রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘মড়কের গান’: সম্ভাবনা-সংশয়ের সেতুবন্ধন

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল ‘মড়কের গান’। শিল্পী আকাশ চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানটি নিয়ে ভক্তের চোখে কলাম লিখলেন অভিনব চক্রবর্তী। (ভক্তের চোখে ‘মড়কের গান’: সম্ভাবনা আর সংশয়ের সেতুবন্ধন)

‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে,
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভোরে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার,
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।’

সুকান্ত ভট্টাচার্যর লেখা কবিতা পাঠ করেই এদিনের অনুষ্ঠান শুরু করলেন সঞ্চালক কবীর চট্টোপাধ্যায়, অনুষ্ঠানের নাম— ‘মড়কের গান’। মড়কের গান— শব্দটি শুনলেই বোঝা যায় এই সন্ধ্যায় দর্শকরা চোখ ভিজিয়ে বাড়ি ফিরবেন। আরও বোঝা যায় আজ হয়তো শুধুমাত্র ধারাবাহিক গানের অনুষ্ঠান নয়, গানের বাইরেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সঞ্চালক অনুষ্ঠানের শুরুতে তারই ইঙ্গিত দিয়ে দিলেন বটে দর্শকদের, তবে আশা করা যায়, শ্রোতা এবং দর্শকরা আগে থেকেই আঁচ পেয়েছিলেন কোন পথে হাঁটতে চলেছে আকাশ চক্রবর্তীর ‘মড়কের গান’।

সবরকম আপডেট পেতে লাইক করুন বিবিধ-র ফেসবুক পেজ

আজ্ঞে হ্যাঁ, গান রচয়িতা, সুরকার এবং গায়ক আকাশ চক্রবর্তীর গানের অনুষ্ঠান ‘মড়কের গান’, একটি ডিজিটাল কনসার্ট। যার সাক্ষী ছিল গত ১৩ ডিসেম্বরের সন্ধ্যা। শীতের সন্ধ্যায় গানের আসর একটি অতি প্রত্যাশিত ঘটনা। তবে বিশ্বমহামারির কালে এই গানের আসর আপাতত রূপ বদলে ডিজিটাল কনসার্ট রূপে হাজির হয়েছে। শ্রোতা এবং দর্শকবন্ধুরা সরাসরি তাঁদের প্রিয় শিল্পীদের দেখতে না পেলেও, ঘরে বসে কিন্তু দিব্যি উপভোগ করতে পারছেন অনুষ্ঠানগুলো।

২০২০ সাল মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি দগদগে ক্ষত। অপ্রত্যাশিতভাবে মানবজাতির ওপরে আছড়ে পড়েছে এক ভয়ঙ্কর মড়ক। ধর্ম-বর্ণ-কর্ম নির্বিশেষে বৃহৎ অংশের মানুষ এই মড়কের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অর্থব্যবস্থা সম্পন্ন দেশগুলিও বাধ্য হয় মাথানত করে নিতে, এই মড়কের সামনে। উদাহরণ স্বরূপ অনেক দেশেই শুরু হয় ন্যাশনাল এমারজেন্সি। একে একে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হতে শুরু করে সরকারি এবং বেসরকারি অফিসকাছারি। এই ভয়ঙ্কর অবস্থার নাম রাখা হয় লকডাউন। লকডাউনে শুরু হয় কর্মী ছাঁটাই, বন্ধ হয়ে যায় সমস্ত যানবাহন, চলাচল ব্যবস্থা, বন্ধ হয়ে যায় দেশ ও রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার উপায়। দেশজুড়ে পরিযায়ী শ্রমিকেরা আটকে পড়েন বিভিন্ন শহরে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান প্রধান শহরগুলির রাস্তায় ভিড় বাড়তে থাকে কাজহারানো, ঘরহারানো মানুষের।

নিরুপায় শ্রমিকের দল বাধ্য হয়ে চেষ্টা করতে থাকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যাওয়ার। দেশের জাতীয় সড়কগুলোতে তখন গিজগিজ করছে পরিযায়ী শ্রমিকদের দল। অনেককেই দেখা যায় সদ্যজাত সন্তানকে কোলে নিয়ে পথ হেঁটে চলেছেন, একটু থেমে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার মতো সময়ও তাঁর নেই। হাঁটতে হাঁটতে সেই মা জানিয়ে যাচ্ছেন, তাঁকে এখনও কয়েকশো কিলোমিটার হাঁটতে হবে। দেখা যায় ঠেলাগাড়ির ওপর পুরো সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র চাপিয়ে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য হাঁটছেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ওঁর স্ত্রী, ঠেলার এককোণে একটু জায়গা দখল করে হেঁটে বাড়ি ফিরবার ক্লান্তি দূর করছে ওঁদের সন্তান।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘বেস্ট অফ অঞ্জন দত্ত অ্যান্ড দ্য ব্যান্ড’— অরিঘ্ন মিত্র

আকাশ চক্রবর্তী ‘মড়কের গান’ শুরু করলেন যে গানটি দিয়ে, তার নাম ‘রাস্তা হাঁটার গান’। গানের প্রতিটি শব্দে আকাশ বুঝিয়ে দেন, শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরতে বাধ্য করা মানবতার প্রতি একটি জঘন্য অপরাধ। এই গানে তিনি বলেন ‘হাঁটতে থাকা মানুষগুলো রাস্তা মেপে যায়, রাস্তা রাগে লালচে হয়ে যায়।’ কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রাস্তায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেকেই। অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন। এমনও নজির রয়েছে নিরুপায় হয়ে একটি বাইসাইকেল চুরি করেছেন একজন মানুষ, লিখে রেখে গিয়েছেন একটি নোট ‘আমাকে ক্ষমা করুন, আমার আর কোনও উপায় ছিল না।’


গানের অনুষ্ঠানে আকাশ চক্রবর্তীকে দেখা গেল অন্য এক রূপে। তিনি এই অনুষ্ঠানে আজ তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যাঁদের উপেক্ষা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে বর্তমান সমাজব্যবস্থা। মড়কের গানে শ্রোতাদের স্বাগত জানিয়ে আকাশ বলেন— ‘মড়ক এক এমন সময়, যখন পথে আমাদের নামতেই হবে। এই মড়ক অবশ্য বলেই দিয়েছে যে আমাদের ঘরেই থাকা উচিত। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে পথে নামতে আমরা বাধ্য হচ্ছি, প্রত্যেকদিন। আপনি কৃষক হন, আপনি শিক্ষক হন, আপনি ছাত্র হন, আপনি যুবক হন, আপনি গৃহবধূ কিংবা আপনি শিল্পী হন, মড়ক এলে পথে আপনাকে নামতেই হবে। এবার সেই পথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া মিছিলে আপনি যোগ দেবেন? নাকি আক্ষরিক অর্থে আপনি পথে বসবেন, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার।’

অনুষ্ঠানে শোনা গেল সঞ্জয় খাসকেল নামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ানো একজন অনামি কবির কথা, যাঁর কথা হয়তো তাঁরাও মনে রাখেননি, যাঁরা ওঁর কবিতা কিনে পড়েছেন। আকাশ জানান, একটি পাতায় চারটি করে কবিতা ডিটিপি বা ফটোকপি করে নিজেই রাস্তায় ঘুরে কবিতা বিক্রি করতেন সঞ্জয় খাসকেল। দাম নিতেন মাত্র দু’টাকা। সঞ্জয় খাসকেলকে নিয়ে লেখা গানটি গাইতে গিয়ে আকাশের মনে পড়ে যায় লোকাল ট্রেনের কথা তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সময়ে আমরা দেখেছি কত মানুষের রুটিরুজির জন্য ট্রেনের প্রয়োজন ছিল! ট্রেন আসেনি। আবার কত মানুষের জীবনে অসময়ে চলে এসেছে ট্রেন, তাঁদের সঞ্চয়ের রুটির উপরে তাঁদের শেষ রক্তবিন্দু ছিটিয়ে দিতে। প্রশ্ন একটাই। আপনি ট্রেনের কোথায় আছেন? পাশে? ভিতরে? না তলায়? সময়ের রেলগাড়ি নতুন প্লাটফর্মে ঢুকছে, প্লাটফর্ম নম্বর ২০২১, পিষে মরতে না চাইলে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হন বন্ধুরা।’

আরও পড়ুন:  রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘তিমির বিশ্বাস একক’: অরিঘ্ন মিত্র

শীতকালের সন্ধ্যায় গানের অনুষ্ঠানে প্রেমের বীজ লুকিয়ে থাকে। থমথমে পরিবেশকে মধুর করে তুলতে আকাশ চক্রবর্তী তাঁর ঝুলি খুলে বের করলেন প্রেমের কবিতা, প্রেমের গান। গিটারের সাথে ওঁর প্রেমের কবিতা শুনলে মন হালকা হয়ে যায় বটে, তবে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে প্রেমের গান ‘প্রীতিলতার নিশান’ গানটি গাইলেন আকাশ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বহু নিয়মকে যুক্তির জালে আটকে উপড়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে যায় এই গান। সমাজের বিভিন্ন স্তরে আজও নারীদের যখন অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয় কিংবা লড়াই করতে হয় কোনও আপত্তিকর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, সেই অবস্থায় এই গান উদ্বুদ্ধ করতে পারে স্বতন্ত্রভাবে নারীদের বেঁচে থাকার অধিকারবোধকে। ‘প্রীতিলতার নিশান’ গানটি আক্ষরিক অর্থেই একটি প্রেমের গান।


‘মড়কের গান’ নিয়ে অনুষ্ঠানের পূর্বেই সোশ্যাল মিডিয়ায় খানিক সাড়া পড়ে যায়। বিশিষ্ট গায়ক শিল্পী রূপম ইসলাম। ‘মড়কের গান’ নিয়ে তাঁর উৎসাহ প্রকাশ করেন ফেসবুকে, তিনি লেখেন, ‘পরবর্তী এককের ঘোষণা হয়ে গিয়েছে।’ রূপম ইসলাম একক একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, এই অনুষ্ঠানকে রূপম একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে দেখেন। আকাশ চক্রবর্তীর ‘মড়কের গান’-কেও সেই আন্দোলনে সামিল করেই এই সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান দেখতে হাজির ছিলেন রূপম ইসলাম। ছোটবেলা থেকে আদর্শ মেনে চলা তাঁর ‘মাস্টারদা’কে (রূপম ইসলাম) নিয়েও গান লিখতে ছাড়েননি আকাশ। রূপমকে নিয়ে লেখা সেই গান গাইতে গাইতে আকাশ গেয়ে ওঠেন রূপমের ‘দানিকেন’ গানের অপ্রকাশিত অংশটি। এই অংশটুকু শোনা যায় শুধুমাত্র রূপম ইসলাম এককে। রূপমের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আরও শরিক হিসেবে অনুষ্ঠানের মান এবং হুঁশ বজায় রাখেন আকাশ। কখনওই তিনি উত্তেজনা কম হতে দেননি অনুষ্ঠানের।

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে আকিব-শিবাশিস-আকাশের ‘জোটজমাট কনসার্ট’

গানের মাঝে বারবার ফিরে এসেছেন বর্তমান সময়ের কথায়, যুক্তি সহকারে বাণ ছুড়েছেন সমাজের চোখ খুলে দিতে। তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছেন ব্যর্থ লকডাউনে ভুগতে থাকা মানুষদের হয়ে, কখনও হাথরাসে ঘটে যাওয়া জঘন্য ধর্ষণের বিরুদ্ধে, কখনও গানে গানে গলা মিলিয়েছেন আন্দোলনরত কৃষকদের সাথে। নতুন ও পুরনো নিজের গান দিয়ে সাজিয়েছেন স্বাধীন বাংলা গানের স্বাধীন অনুষ্ঠান। রূপসা দাশগুপ্ত অনুষ্ঠানের শেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন এই অনুষ্ঠান তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছে। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা গানের অনুষ্ঠানে নিজের সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে ভয় পায় না দেখে তিনি খুশি হয়েছেন।
‘মড়কের গান’-এর ইতি টানতে গিয়ে আকাশ আশার আলো ছড়িয়ে গিয়েছেন তাঁর গানের মাধ্যমে। গানের নাম— ‘গরমভাতের গান’। সারা দেশজুড়ে লকডাউনের সময়ে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে নিঃস্বার্থ হয়ে ছুটে এসেছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তেমনই একটি উদ্যোগ কমিউনিটি কিচেন, প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষের খাবারের যোগান দিয়ে চলেছে এই কমিউনিটি কিচেন। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়ে আকাশের এই গান যেন এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। ‘সারা পৃথিবী জুড়ে, সবার ঘরে ঘরে গরম ভাতের গন্ধ থাক’— এইরকম একটি আশাবাদী গান এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ভীষণ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। চারপাশে একলহমায় জ্বলে ওঠে আধুনিককালের ‘আমার সন্ততি স্বপ্ন থাক’ বা মধ্যযুগের ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’র মতোই সম্ভাবনার আলো। ‘এক আকাশ আলো’!

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে ‘পূজাবার্ষিকী রূপম’— অর্ণব রায়

বাংলার স্বাধীন গানের লড়াইয়ে শিরদাঁড়া সোজা রেখে ফরমায়েশি গানের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া একজন সৈনিক হিসেবে আকাশ চক্রবর্তীর অবদান বাংলা গানের ইতিহাস মনে রাখবে। বর্তমানের স্বাধীন বাংলা গানের শিল্পীদের আরও উদ্বুদ্ধ করতে আকাশ চক্রবর্তীর এই পদক্ষেপ কতটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে আলোচনা চলবে ঠিকই। আপাতত অরেঞ্জ প্রোডাকশন এবং আকাশ চক্রবর্তীর ‘মড়কের গান’ যে বাংলা স্বাধীন গানের পথচলা, ডিজিটাল কনসার্টের সাফল্যের ধারা বজায় রাখছে, বলা বাহুল্য।

ভক্তের চোখে ‘মড়কের গান’: সম্ভাবনা আর সংশয়ের সেতুবন্ধন লিখলেন অভিনব চক্রবর্তী

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: