‘দেবীর খড়্গ ধোয়া জলে সেরে যায় কঠিন অসুখ!’ ৩৫০ বছর পুরনো মহিষাদলের মাইতি পরিবারের দুর্গাপুজো হার মানায় রূপকথাকে

 

বিবিধ ডট ইন: নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আনাগোনা জানান দিচ্ছে দুর্গাপুজো আসন্ন। শহর ছাড়িয়ে কিছুটা মফস্বলে দেখা মিলছে কাশের বন। বৃষ্টির ভ্রুকুটি থাকলেও সব মিলিয়ে আপাতত পুজোর গন্ধে ম-ম করছে বাংলার আকাশ-বাতাস। অতিমারীর চোখরাঙানি কাটিয়ে উৎসবে মেতে উঠতে প্রস্তুত সক্কলে। এরই মাঝে গ্রাম বাংলার এমনই অনেক পুজো রয়েছে যার ইতিহাস জানলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

তেমনই একটি পুজো পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের কেশবপুরের মাইতি পরিবারের দুর্গাপুজো। থিম-এর যুগে আজও বনেদি পরিবারের পুজো এক আলাদা আকর্ষণ। নন্দকুমার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কেশবপুর গ্রাম। এই গ্রামেই প্রায় তিনশো বছরের বেশি দিন ধরে চলে আসছে মাইতি পরিবারের দুর্গাপুজো। এখন বংশ পরম্পরায় গ্রামেই মাইতিদের ১৪টি পরিবার রয়েছে। এই পুজোর পিছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। এখানে সন্ধি পুজো হয় পুরনো রীতি মেনেই। বাড়ির মেয়েরাই ১০৮টি প্রদীপ জ্বালান, সঙ্গে থাকে ১০৮টি পদ্ম। জন্মাষ্টমীর তিথি থেকে মায়ের কাঠামো পুজোর মধ্যদিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। আর সেই দিন থেকে এলাকার মহিলা পুরুষ সকলেই পুজোর কাজে মেতে ওঠেন। পাড়ার ৮ থেকে ৮০ সকলেই এই পুজোয় অংশগ্রহণ করে।

এখানে সন্ধিপুজোতেই হয় দেবী চামুণ্ডার আরাধনা। মানুষের বিশ্বাস এই দেবীর খড়্গ ধোয়া জল খেলে পূরণ হয় মনের বাসনা। খড়্গ ধোয়া জল খেলেই নাকি সেরে যায় দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি। আর সেকারণেই দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন সেই জলের আশায়। ছাগ বলি ঐতিহ্যতেও আজও ভাটা পড়েনি মাইতি বাড়িতে। ইতিহাস বলছে এখানে আগে হত ঘট পুজো। শোনা যায়, কিছু বছর ঘট পুজা হওয়ার পর একটি স্বপ্নাদেশ পান কুলপুরোহিত। রূপনারায়ণ নদের সঙ্গে সংযুক্ত একটি খাল গিয়েছে এখানের মন্দিরের পাশ দিয়ে। ওই নদীর পাশে একটি গাছে প্রতিমার কাঠামো আটকে রয়েছে, সেই কাঠামো তুলেই প্রতিষ্ঠার জন্য স্বপ্নাদেশ পান কুলপুরোহিত। পরদিন সকাল সকাল কুলপুরোহিত মাইতি পরিবারের বাকি সদস্যদের তাঁর স্বপ্নাদেশের কথা জানান। তারপর থেকেই ঘট পুজোর পরিবর্তে প্রতিমা পূজা শুরু হয়। সেই থেকে একইভাবে এক কাঠামোর পুজো হয়ে আসছে। শুধু পুজোর দিন নয়, বছরের অন্যান্য দিনও দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন শুধুমাত্র খড়্গ স্পর্শ করা জল খাওয়ার জন্য।

আগে এই পুজোয় প্রচলিত ছিল বলি প্রথা। শয়ে শয়ে ছাগল বলি দেওয়া হত। বর্তমানে সেই উৎসাহে ভাটা পড়লেও আজও হয় বলি। পুজো শুরু হয় মহাষষ্ঠীর দিন। তবে রীতি আর পাঁচটা পুজোর থেকে খানিক আলাদা। মহাষষ্ঠীর রাতেই ঘট উত্তোলন পর্ব চলে। মহাসপ্তমীতে রূপনারায়ণের পাশে থাকা খালে চলে নবপত্রিকা স্নান। ওই দিনই দেবীর চক্ষুদান করা হয়। সপ্তমী পুজোর সময় হয় ছাগল বলি। মহাঅষ্টমীতে হয় মহা গৌরীর পুজো। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে হয় দুটি ছাগল বলি। এর পর আরাধনা করা হয় দেবী চামুন্ডার।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: