কলকাতা বসুর কড়চা: ২

 

ছেলেরা সিগারেট ফোঁকে তাঁদের বান্ধবীর কাছে নিজেদের দায়িত্ববান পুরুষ প্রতিপন্ন করবার জন্য। মেয়েরা সিগারেট ফোঁকে তাঁদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বা অবসাদের ব্যাপারে বাইরের পৃথিবীকে অবগত করবার জন্য। আর প্রকৃত স্মোকার বা ধোঁয়াজীবীরা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বিড়িতে সুখটান দেয়, যাতে সুচারু ও সুষ্ঠুভাবে গতরাত্রের থালার ফুলকপি, মুরগি বা পাঁঠার সলিড পিস এবং গুলাবজামুনের নির্যাসবিহীন অবশেষটুকু গৃহস্থালির চেম্বারে বিসর্জিত হয়, সেই ভরসাতে। তীব্র তামাক পোড়ার গন্ধে আর ধূসর ধোঁয়ায় অতিসম্পৃক্ত হয়ে ওঠে দু’কামরার ফ্ল্যাটের যত টেনশন আর নিস্তব্ধতার কথক টয়লেট।

ভোরের কুয়াশা ভেদ করে দৈনিক পত্রিকা অতর্কিতে আছড়ে পড়ে সরকারি আবাসনের বারান্দায়। বাড়ির বর্ষীয়ান সদস্য কাঠের আলমারি থেকে বের করেন তিনটি সেভিংস অ্যাকাউন্টের পাসবই, জীবনের যত জমা খরচার হিসেব নিকেশের আন্দাজ পেতে। দূরে কোথাও কোনও ব্যাচেলর মেয়েদের ভাড়ার পি জি থেকে ভেসে আসে ‘না ফিকর, না শরম, না লিহাজ, এক বার আয়া…’।

এইভাবেই উপনাগরিক সকাল উচ্চারণ করে চরৈবেতি মন্ত্র। শর্মাটি’র কালো ছাঁকা তেলের গামলায় খাবি খায় সামোসা আর জলিবি। এসইউভি গাড়ির দরজা লক করে ইন্ডিয়া কিংস হাতে গোল গলা পেপে জিনসের টি শার্ট আর কনভার্সের শর্টস এবং হাস পাপির স্যান্ডলে ঘেরা একশো পাঁচ কেজির শরীরটার ভেতর থেকে উঠে আসে, ‘তিন প্লেট ক্লাব কাচোরি অউর তিন চায়ে’র দাবিতে চিৎকৃত আদেশ। পাড়ার শেষ মাথার ওয়ো রুমের ঘরে রাতের বিন ব্যাগ থেকে বেরোনো গত রাত্রের খুচরো পাপের সাক্ষী সাদা বীর্য ভরা নেতানো কন্ডোম এবং ডিসপোজেবল মাস্ক জড়াজড়ি করে জায়গা করে নেয় পাড়ার মোড়ের ভ্যাটে ।

উচ্চমধ্যবিত্ত বাড়ির একমাত্র ছেলে আসানসোল থেকে সল্টলেকগামী ভলভো বাস থেকে করুণাময়ী নেমে সারাদিনের মদ মাংসের প্ল্যান মাসির বাড়িতে থাকা অমেরুদণ্ডী হাফ বেকার বন্ধুকে হোয়াটস্যাপ করে কাকার দোকানে গিয়ে ডিম টোস্ট অর্ডার করে হেলথ সাপ্লিমেন্টেশন ও রেসিডুয়াল ইনকাম নিয়ে তাৎক্ষণিক বক্তৃতা দিতে দিতে ইনস্টাগ্রামে আপলোড করে গ্যারি ভি-র মোটিভেশনাল ভিডিও । লকডাউনে চাকরি হারানো ঊনত্রিশের ছোকরা মিলিয়ে নেয় নতুন চাকরির অফার লেটারের স্যালারি ব্রেকআপের অ্যানেক্সচার ।

গত সন্ধ্যার গ্লানি মুছে ফেলা পাঁচতারা হোটেলের বাসস্টপে এসে দাঁড়ায় একুশের ফিটনেস ফ্রিক ম্যাভেরিক আজাদ গুপ্ত তার হারুকা মুরাকামি অনুরাগী প্রেমিকার অপেক্ষায়। ডাইন আউট থেকে বুক করে নেয় দুপুর একটা পনেরোয় নতুন রেস্তোরাঁয় ওরিয়েন্টাল বাফে উইথ কমপ্লিমেন্টারি ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস। কোভিড নাইনটিন মোকাবিলায় টিকাকরণের জরুরি বৈঠকে বসেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

শহরতলির বাজারের চালু মিষ্টির দোকানে এসে বড় অর্ডার দেন আসন্ন কন্যাদায়মুক্তির খুশিতে ডগমগ রেলকর্মী পার্থ চক্রবর্তী। ‘সেইসব মুখোশবিহীন দিনকালে’ গোত্রের ক্যাপশন দিয়ে রেস্তোরাঁতে গল্পগুজব, গিটার বা কফিটেবল যাপন, ক্রিসমাস উদযাপন, সিনেমার মধ্যান্তর বা ক্রিকেট মাঠ ফেরত অতিচালাকি হাসি মাখা অতীতের নিজস্বী বা ‘দলস্বী’দের ভিড়ে মনখারাপ আরও জাঁকিয়ে বসে শখের থিয়েটার আর টিউশন করে নেটফ্লিক্স যাপনে রাত জাগা বছর পঁচিশের সুদীপ্ত-র। একবছরের সম্পর্ক থেকে ‘মুভ অন’ করে যাওয়া কত প্রেমিকার হৃদয়ের শুন্যতা ভরাট করে পেঁজা তুলোর বলের মত কিউট বিড়াল ছানার ছবিওয়ালা ফেসবুকে পেজ। এসব ভাবতে ভাবতে ভাবনার হিমালয় মাথা তুলে দাঁড়ায় কলকাতা বসুর মনের অন্তস্থলে।

 

লেখক: কলকাতা বসু

One thought on “কলকাতা বসুর কড়চা: ২

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: