বাঙালির ঘরে ঘরে শালিমার, নেপথ্যের নায়ক কে?

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: বয়স তখন সবে মাত্র ১০, কৃষ্ণনগর কলেজের সংস্কৃত অধ্যাপক পিতা জানকীনাথ ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর রেলকর্মী দাদা বিভূতিভূষণের হাওড়া শালিমারে চলে আসতে হয়েছিল শিশু প্রকৃতিনাথকে। শিবপুর দীনবন্ধু ইন্সটিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে B.Sc পাশ করলেন।

কিন্তু অধ্যাপক পরিবারের সন্তান হয়েও চাকরি বাইরে স্বাধীন ব্যবসার অদম্য ইচ্ছায় মত্ত প্রকৃতিনাথ শিবপুর বাজারে গম-আটা পেশাইয়ের কল খুলে বসেছিলেন ১৯৩৭-৩৮ সালে। স্কুলের শিক্ষক দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায় প্রিয় ছাত্র প্রকৃতিনাথ’কে সেই সময় আটাচাকী খোলবার জন্য আড়াইশো টাকা দেন। কিন্তু এখনকার মতই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ছেলের ব্যবসা করা তৎকালীন সমাজ মেনে নেয়নি।

কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শুরু করা ‘শঙ্খ আটা কল’ দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ আর খাদ্য নিয়ন্ত্রণের সরকারি ফরমানের দরুন আটার কল বন্ধ হয়ে গেল ।এমন সময় প্রকৃতিনাথ পেলেন ক্ষুদ্র শিল্পের বিখ্যাত পরামর্শদাতা জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীর পরামর্শ। জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগীর পরামর্শে প্রকৃতিনাথ ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল তৈরির কারখানা বানালেন ১৯৪৪ সালে।

প্রথম বছর সাত-আট জন কর্মচারী নিয়ে কাজ করে অভূতপূর্ব সাফল্য পান প্রকৃতিনাথ। শালিমারের ছোট্ট কারখানাটাকে নারকেলডাঙায় সরিয়ে নিয়ে যেতে হয় একবছরের মধ্যেই।

একই বছরে চেতলার পঞ্চানন মণ্ডলের সাথে একসাথে প্রকৃতিনাথ গড়ে তুললেন শালিমার কেমিক্যাল ওয়ার্কস প্রাইভেট লিমিটেড। এখানে মুলত নারকেল তেল বানানো হত এবং এরই সাথে চলতে থাকলো ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল তৈরির কারখানা।

১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে নারকেলডাঙায় কারখানা চালানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি তাই নারকেল তেল, তিল তেল,পাউডার তৈরির ইউনিট গুলি চেতলা,সাহাপুর আর রামকেষ্টপুরে সরানো হল। এতদিন বাজার থেকে অপরিশোধিত নারকেল তেল কিনে তা পরিশোধন করে বিক্রি করতো শালিমার কোম্পানি। ১৯৫৫ সাল থেকে কোপরা/নাককেলের শাঁস কিনে তেল বিপণন শুরু হয়।

ব্যবসার অভূতপূর্ব শ্রীবৃদ্ধিতে ১৯৫৯ সালে ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুরে ২৭ বিঘা জায়গা কিনে তৈরি করা হয় শালিমার কেমিক্যালস’এর প্রকান্ড কারখানা যা শুরু হয় ১৯৬০ সালে। গুঁড়ো মশলা থেকে প্রসাধনী, এই মহামিলনের ক্ষনে সেই চিরনতুন এর টানে প্রায় ৭৫ বছর ধরে বঙ্গজীবনের অঙ্গ শালিমার।

ঠিক তেমনই বোধহয় শালিমারের নারকেল তেল ব্যবহার করেননি, এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে দুষ্কর। একটা বাঙালি ব্র্যান্ড ৭৫বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলা তথা ভারত ছাড়িয়ে বিদেশেও আজও সমানভাবে সমাদৃত৷ ১৯৮৮ সালের পয়লা মার্চ প্রকৃতিনাথ ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরীদের হাত ধরে শালিমারের পথচলা এখনো সাবলীল।

 

লিখলেন সায়ন্তন মণ্ডল


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *