রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের আগেও ইরানি মহিলারা ছিলেন ‘স্বাধীন’! ছিল সমুদ্রসৈকতে বিকিনি পরার অনুমতিও

 

বিবিধ ডট ইন: কিছুদিন আগের ঘটনা, হিজাব না পরার অপরাধে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাস্তা থেকে তেহরানে মাহশা আমিনি নামের এক তরুণীকে আটক করে সে দেশের পুলিস। তারপর থানাতেই রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয় সেই তরুণীর। অভিযোগ ওঠে পুলিসের মারে মৃত্যু হয়েছে মাহশার। এর পর থেকেই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইরান জুড়ে। মাথার চুল কেটে ফেলা থেকে প্রকাশ্য রাস্তায় হিজাব পুড়িয়ে ফেলা, নানান অভিনব পন্থায় আন্দোলনে নেমেছে সে দেশের নারী-পুরুষ। আন্দোলন দমনে পুলিসি অভিযান শুরু হয়েছে সে দেশে। পুলিস-জনতা খন্ড যুদ্ধে মৃত্যু হয়েছে একাধিক নাগরিকের।

তবে হিজাব নিয়ে নীতিপুলিসগিরি কি আগাগোড়াই ছিল ইরানে? আজ থেকে ৩০ বছর আগেও হিজাব নিয়ে এতটা বাধ্যবাধকতা ছিল না ইরানি মহিলাদের। সেই সময়কার ছবি অন্তত সেই কথাই বলছে। ১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের সাক্ষী হন ইরানের মানুষ। পহলভি রাজবংশের শাসক শাহ মহম্মদ রেজা পহলভিকে সরিয়ে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার। ইরানের রাজতন্ত্র উৎখাত করার এই আন্দোলনে মদত দিয়েছিল নানা বামপন্থী সংগঠনও। ইতিহাসের পাতায় এই বিপ্লব ইরানি বিপ্লব বা ইসলামিক বিপ্লব নামেও পরিচিত।

তবে ইরানে ক্ষমতার হাতবদলের আগে হিজাবের বদলে পাশ্চাত্যের পোশাকশৈলীর প্রতিও বিশেষ আকর্ষণ দেখা গিয়েছিল। হিজাব পরার পাশাপাশি জিন্স, মিনি স্কার্ট এবং শর্ট-হাতা টপ পরেও ইরানের রাস্তায় স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াতে পারতেন সেই দেশের মহিলারা। সমুদ্রসৈকতে বিকিনি পরেও ঘুরতে দেখা যেত সে দেশের মহিলাদের। সেই সময় ইরানের শহরের মহিলাদের বাহারি জুতো পরতেও দেখা যেত। চোখে থাকত বিভিন্ন ধরনের রোদচশমা।

বিল্পবের শুরুর দিকে সেই সময় বহু ইরানি মহিলাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। ১৯৭৭ সালের আগেই তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন ইরানি মহিলারা। ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ভর্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। গ্রামে বসবাসকারী রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরা যাতে বাড়ি থেকে দূরে পড়াশোনা করার সুযোগ পান, তা নিয়েও কর্তৃপক্ষের তরফে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ ছাড়াও ইসলামি বিল্পব শেষ হবার পরেও ইরানি মহিলাদের প্রকাশ্যে শুক্রবার পরিবার বন্ধুদের নিয়ে একত্র হওয়ার প্রবনতা ছিল। পিকনিক ছিল ইরানি সংস্কৃতিতে বেশ জনপ্রিয়। তবে বিল্পবের পর কমেছে এই প্রবনতা। কমেছে পিকনিকে গিয়ে পুরুষ এবং মহিলাদের রাজনীতি বা আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাও।

ক্ষমতায় আসার পরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি আদেশ দেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দেশের সব মহিলাকে হিজাব পরে থাকতে হবে। এর বিরুদ্ধে সেই সময়েও পথে নামতে দেখা গিয়েছিল সে দেশের মহিলাদের। ১৯৭৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবসের দিন সমাজের সর্বস্তরের হাজার হাজার মহিলা খোমেইনির এই নয়া নির্দেশের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন।

নমাজ পড়ার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম জারি করা হয়। নির্দেশ দেওয়া হয়, মহিলা এবং পুরুষদের একই ঘরে নমাজ পড়া যাবে না। মহিলাদের প্রার্থনা করার জায়গা হতে হবে পুরুষদের প্রার্থনা করার জায়গা থেকে দূরে। ধীরে ধীরে সমাজে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আরও বাড়তে থাকে। ইরানের রাজপরিবারের পতনের আগে তেহরানের বুকে দেখা যেত মহিলাদের সেলুনও। খোলা চুলে দিব্যি সেলুনে যাতায়াত করতে পারতেন তাঁরা। ইসলামিক বিপ্লবের পর সেলুন থাকলেও, সে সব সেলুনে মহিলাদের আনাগোনা অনেক কমেছে।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: