বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

লকডাউনের জেরে অনলাইনের রমরমা বাজার। কিন্তু কীভাবে এল বর্তমানের এই জনপ্রিয় পদ্ধতি? অবদান রয়েছে এক বাঙালিরও। খোদ বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির । অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি নিয়ে এমনই তথ্য তুলে ধরলেন সনৎ মাইতি

 

কোভিড ১৯ ভাইরাসের জেরে পুরো বিশ্বজুড়ে হওয়া লকডাউনের ফলে স্কুলের পঠনপাঠন প্রায় পুরোটাই অনলাইন-নির্ভর। গোটা বিশ্বের এই পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, ই- লার্নিং পদ্ধতি ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের মতো দেশেও একদম প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্যম্ভাবী।

বিগত দু’দশকে তথ্য প্রযুক্তির জগতে, বিশেষ করে ইন্টারনেট ও সাইবার ওয়ার্ল্ড সংক্রান্ত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। যার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার জগতেও। দুনিয়া তথা ভারতবর্ষে ইন্টারনেট পরিষেবা যত সহজলভ্য হয়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে সহজ লভ্য হয়েছে মোবাইল, কম্পিউটার ও ট্যাব। যার সুফল আমরা পাচ্ছি বর্তমানের এই সঙ্কটের আবহেও।

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

কীভাবে এল অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা?

অনলাইন-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা হাল আমলে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেলেও এটি কোনওভাবেই নতুন কোনও বিষয় নয়। ১৯৬০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় অনেকগুলি কম্পিউটারকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে সৃষ্টি করেছিল এক ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের। অভিনব এই শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীরা যখন খুশি শিক্ষকদের রেকর্ড করা ভিডিও দেখতে ও শুনতে পারত।

আরও পড়ুন: অনলাইন ক্লাস করতে পাহাড় চড়ছে স্কুলছাত্র, সাহায্যের আশ্বাস সেহবাগের

পরবর্তী কালে মার্কিন মুলুকেরই স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপক কম্পিউটারের সাহায্যে শিশুদের ইংরেজি ও অংক শেখানোর উদ্দেশ্যে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালু করেন। ছোটখাটো এই পরীক্ষা নিরীক্ষার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজির অধ্যাপক বার্নার্ড লাস্কিন সেখানের কমিউনিটি কলেজে একটি ডেটা প্রসেসিংয়ের পাঠক্রম চালু করেন। সত্তরের দশকের গোড়ায় শুরু হওয়া এই কোর্স ডিসট্যান্স লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

লাস্কিনের এই দেখানো পথই পরবর্তীকালে ইন্টারনেটের সাহায্যে শিক্ষা পদ্ধতিকে তরান্বিত করতে থাকে এবং পৃথিবীতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান ব্যবস্থা জনপ্রিয় হতে থাকে। ‘ওয়েব-বেস ট্রেনিং’, ‘ইন্টারনেট-বেস ট্রেনিং’, ‘কম্পিউটার-বেস ট্রেনিং’ ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত হওয়া এই সব পদ্ধতি বিভিন্ন সংস্থার কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং সংস্থার কর্মীদের শিক্ষাদানের বিপুল ব্যয়ভার কমিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে এইসব ট্রেনিং প্রোগ্রামে ব্যবহার হত সিডি ডিস্ক এবং সঙ্গে ছাপা ম্যানুয়াল। এরপর দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। সিডিতে থাকা পুরো পাঠক্রম ইন্টারনেটে আপলোড হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে লাইভ ব্যাবস্থার উন্নতি ও সরাসরি চ্যাটের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশ্ন করার পদ্ধতি এই অনলাইন শিক্ষাব্যাবস্থাকে সম্পূর্ণ করেছে।

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় খান অ্যাকাডেমি:

ই-লার্নিং নিত্যনতুন প্রযুক্তি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ২০০৮ সাল নাগাদ আমেরিকা থেকে একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যের অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদয় হয়, যা খান অ্যাকাডেমি নামে পরিচিত এবং বর্তমানে বিশ্ববন্দিত। খান অ্যাকাডেমির লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময়ে  আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায সুনিশ্চিত করা। এখানে মূলত ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে ছাত্র ছাত্রীদের অংক, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, কম্পিউটার সায়েন্স, ইতিহাস, কলাবিদ্যা, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয় বিষয়ভিত্তিক অনুশীলন করার জন্য স্টাডি মেটেরিয়াল। বর্তমানে খান অ্যাকাডেমির টিউটোরিয়াল ইংরেজি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, বাংলাসহ ছত্রিশটিরও বেশি ভাষায় প্রকাশিত হয়।

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

গর্ব করার মত বিষয় হল, খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। নাম সালমান খান। সালমান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতি স্নাতক। খান অ্যাকাডেমির সূচনা সালমান কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই শুরু করেছিলেন। এর সূত্রপাত হয়েছিল হঠাৎ করে।

আরও পড়ুন: পাখির সুরক্ষার কথা ভেবে বন্ধ রাস্তার আলো, বেনজির সিদ্ধান্ত এই গ্রামের

২০০৪ সাল নাগাদ মামাতো বোন নাদিয়া অংকে বেশ খারাপ ফল করায় তাঁকে অংকের টিউশন দেবার পরিকল্পনা করেন সালমান। কিন্তু বাধ সাধে নাদিয়া ও সালমানের দূরত্ব। কারণ, নাদিয়া থাকত যুক্তরাজ্যের মধ্য পূর্ব শহর নিউ আরলিতে এবং সালমান কর্মসূত্রে থাকতেন প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরের বোস্টন শহরে। দূরত্বের সমস্যা সমাধানের জন্য সালমান এক উপায় বার করেন। তিনি পড়ানোর জন্য বেছে নেন ইন্টারনেটের চ্যাট ও অংক কষে দেখানোর জন্য ইয়াহুর ডুডুল নোটপ্যাড। নাদিয়া চ্যাটে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনত এবং ইয়াহুর ডুডুলের নোট প্যাডের স্ক্রিনটিকে ব্ল্যাক বোর্ডের মত দেখত। এইভাবে সালমান নাদিয়াকে অংকের টিউশান দেওয়া শুরু করেন।

পরবর্তী কালে সালমান তাঁর শিক্ষামূলক ভিডিওগুলি আপলোড করে দেন ইউটিউবে। কিছুদিনের মধ্যে তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁর ইউটিউবের ছোট্ট ছোট্ট ভিডিওগুলি নাদিয়া ছাড়াও আরও অনেকে দেখতে আরম্ভ করেছেন। সালমানের এই ইউটিউব চ্যানেলটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। এরপর ক্রমে আরও ভিডিও আপলোড করতে থাকেন এবং একসময় তাঁর ইউটিউব চ্যানেল যুক্তরাজ্যের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, কোনও এক টেকনোলজি সম্মেলনে টেকগুরু স্বয়ং বিল গেটস জানান যে, তাঁর ছেলেমেয়েরাও অঙ্ক ও অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়লে খান অ্যাকাডেমির শরণাপন্ন হন।

আরও পড়ুন: ‘লেটার ফ্রম এ স্ট্রেঞ্জার’, হাতে লেখা চিঠি পেতে পারেন আপনিও

বর্তমানে বিপুল জনপ্রিয় খান অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ও পুরোপুরিভাবেই কাজ করে চলেছেন তাঁর প্রতিষ্ঠানকে আরও উন্নত করে তোলার লক্ষ্যে। তাঁর এই শিক্ষা দরদি ধ্যানধারণা সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন দেশের বহু শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা খান অ্যাকাডেমির সাথে যুক্ত হয়েছেন।

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি লিখলেন সনৎ মাইতি

লেখকের অন্য লেখা: সান্তা হতে চান? প্রশিক্ষণ দেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়

বিল গেটস দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই বাঙালির, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা ও খান অ্যাকাডেমি

কন্ট্রিবিউটর: সনৎ মাইতি

যোগাযোগ: ফেসবুক প্রোফাইল   ফেসবুক পেজ

 

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *