‘মিত্র’, তোমার স্মৃতির হাত ধরে

এখনই শেয়ার করুন

যদি মনে করেন বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, তাহলে আমরা বলি ‘এই গিটারটাও বন্দুক হয়ে যেতে পারে, যদি ভয় দেখাও’।

বাকি তিনতলা ঠিক খালি নয়,

ধোপা থাকে, গাধা নিয়ে অতিকায়।

পাঁচতলা ফেড়ে ওড়ে সাদা শার্ট

ভাবখানা বাবুদেরই খোলা মাঠ।

ছ’তলা ছোটদের ইস্কুল

আন্টির কাঁধে বসে বুলবুল

বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে আমাকে জুড়ে রেখেছে হলদে বাড়িটা। গোটা একখানা টিফিন পিরিয়ড ছিল রোজ, কোলাপ্সেবল গেটের ওপারে। আমি পুষে রাখি পাঁজরাতে হারানো ছোট্টবেলা। আনন্দমেলায় নকশীকাঁথার মাঠ ছিল, হরিশ পার্কের ওপারে সদ্য খোলা রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কে জিরো ব্যালেন্সে account বানানোর তাড়া ছিল। ঠিক সাড়ে ১২টা নাগাদ তিলতলার চার নম্বর রুম থেকে হাবুদার দু’টো ডিম দিয়ে তিনটে ডিমপাউরুটি বানিয়ে বিক্রি করার তাড়না দেখতে দেখতে কেটে যাওয়া অনেক অলসে শীতের দুপুর ছিল। ছিল নিখিলেশবাবুর টেবিলে স্কেল পিটিয়ে বাজানো কফি হাউসের গান। ছিল বুধ আর শনিবারে তাঁর পড়া ধরার ভয়ে মাথায় চুপচুপে করে ঘানিভাঙা নারকেল তেল মাখবার অলিখিত কত নিয়ম…।

আর ছিল শসা মাসি… সারা গায়ে ছুলি পড়া সাড়ে চার ফুটের এক বুড়ি। মোটাদানার বিটনুন দিয়ে বড় বড় দানাওয়ালা শসা বিক্রি করত গেটের বাইরে। শুনেছি,হাঁটুর উপরে লুঙ্গি পরা সাদা চুলের ঘুগনিদাদু কবেই মরে গেছে! বামদিকের কলঘরের পাশে বিভূতিদা বসে থাকত…. প্যারালাইজড। আসতে যেতে হাতে ঘড়ি পরা কাউকে দেখলেই জানতে চাইতো, ‘ক’টা বাজে?’

কেটে গেছে অনেক বছর। যে দেওয়ালটাতে খড়ি দিয়ে উইকেট এঁকে বোর্ড আর কাগজের বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম আমরা, সেখানে আজ কেউ খেলতে পারে না। সেখানে দেখলাম কিছু গাছের চারা গজিয়ে উঠছে। আগের মতন অর্ধেক কাঁচা উঠোনটাও নেই আর। সময়ের সাথে বদলে গেছে সবই প্রায়।

মাঝে মাঝে যখন এই দালানটাতে গিয়ে বসি আর ভাবি…. মনে হয় বয়সটা বুঝি সত্যি বেড়ে গেছে আমাদের। আর ফিরে আসি ভারাক্রান্ত কিছু প্রশ্ন নিয়ে…..

আমি বড় হয়ে গেছি দেখো…. বহুদিন পর। আদতে তিনতলা এই বাড়িটার সামনে ঠেলাগাড়িতে ঘুগনির ডেকচি  আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই ছোট্টবেলায়। যে ছোট্টবেলায় সাদামাটা ফিলামেন্ট বালবের আলোয় মায়ের মুখখানা সপ্তমীর দুর্গাঠাকুরের মতন লাগত।

আমাদের সময়কার সেই মিশকালো, হাঁটুর উপর লুঙ্গি পরা ও সদাই রক্তচক্ষু ঘুগনিদাদু মরেই গেছে বছর তিনেক হল। নেই শালপাতার চল। গ্লোবালাইজেশন হতে থার্মোকলে যে কবে বদলে গেল বুঝতে পারিনি আমরা। তবু এক শূন্যতাকে অগ্রাহ্য করে ছোট্টবেলায় গুনগুন করা গানটা বাজছে মাথার ভিতর…. মায়ের সেই গানটাও একটা বোধের মতন ফিরে আসছে, ‘মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই….’

১৯২৪ থেকে ১৯৬০ মিত্র স্কুল দেখেছিল জীবন্ত এক কিংবদন্তীকে… স্যার কেসি নাগ। সে সময় ম্যাট্রিকের প্রথমদিকের র‍্যাঙ্কগুলো বাঁধা থাকল এই স্কুলের ছেলেদের। পূর্ণ সিনেমার কাছে মিষ্টির দোকানের বিখ্যাত ‘মাতৃভোগ’ রেজাল্টের দিন নাম পাল্টে হয়ে যেত ‘মিত্র ভোগ’ (তথ্যঃ- ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,আনন্দবাজার পত্রিকা)। কোন কোন শিক্ষকের শ্রমের ফসল ঘরে তুলত ইস্কুল? বাংলায় কবিশেখর কালিদাস রায়, সংস্কৃতে পণ্ডিত জানকীনাথ শাস্ত্রী, ভূগোলে যতীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র, আর্টে দেবীপ্রসাদ চৌধুরি…

 

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

এক একটা বসন্ত আসে, আর তুমি আমায় প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করো। কেমন ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছি রোজ!

ছোটবেলায় ধোপাদের কাপড়কাচার শব্দ শুনতেন ভবানীপুর মিত্র স্কুলের এই প্রাক্তনী তাঁর বাড়ির পিছনে, তাঁর কানে লেগে ছিল সেই তাল, আর ছিল লোকমুখের স্পন্দের উপর ভর করার সাহস, কথার চালগুলি ভালে করে লক্ষ করবার ইচ্ছে। ভেবেছিলেন, লিখতে হবে ঠিক তেমন করে, যেমনভাবে কথাবার্তা বলে লোকে, ছন্দকে তুলে আনতে হবে, কেবল সেইখান থেকে। আর, ঠিক সেখান থেকে তুলতে পেরেছেন বলেই বাংলা অক্ষরবৃত্তে একটা স্বাভাবিক বাচন তৈরি হয়ে গেছে তাঁরই কবিতার পথ ধরে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবি হয়ে-ওঠার প্রস্তুতিপর্ব শুনিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ, কুড়ি বছর আগে তাঁর সময়ের জলছবি-তে। বহরমপুরে এক সন্ধ্যার অন্ধকারে পথ হাঁটতে-হাঁটতে সুভাষ আর শঙ্খ কথা বলছিলেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মাত্রারীতিতে তিনি যে প্রায় বৈপ্লবিক এক বদল এনে দিয়েছেন, তা নিয়ে সুভাষ উত্তর দিচ্ছিলেন শঙ্খের প্রশ্নের, বলছিলেন, বিশ্লেষণ করা ছন্দজ্ঞানের দরকার হয় না কবির, দরকার হয় কেবল বোধময় ছন্দজ্ঞানের। চল্লিশের দশকে ‘পদাতিক’-এর কবি পেরিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, দাঙ্গা; সদস্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির, স্বাধীনতার পর তা নিষিদ্ধ হওয়ায় জেলেও কাটে কিছুকাল, লিখেছিলেন,

শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্তের কান্না

প্রতি নিশ্বাসে আনে লজ্জা।

বহুকাল পরে আবার লিখেছিলেন ‘লেনিন যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,/  শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে—/ একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে।।’.. ‘ফাইট সৌমিত্র ফাইট’, এটাই কি তিনি নিজেকে বলছিলেন শেষ সময়?

আজ আর তার উত্তর পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বোড়ালের নিশ্চিন্তপুর এখন যে আর ভূতেদের আড়ৎ নেই। সেখানে নাকি মাঝরাত্তিরেও স্ট্রিট লাইটের আলোতে পাখি ডাকে এখন। আচ্ছা মুকুলের এখন হাসি পায়? নাকি এখনও সে গোমড়ামুখো রয়ে গেছে?

শুনেছি ফেলুদা টিভিতে চুটিয়ে বিজ্ঞাপন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বয়েসের ভারে আক্রান্ত পুরনো ফেলুদাকে নাকি দর্শক আর খায় না ভাল। মগনলালটাও আর নেই। বোধহয় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে। জটায়ুকেও কেউ আর বাদাম কা সারবাৎ খেতে আকুতি করে না। আর কেউ বলে না, ‘খেয়ে নিন হালুয়া মোহান বাবু….উতে আজ বিষ নাই’।

নিউমার্কেটের ডালমুটের দোকানটা আছে? থাকলেও কেউ তার খোঁজ নেয়নি মাস দেড়েক। লকডাউন চলছে যে দেশে.. মড়ক লেগেছে মড়ক। তাই প্রখর রুদ্রের গল্প সমন্বিত ‘করোনার করালগ্রাসে’ এবার পুজোয় না বেরোনোর সম্ভাবনা প্রবল। সেই সর্বশক্তিমান প্রফেসর’টার খোঁজে হুলিয়া জারি হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। স্বর্ণপর্ণী’র ফরমুলাটা আবিষ্কার করতে পারছে না কেউ তাই। বোধহয় দূরের কোনও দ্বীপে তাঁকে নির্বাসিত করেছে কেউ। তিনি কি সকালবেলা নিয়ম করে ফেলুমিত্তিরের মতন যোগাসন করেন? নাকি বুক অবধি দাড়ি নিয়ে টাইম মেশিনে চেপে চারমিনারের রিং ছাড়তে ছাড়তে হীরক রাজার দেশে ভ্রমণ করেন এখনও?

মন্দার বোসের কী হল? সিধুজ্যাঠা থাকলে হয়তো বলতে পারতেন। হয়তো তিনি সাতসকালে লেকের ধারে মর্নিং ওয়াক ফেলে ছুটে এসে ফেলুমিত্তিরের কলিংবেল চেপে বলতেন, ‘শুনেছো ফেলু, মন্দার বোস ডেড। তাও বিনা চিকিৎসায়।’

ভূতেরাও যে নাচতে পারে তুমিই শিখিয়েছিলে। তোমার হাত ধরেই প্রথম প্ল্যানচেট শেখা,আলকেমি জানা, মধ্যবিত্তের বিছানায় শুয়ে সোনার কেল্লা থেকে আটলান্টিস, এল-ডোরাডো ঘুরে বেড়াবার স্বপ্ন দেখতে শেখা।

 

তারপর জানি না কী যে হল…..! বড্ড বড় হয়ে গেলাম ভুল করেই। অপু দুগ্‌গার গল্প কেমন জানি না অবাস্তব মনে হতে থাকল। মানুষের জীবনযাপন আদৌ এরকম হয়? এখন আর রোজ রাত জেগে প্ল্যানচেট করতে না পারলেও মন খারাপ হয় না জানো! বরং হতাশ হই নতুন লঞ্চ করা আইফোন কিনতে না পারার জন্য। কিংবা উঠতে বসতে ওলা-উবেরে চড়ে শহর ঘুরতে না পারার জন্য এক এক করে র‍্যাক্সসিট, ডাকু গান্ডারিয়া,ক্যাপ্টেন স্পার্ক’রাও হারাতে শুরু করল। বহুবার ভেবেছিলাম গিরিডি থেকে ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু’র ইউএফও-টা আমার বাড়ির ছাদে এসে নামবে একদিন। আর আমায় টাইম মেশিন দিয়ে যাবে। আর আমি….আমি ফিরে যাব সেই ফেলে আসা ছোট্টবেলায়। কই সে এল না তো আজও! এরই মাঝে আমার শৈশব থেকে চুরি হয়ে গেল মিরাকিউরল, অমনিস্কোপ ইত্যাদি প্রভৃতি।

আমি এখন সিলে-বাসে চেপে প্রখর রুদ্রের থেকেও জোরে ছুটতে বাধ্য হচ্ছি রোজ। হয়তো লালসায়, হয়তো বা প্রত্যাশার চাপে এখন আর বইয়ের তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে বার করা বইগুলো সারা দুপুর চিলেকোঠার ঘরে বসে পড়া হয় না।

এরকম কিছু মনখারাপ সবারই থাকে। থেকে যায় চিরকাল। ওই যেমন ভ্যান গঘ বলেছিলেন, ‘The sadness will last forever’. কিন্তু তুমিই আমাদের শিখিয়েছিলে, মনখারাপ আগলে বসে থাকতে নেই। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে গায়ে ব্যথা বাড়িয়েও লাভ হয় না কোনও। বরং থুরথুরে সেই বুড়ির মতো নিজের ঝুরঝুরে বাড়িটাকে মেরামতের চেষ্টা করাই ভাল। হাজার মনখারাপের মাঝেও, হাসি পেলে হেসে ওঠাই ভাল। হাসছি কেন সেকথা অন্য কারোর না জানলেও চলবে। ঘুমের ঘোর ঘনিয়ে আসার আগে, গানের পালা সাঙ্গ করতে হবে আমাদের সবাইকেই। ভুলের এই ভবে, ছন্দটুকু কেবল অসম্ভবের হোক। আমরা গান গাই সেতুবন্ধনের জন্য। বাংলা লিরিক আর সমসাময়িক পাশ্চাত্য সুর…. এই নিয়ে দল বেঁধে আমাদের পথ চলা।

 

লেখা ও ছবি: সায়ন্তন মণ্ডল (প্রাক্তন ছাত্র, The MITRA Institution Bhowanipur)


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *