বিনোদ মেহতা হত্যা মামলা: এক অসমাপ্ত অধ্যায়!

এখনই শেয়ার করুন

কয়েক দশক আগের কথা। ১৯৮৪ সালের ১৭ মার্চ, দিনটা ছিল ভরা বসন্তের দোল পূর্ণিমা। পরদিন হোলি। কিন্তু রঙ নয়, বরং রক্তের নৃশংস এক হত্যালীলা আজও বন্দরবাসীর মননে কিম্বা স্মৃতির অতলে। হয়তো রাজনৈতিক চক্রান্তের ঘৃন্য অদৃশ্য দেওয়াললিখন যে এভাবেই হয়, তা জানা ছিল না তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জাঁদরেল আই.পি.এস অফিসার তথা পোর্ট ডিভিশনের ডেপুটি কমিশনার বিনোদ কুমার মেহতা ও তাঁর দেহরক্ষী এই রাজ্যেরই মোক্তার আলির। (বিনোদ মেহতা হত্যা মামলা: এক অসমাপ্ত অধ্যায়!)

দায়িত্ব পেয়েই কিছুদিনের মধ্যেই নিজের কাজের প্রতি সৎ বিনোদ বন্দর অঞ্চলের চোরা ব্যবসা ও ড্রাগসের চোরাচালানের ভিত্তি উপড়ে ফেলার লক্ষে ব্রতী ছিলেন। আর হয়তো প্রানের বিনিময় তারই মূল্য চোকাতে হয়েছিল তাঁকে! কী ঘটেছিল সেদিন সকালে?

ঠিক যেন সিনেমা, লোকমুখে শোনা যায়, যার চিত্রনাট্যের সারাংশে ছিল অপরাধমনস্ক কিছু রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সমাজবিরোধীদের যুগলবন্দী। যে চিত্রনাট্যে নাম জড়িয়েছিল তৎকালীন বাম মন্ত্রীসভার এক দাপুটে মন্ত্রীর-ও।

১৭ মার্চ ১৯৮৪, হোলির দিন সকালে তৎকালীন লালবাজারের অধীনস্হ ফতেপুর ভিলেজ রোডে ডাব চুরিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলার রূপ নেয়। পরদিন ভোরেই একটি অজানা সূত্র মারফত খবর পৌছায় লালবাজার ও গার্ডেনরিচের ডিসি অফিসে। খবর পেয়েই পরিস্থিতি সামলাতে ডিসি অফিস থেকে গুটিকয়েক পুলিশকর্মীকে সঙ্গে নিয়েই ডিসি বিনোদ পৌঁছে যান ভিলেজ রোডে। তখন সবে মাত্র লালবাজার থেকে ফোর্স রওনা দিয়েছে পাহাড়পুর রোর্ডের দিকে। বিনোদের দলের প্রত্যেকের কাছেই সার্ভিস রিভলভার কিম্বা থ্রি নট থ্রি রাইফেল থাকলেও তিনি ছিলেন নিরস্ত্র।

বিনোদ মেহতা হত্যা মামলা: এক অসমাপ্ত অধ্যায়!

হিংসাবিধ্বস্ত এলাকায় পুলিশের দেখা মিলতেই পুলিশকে কেন্দ্র করে তুমুল ইঁট বৃষ্টি করে হিংস্র জনতা। সশস্ত্র এবং উন্মত্ত সমাজবিরোধীদের তাড়ায় প্রাণে বাঁচাতে ডিসি বিনোদ মেহতা, তাঁর দেহরক্ষী মোক্তার, আরও একজন সহকারী কমিশনার ও ছয় জন কনেস্টেবেল স্থানীয় ধানখেতি মসজিদে আশ্রয় নেন। এমন সময় কোনও এক অজ্ঞাত কারনে ডিসি ও তাঁর দেহরক্ষী-কে মসজিদেই ফেলে পাহাড়পুর রোর্ডের দিকে চলে যান বাকি পুলিশ কর্মীরা। এলাকার নকশা সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন না ডিসি ও তাঁর দেহরক্ষী।

মসজিদ ঘিরে ফেলে হিংস্র জনতা। কোনওক্রমে ডিসি ও তাঁর দেহরক্ষী একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাতিকলের গলিতে ঢুকে পড়েন। ২২ নং. বাতিকল সেকেন্ড লেনের আবদুল লতিফ খান ছিলেন কলকাতা পুলিশে কর্মরত। প্রাণে বাঁচতে ডিসি সাহেব আশ্রয় নিলেন সেখানেই। লতিফ খান তখন বাড়ি ছিলেন না। লতিফের পুত্র হাদিস খান বিনোদ মেহতা-কে লুকিয়ে রাখেন বাড়ি সংলগ্ন শৌচাগারে। কিন্তু সেখানেও পৌঁছে যায় আক্রমণাত্মক জনতা। মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় ডেপুটি কমিশনার (পোর্ট) বিনোদ মেহতা-কে। উদ্ধার হবার পর ফরেনসিক তদন্তের রিপোর্টে তাঁর দেহে ২২ বার কোপানোর ক্ষতচিহ্ন মেলে । ১/৫৯ আটাবাগান লেনের একটি কর্দমাক্ত নর্দমা থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করে কলকাতা পুলিশ।

বিনোদ মেহতা হত্যা মামলা: এক অসমাপ্ত অধ্যায়!

অন্যদিকে বঙ্গতনয় মোক্তার আলি প্রাণের আশঙ্কায় আশ্রয় নেন ২২৮/৩ বাতিকল ফার্স্ট লেনের মহ নইমুল্লার বাড়ির দালানে। কিন্তু ঘাতক বাহিনীর হাত থেকে নিস্তার পাননি তিনিও। মোক্তার আলির সঙ্গে থাকা রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে কুপিয়ে খুন করা হয়। প্রমাণ লোপাটের জন্য তাঁর দেহ পুড়িয়ে ফেলবার সিদ্ধান্ত নেয় হিংস্র জনতা। স্থানীয় ঘুড়ির কারখানায় ঘুড়ি তৈরির কাঠির স্তুপে মোক্তারের হাত পা কাটা দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। বেশ কিছুদিন পর অনেক খুঁজে তার অর্ধদগ্ধ দেহ পুলিশ উদ্ধার করে এবং জামার পেতলের বোতাম দেখে তাঁকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়।

এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন ৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হলেও তাদের মধ্যে ১৪ জন নাবালক হওয়ায় ন্যূনতম শাস্তির বিনিময় রেহাই পায়। ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ইদ্রিশ আলি, নান্থা সালেম ও লোকমান শা ধরা পড়ে। অদ্ভুত ভাবে ইন্দ্রিশ আলির মৃত্যু হয় পুলিশ লকআপে। অভিযোগ পুলিশ পিটিয়ে মেরে ফেলে ইন্দ্রিশ-কে। ২০১৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় লোকমান শা। কিছুদিন আগে হাইকোর্টে এই মামলার শুনানিতে পুলিশ জানায় খোওয়া গিয়েছে ডিসি পোর্ট হত্যামামলার জরুরি ফাইল।

লিখলেন সায়ন্তন মণ্ডল


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *