ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস— রয় (দ্বিতীয় পর্ব)

এখনই শেয়ার করুন

শব্দবাজ‘ নাকি রেডিও জকি? একসময় কলকাতার জনপ্রিয় রেডিয়োতে আরজে ছিলেন। এখন প্রাক্তন। তবে ‘শব্দবাজি’ কিন্তু থেমে নেই। রয়। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। বিবিধ ডট ইন-এর ব্লগ বিভাগে ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস লিখলেন ‘শব্দবাজ’ রয়। (ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস — রয়)

ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস

দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

… এগুলো বৈজ্ঞানিক রীতি মেনে প্রমাণ করতে এখনও হয়ত সময় লাগবে। তবে, সুমেরিয় সভ্যতার আগেও যে মানুষের সভ্যতা ছিল, সেই হিসেবও এবার পিছোচ্ছে।

একটু আগেই যে Mesolithic আর Neolithic যুগের সময়সীমার ভাগ দেখিয়েছিলাম, সেখানে ভয়ানক ধাক্কা মেরেছে ১৯৬০-এর দশকে খুঁজে পাওয়া আর একটা নিদর্শন। সেই ১৯৬০— যখন মরক্কোতে খুঁজে পাওয়া গেল হোমো সেপিয়েন্সের হয়ত-পূর্বপুরুষকে, সেই সময়েই খুঁজে পাওয়া গেল এখনও অবধি আবিষ্কৃত পৃথিবীর প্রাচীনতম মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটাকে। প্রসঙ্গত, এই ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে হোমো সেপিয়েন্স পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনও জায়গার ‘মাটিতে’ও প্রথম পা রেখেছিল— ১৯৬৯-এর ২০শে জুলাই, চাঁদের মাটিতে।

আরও পড়ুন: ‘তপনকে রাখিস, ও অনেককিছু দেবে ইন্ডাস্ট্রিকে,’ শুটিংয়ে বলেছিলেন ঋতুদা

১৯৬৩ সালে তুরস্কের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে একটা মাটির ঢিপি আর তার আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা কিছু পাথরের টুকরো খুঁজে পান একজন মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ। তিনি অবশ্য সেই জায়গাটা দেখে সেভাবে কিছুই বুঝতে পারেননি, এবং সেই এলাকায় আর ফিরেও আসেননি। এই মার্কিন অভিযানের কথা জানতে পেরে ১৯৯৫ সাল নাগাদ জার্মান নাগরিক ক্লউস শ্মিট (Klaus Schmidt) ওই জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন। আর কয়েক মাসের মধ্যেই সেই পাহাড়ের কোলে মাটির নীচে খুঁজে পান ইংরেজি ‘টি’ চেহারার প্রচুর পাথর, যেগুলো একটা আর একটার উপর বসানো এবং বেশ বড় এলাকা জুড়ে কয়েকটা গোলাকার জায়গা, যার মধ্যে ওই টি চেহারার পাথরগুলো মাটি থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এই জায়গাটার নাম গোবেকলি টেপে (Göbekli Tepe), স্থানীয় ভাষায় যার মানে ‘ভুঁড়ি ঢিপি’ (potbelly hill)। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস অবধি ওখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে যা পাওয়া গেছে, তার নিরিখে এই জায়গাটা একটা মন্দির বলেই এখনও অবধি প্রমাণিত। যদিও আশেপাশে কোথাও মানুষের থাকার কোনও চিহ্ন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কোনও কঙ্কাল নেই, নেই কোনও বসতির প্রমাণ। মাটির একাধিক স্তর আর গভীরতা জুড়ে পাওয়া এই বিশাল মন্দির প্রাঙ্গনের মধ্যে প্রায় ২০০ টা টি-চেহারার স্তম্ভ আর ২০টা গোলাকার এলাকা পাওয়া গেছে। ক্লউস শ্মিট-এর তত্ত্বাবধানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলেও, ২০১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পরেও অনেক নতুন তথ্য পাওয়া গেছে গোবেকলি টেপে-র ব্যাপারে।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার: আমি ঠোঁটকাটা, ভবিষ্যতে আরও হতে চাই— অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়

তো… Mesolithic আর Neolithic যুগের সময়সীমাকে কেন ধাক্কা দিচ্ছে এই গোবেকলি টেপে? কারণ বিভিন্ন গভীরতায় পাওয়া স্তরের সময়কাল অনুযায়ী এই জায়গার প্রাচীনতম স্তরের আনুমানিক নির্মাণকাল আট হাজার থেকে ৯ হাজার BCE। মানে হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়োর নীচে পাওয়া আরও পুরনো সভ্যতার স্তরের চেয়েও পুরনো। সেই সময়, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় পাওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে, আধুনিক মানুষ তখন সবে গুহা থেকে বেরোচ্ছে, সাঙ্ঘাতিক ঠান্ডা একটা সময় পেরিয়ে সবুজ পৃথিবী দেখছে, তার হাতে ছোট ছোট পাথরের যন্ত্র-অস্ত্র, সে তখনও শিকারি-সংগ্রহকারী। অথচ সেই সময়ের মানুষ গোবেকলি টেপে-তে একাধিক টি-চেহারার স্তম্ভ বানাল পাথর কেটে, যার আপাতত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় স্তম্ভটা ২৩ ফুট লম্বা, ১০ ফুট চওড়া আর ওজন প্রায় ৫০ টন। পড়লেও অস্বাভাবিক লাগে, না? চমকে দেওয়ার মতো আরও তথ্য— সেই টি-চেহারার স্তম্ভগুলোর গায়ে খোদাই করা আছে বেশ কিছু পশু-পাখির অবয়ব, যার কোনও কোনওটা এতটাই উন্নত খোদাই যে, সেই সময়ের পাথরের যন্ত্র দিয়ে সেগুলো কী করে তৈরি করা হল, সেটাও একটা রহস্য! পিতল বা লোহা আবিষ্কার হতে তখনও অন্তত পাঁচ থেকে ছ’হাজার বছর দেরি, এখনও অবধি পাওয়া প্রমাণ অনুযায়ী। সুতরাং শুধুমাত্র পাথর দিয়ে খোদাই করা হয়েছে পাথরের গায়ে, আর তৈরি করা হয়েছে মূর্তি!

আরও পড়ুন: রক্ মিউজিক করি বলেই উচ্ছৃঙ্খল হব— এটা অর্থহীন: দীর্ঘ আলাপচারিতায় চন্দ্রাণী

ক্লউস শ্মিট-এর দল এখনও অবধি পুরো জায়গাটার মাত্র ৫-৭% খুঁড়েছেন, আর সেটা নাকি ইচ্ছে করেই কম কম করা হয়েছে। তাঁদের ধারণা, গোবেকলি টেপে আধুনিক মানুষের সভ্য হওয়ার ঘড়ির কাঁটাটা অনেকটাই পিছিয়ে দেবে। তাই, যত সময় যাবে, আধুনিক হবে প্রত্নবিজ্ঞান, তত বেশি নতুন তথ্য পাওয়া যাবে— এই আশায় খুবই ধীরে ধীরে কাজ করা হচ্ছে। আমি গোবেকলি টেপের ব্যাপারে জানতে পারি ২০১৬ সাল নাগাদ। আর তারপর থেকে নিয়মিত বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে চলেছি। ইউটিউবের বেশ কিছু অফিসিয়াল ভিডিও চ্যানেলে নিয়মিত নজর রাখি, যারা ওই জায়গায় গিয়ে ভিডিও তৈরি করে, নতুন তথ্য জানায়, তাদের চ্যানেলে। এই লেখাটা বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল এবং কাগজে প্রকাশিত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে লেখা। গোবেকলি টেপে নিয়ে অবশ্যই আরও লেখা উচিত। কিন্তু সেটা নিয়ে বিস্তারিত লেখা মানে অন্যদের পরিশ্রম নিজের ঘরে বসে ইন্টারনেট থেকে হুবহু টুকে দেওয়া। সেটা অন্যায়, আর তাই বেশি না লিখে আমি শুধু সূত্রটুকু ধরিয়ে দিলাম। গোবেকলি টেপে নিয়ে রোজ আন্দাজ আধ ঘণ্টা সময় দিলেও এক মাসের বেশি লেগে যাবে পৃথিবীর প্রাচীনতম মন্দিরের কথা আত্মস্থ করতে।

আরও পড়ুন: ‘বিষ কেনার টাকা নেই, প্লিজ হেল্প’, চিঠিতে লিখেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে

মোদ্দা কথা, স্কুলের ইতিহাস বইগুলোর কয়েকটা পাতা নতুন তথ্যে ভর্তি করার সময় এসেছে। নতুন শিক্ষানীতি পুরনো ইতিহাস কিছুটা বদলে দিয়ে নতুন কিছু শেখাবে নাকি, দেখা যাক!

আপডেট থাকুন। ফলো করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ:

 

আর্কাইভ: প্রেরণা   ক্লিনিক   ব্লগ   বিজ্ঞান   লাইফস্টাইল   খেলা   ভ্রমণ   অ্যাঁ!   বিনোদন

ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস — রয় (দ্বিতীয় পর্ব) লিখলেন রয় (প্রাক্তন রেডিও জকি)

ক্রমশ পিছোচ্ছে মানুষের ইতিহাস— রয় (প্রথম পর্ব) বিবিধ

রয়

(প্রাক্তন রেডিও জকি)


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *