একুশে ফেব্রুয়ারির নেপথ্যে এক দগদগে ইতিহাস!

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফলে প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দু’টি ভূখণ্ড কেবল ধর্মের ভিত্তিতে মিলিয়ে একটি নতুন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের (পাকিস্তান) জন্ম দেওয়া হয় বটে, কিন্তু এই জন্মলগ্ন থেকেই নিজের মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনও শুরু হয়। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পথকে আরও প্রশস্ত করে।

১৯৪৭-এ ভারত ভাগ এবং পাকিস্তানের গঠনের সময় থেকেই উর্দু-বাংলা বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করে। সেসময়ের মিল্লাত পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল,

মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোনও ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে বরণ করার চেয়ে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না।

আসলে চল্লিশের দশকের গোড়া থেকেই  ভাষার বিষয়টি আলোচনা বা মতবিরোধের কেন্দ্রে উঠে আসে। সেইসময় বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাংলা, উর্দু, আরবি ও ইংরেজি এই চারটি ভাষার পক্ষে-বিপক্ষে নানান মত পোষণ হতে থাকে।

আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক তাঁদের ভাষা আন্দোলন- ইতিহাস ও তাৎপর্য বিষয়ক বইয়ে লিখেছেন,

ভাষা আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। মূল আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক দশক আগে এর সূচনা হয়েছে। এর পেছনে কাজ করেছে বাঙালি মুসলমানের সেকুলার জাতীয়তাবোধ।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরপরই পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা, ডাকটিকিট, ট্রেনের টিকিট, পোস্টকার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার শুরু হয়। এই ঘোষণার ফলে ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী বা কমিশনের বাঙালি কর্মকর্তারা বাংলা ভাষার প্রয়োগের দাবিতে বিক্ষোভে সামিল হয়।

সেইসময় বুদ্ধিজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে এই ভাবে উর্দু ভাষার আধিপত্যে বাংলা ভাষা প্রাণসত্ত্বা হারাবে, বাংলাভাষী পরবর্তী প্রজন্ম অশিক্ষিত হয়ে পড়বে।এবং চাকুরীর ক্ষেত্রেও তারা সুযোগ সুবিধা থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে থাকবে।

তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষীর তুলনায় উর্দুভাষীর সংখ্যা কম ছিল, তা সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ একটি সমাবেশে আলী জিন্নাহ স্পষ্ট করে দেন যে,

উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।

 

পাকিস্তান সরকারের এই অনমনীয় মনোভাবে বাঙালিদের মনে পাকিস্তানের প্রতি অবিশ্বাস শুরু হতে থাকে। জিন্নাহ’র মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে প্রস্তাব পাল্টা প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে বিতর্ক গড়াতে থাকে।

১৯৫২ সালে উর্দুভাষাকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর এক সমাবেশে নাজিমুদ্দিন জিন্নাহ’র কথারই পুনরাবৃত্তি করেন।এবং জোরালো প্রতিবাদে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান ওঠে।

 

একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে যা ঘটেছিল:

খাজা নাজিমুদ্দিনের অবস্থান ও বক্তব্যের পর পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মনে প্রতিবাদের আগুন আরও তীব্রতর হয়। এর পরদিন থেকেই ধর্মঘট ও মিছিল শুরু হয়।ভাসানীর নেতৃত্বে বিক্ষোভে সামিল হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং নানা পেশার মানুষও।

২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়।যা প্রতিহত করার উদ্দেশ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ হয়, বহু মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।ভাষা আন্দোলনে ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিলেন সেবিষয়ে সঠিক সংখ্যা এখনও পাওয়া যায়না। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রায় দু-বছর পর ১৯৫৪ সালে ৭মে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়।যা কার্যকর হতে আরও বছর দু’য়েক সময় লাগে।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।এই দিনটি এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার সমস্ত বাঙালিদের কাছেই নিজেদের একরকম অস্তিত্বের লড়াই হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অমর একুশে!

একুশে ফেব্রুয়ারি: দগদগে ইতিহাসের দাগ লিখলেন সোহম হাটুয়া


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।