শিবরাম-স্মৃতি: ওষুধ শেষ বলে টাকা চেয়েছিলেন, দিতে পারিনি— কথাকার, অধ্যাপক স্বপন পাণ্ডা

শিবরাম চক্রবর্তীর সঙ্গে একবার সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলেন বর্তমানে গুরুদাস কলেজের বাংলার বিভাগীয় প্রধান তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক স্বপন পাণ্ডাবিবিধ ডট ইন-এর পাতায় তিনি সেই অভিজ্ঞতাই তুলে ধরলেন ‘শিবরাম-স্মৃতি: ওষুধ শেষ বলে টাকা চেয়েছিলেন, দিতে পারিনি‘ শীর্ষক রচনায়।

 

আমার জীবনের একটা সময় কেটেছিল বিহারের বহড়াগড়ায়। এখন সেটা ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত। বহড়াগড়া কলেজে আমি তখন বাংলা অনার্স পড়ি। ১৯৭৯ সালের ঘটনা। ওই কলেজের প্রথম ব্যাচে ছিলাম এবং সেই ব্যাচের আমিই একমাত্র ছাত্র। বস্তুত আমারই আবদারে পঠনপাঠন শুরু করেছিলেন অধ্যক্ষ মৃণালকান্তি মহাপাত্র। একদিন স্যার আমাকে বললেন, ‘ঘাটশিলা কলেজে বলে রেখেছি। মাঝেমধ্যে ওখানে ক্লাস করে এসো। এখানে তো বইপত্র তেমন নেই। তাছাড়া ওখানেই তোমার পরীক্ষার সেন্টার পড়বে। অধ্যাপকদের সঙ্গে আলাপ করো ওখানে গিয়ে। ক্লাস করো মাঝেমধ্যে।’ সেই থেকে আমার ঘাটশিলা যাওয়া শুরু। বহড়াগড়া থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার।

 

ঘাটশিলা কলেজে তখন বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন কবি সুবোধ সিং। বহড়াগড়ায় বাড়ি ছিল ওঁর। উনি খুব স্নেহ করতেন আমায়। এই সময় মাঝেমধ্যে আমরা বিভূতিভূষণের বাড়ি যেতাম। একদিন আমরা দু’জনে হাঁটতে বেরিয়েছি, সুবোধবাবু এক ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, ‘ওঁকে চেনো?’ আমি বললাম, ‘না তো। আগে কখনও দেখিনি।’ তখন স্যার বললেন, ‘উনি শিবসত্য চক্রবর্তী। শিবরাম চক্রবর্তীর একমাত্র ভাই।’ এই কথা শুনে আমি একপ্রকার বাক্‌রুদ্ধ। এরপর একদিন আলাপও হল ভদ্রলোকের সঙ্গে। একদিন উনি আমাকে স্নেহের সুরে বললেন, ‘এবার কলকাতা গেলে দাদার সঙ্গে দেখা করো। শরীরটা ভাল নেই দাদার।’

১৯৮০ সাল। সম্ভবত মার্চ মাস। আমাকে একবার কলকাতায় আসতে হল। ভাবলাম, শিবসত্যবাবুর নির্দেশ পালন করি! শিবরাম চক্রবর্তীকে একবার চোখের দেখা দেখে যাই। যাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হই, তাঁকে একবার দেখব না! যা থাকে কপালে ভেবে একদিন হাজির হলাম তাঁর সেই ভাঙাচোরা বিখ্যাত মেসবাড়িতে। ঠনঠনে কালীবাড়ির পরেই বাঁদিকের গলি অর্থাৎ মুক্তারামবাবু স্ট্রিট। নীচে একতলায় ঢুকে দেখি অন্ধকার। অন্ধকারে কালো কালো মোষ দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে। ভূষি, খড়, বিষ্ঠা মিলিয়ে এক গন্ধময় জগৎ।

ডানদিকে ভাঙাচোরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখি দরজা আধখোলা। খালি গায়ে পাকা আমের মতো সেই বিখ্যাত চেহারার শিবরামবাবু বসে আছেন। মাথায় লম্বা পাকা চুল। চোখদু’টি তীব্র উজ্জ্বল। একবারে দরজার দিকে তাকিয়ে। যেন মনে হবে, ক্যামেরা তাক করা আছে। তাঁকে দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। বিশ্রাম নেবেন। বেলা তখন দেড়টা-দু’টো বাজে। তিনিই তো লিখেছেন, ‘মুক্তারামের তক্তারামে শুক্তারাম খেয়ে আমি শুয়ে থাকি।’ এই মেসবাড়িতে উনি কখনও তালাচাবি দিতেন না। তালাচাবির ব্যবহারই জানতেন না। সবার জন্য সর্বক্ষণ দরজা খোলা তাঁর। দরকারি ফোন নম্বর, ঠিকানা— সব দেওয়াল জুড়ে পেনসিলে লেখা। গুহাচিত্রের মতো খোদাই করা যেন! ওঁর যুক্তি ছিল, খাতা হারাতেই পারে। কিন্তু দেওয়াল তো কখনও হারাবে না। ঢুকেই কিছু বলার আগেই একটা পেল্লাই প্রণাম ঠুকে দিলাম। উনি তৎক্ষণাৎ ‘আরে… কে তুমি? এসো এসো, বসো’ বলে নির্দেশ করলেন। নির্দেশিত আসনটি ছিল সম্ভবত রংচটা একটা জীর্ণ চেয়ার। ঘাটশিলা থেকে আসছি বলতেই ভাইয়ের খবর নিলেন। আরও কয়েকজনের সংবাদ জানতে চাইলেন। আমি যেটুকু জানতাম, বললাম। তারপর উনি বললেন, ‘চিনে চিনে যখন চলেই এলে, তখন কী খাবে বলো!’ পরমুহূর্তেও বললেন, ‘অবশ্য এমনিই বলছি। এই খাটের তলায় দেখো, এঁটো থালা পড়ে আছে। আমার খাওয়া কমপ্লিট। ভাত খাবে? তাহলে বলে দিই!’ আমি মিথ্যেই বললাম, ‘খেয়ে এলাম এইমাত্র।’ আসলে উনি বিব্রত হোন, আমি চাইনি। তখন পাল্টা প্রশ্ন— ‘কোথায় খেলে?’ আমি একটা হোটেলের নাম বললাম।

আমি লক্ষ্য করলাম, খাটের ওপর বেশ কয়েকটা আনন্দবাজার পত্রিকা ছড়ানো রয়েছে। আর মাথার কাছে একটা তেলচিটে বালিশ। পায়ের দিকে কম্বল। সম্বল করে বসে আছেন সম্রাট শিবরাম। আমি দেখলাম, তিন-চারটে শিশি থেকে কী ওষুধ খেলেন। তারপর উঠে আমাকে উত্তরমুখী তাঁর আশ্চর্য বারান্দায় নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘জানো… এই বারান্দার মজাই আলাদা। এখানে দাঁড়িয়ে আমি সব ঋতুর আসা-যাওয়া টের পাই।’

আজ এতগুলো বছরের পরও আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, আমার পাশে উনি দাঁড়িয়ে আছেন। সেই উত্তরমুখী বারান্দায়। বারান্দা থেকে আবার ঘরে ঢুকে আমাকে বললেন, ‘আমি একটু শুই! কিছু মনে করো না, কেমন বাবা।’ বলে শুতেই বুঝলাম, আর বোধহয় বিরক্ত করা ঠিক হবে না। প্রণাম করে উঠে আসছি। আপনমনে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, ‘১৫০টা টাকা লাগবে। ওষুধের সব শিশি খালি।’ আমার কাছে তখন ২০-৩০ টাকার বেশি ছিল না। কান্না এসে গেল। অনেক কষ্টে বললাম, আজ আসি! আমাকে বললেন, ‘এসো… আমি একটু শুই!’

এটাই আমার প্রথম এবং শেষ শিবরাম-সাক্ষাৎকার। এই দেখা হওয়ার মাস কয়েক পরেই শিবরাম চক্রবর্তী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তখন আমি বহড়াগড়ায়। কাগজে তাঁর মৃত্যু সংবাদ পড়ে মনটা পাথরের মতো ভারি হয়ে গেল। হায়! যদি সেদিন ১৫০ টাকা অন্তত থাকত আমার কাছে…, যদি ওষুধগুলো সেদিন কিনে দিয়ে আসতে পারতাম…! এই আক্ষেপ আমার আমৃত্যু থেকে গেল।

শিবরাম-স্মৃতি: ওষুধ শেষ বলে টাকা চেয়েছিলেন, দিতে পারিনি লিখলেন কথাকার, অধ্যাপক স্বপন পাণ্ডা।

শিবরাম-স্মৃতি: ওষুধ শেষ বলে টাকা চেয়েছিলেন, দিতে পারিনি বিবিধ ডট ইন

স্বপন পাণ্ডা

গুরুদাস কলেজের বাংলার বিভাগীয় প্রধান এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *