাজদূত আমান উল্লার সাথে কথা বলে বিদেশিদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে ফেলার বন্দোবস্ত করলেন। এদিকে ভারতীয়দের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেই। এই চরম পক্ষপাতিত্ব মুজতবা আলি বেশ কড়া ভাষাতেই বর্ণনা করেছেন।

আফগানিস্তানের এরকম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে শাসক আমান উল্লা সিংহাসন ত্যাগ করে পালালেন। সিংহাসনের দখল নিল ডাকাতরা। দেশে একরকম জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছিল। ডাকাতরা যেখানে যা পাচ্ছিল ডাকাতি করে নিচ্ছিল। যেখানে সেখানে মানুষ মারছিল। শেষের দিকে লেখককে একরকম অনাহারে থাকতে হয়েছিল। এরকম পরিস্থিতিতে শেষে ব্রিটিশ লিগেশন থেকে মুজতবা আলির ভারতে ফেরার ব্যবস্থা করা হলো।

লিখেছেন মধুমিতা সিনহা

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: