লাইফস্টাইল

ছেলের নাম ‘ইনকিলাব’ রাখতে চেয়েছিলেন মা-বাবা, শেষমেশ বদলে হল ‘অমিতাভ’

বিবিধ ডট ইন: আজ ৮০ বছরে পা দিলেন বলিউডের শাহেনশাহ। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী অভিনেতা। তাঁর প্রভাব এতটাই যে বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক ফ্রাসোঁয়া ত্রুঁফো তাঁকে ‘ওয়ান ম্যান ইন্ডাস্ট্রি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয় কেরিয়ারে পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ড, ৪টি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ১২টি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সহ অসংখ্য পুরস্কার। ২০০০ সালে ফিল্মফেয়ার তাঁকে ‘সুপারস্টার অফ দ্য মিলেনিয়াম’ ঘোষণা করে। ১৯৯৯ সালে বিবিসি-র একটি পোলে মার্লন ব্র‍্যান্ডো, চার্লি চ্যাপলিন প্রমুখদের হারিয়ে ‘গ্রেটেস্ট স্টার অফ স্টেজ এন্ড স্ক্রিন’ নির্বাচিত হন। ভারত সরকারের তরফে পেয়েছেন পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ। এছাড়াও পেয়েছেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ঁ ডি’অনর।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়কালে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে উদবুদ্ধ হয়ে হিন্দি কবি হরিবংশ রাই বচ্চন তাঁর সদ্য জন্মানো ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ইনকিলাব। অর্থাৎ বিপ্লব। যদিও এই নাম রাখার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে ছিল তাঁর মা তেজি বচ্চনের। কিন্তু জন্মের কয়েকমাস পরে তাঁর বাবার বন্ধু আর এক হিন্দি কবি সুমিত্রানন্দ পন্থের কথামতো তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় অমিতাভ।

আর পদবি শ্রীবাস্তব হলেও, তাঁর বাবা প্রকাশিত সব কাজেই পদবি হিসেবে ‘বচ্চন’ ব্যবহার করতেন। তাই বাবার অনুকরণে তিনিও অমিতাভ শ্রীবাস্তব থেকে হয়ে ওঠেন অমিতাভ বচ্চন।

কলকাতার সাথে তাঁর যোগাযোগ বহু পুরোনো। শুধু বাঙালি মেয়ে জয়া ভাদুড়ির সাথে বিয়ে করে কলকাতার জামাই হওয়াই তাঁর কলকাতার সাথে একমাত্র সম্পর্ক নয়। তার অনেক আগে, এমনকি বলিউডে পা দেওয়ারও আগে থেকে কলকাতার সাথে সংযোগ রয়েছে বিগ বি-র। ১৯৬২ সালে কলেজ পাশ করে জীবনের প্রথম চাকরী করতে কলকাতায় এসেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। প্রথমে শ’ ওয়ালেস আর পরে বার্ড এন্ড কোম্পানিতে চাকরী করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি কলকাতায় থিয়েটারও করতেন। নাটক দেখানোর জন্য একটি ট্যাবলো করে ঘুরে  বেরিয়েছেন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়।

অমিতাভ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষক হওয়ার জন্য অডিশন দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। আজ তিনি যে ব্যারিটোনের জন্য বিখ্যাত, সেই ব্যারিটোনের জন্যই সেদিন তাঁকে প্রত্যাখান করা হয়েছিল। তবে মৃণাল সেন তাঁর গলার স্বর সম্পর্কে দূরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। অমিতাভের বড়ো পর্দায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করার আগেই মৃণাল সেন তাঁর জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘ভুবন সোম’-এ সূত্রধর হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন সিনিয়র বচ্চনের গলার স্বর।

একরকম জেদ থেকেই ১৯৬৮ সালে মুম্বই চলে যান। না আছে কোনও থাকার জায়গা, না হাতে আছে কোনও কাজ। মেরিন ড্রাইভের বেঞ্চে শুয়ে কাটিয়েছেন রাতের পর রাত। এই সময়টায় মা তেজি বচ্চনের অসীম সমর্থন পেয়েছিলেন। তাঁর মায়েরও অভিনয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি যা করতে পারেননি, চেয়েছিলেন যেন তাঁর ছেলে তা সফলভাবে করতে পারে।

বলিউডে অমিতাভ প্রথম কাজ করেন ১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্থানি’-তে। এই ছবির জন্য তিনি সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরষ্কারও পেয়েছিলেন। তবে এরপরও কয়েকটি ছোটোখাটো চরিত্র ছাড়া সেভাবে অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছিলেন না। মাঝে ১৯৭১ সালে ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্নার সাথে একটু বড়ো চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে ওই একই বছরে মুক্তি পাওয়া ‘পরওয়ানা’-তে প্রথম সোলো হিরো হিসেবে কাজ করে প্রশংসিত হন।

যখন বলিউডে পদার্পণ করছেন, ততোদিনে রাজেশ খান্না ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার। যে চরিত্র অন্য অভিনেতারা ফিরিয়ে দিতেন, সেইসব চরিত্রে কাজ করতেন নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদে। এমনিতেই অত্যধিক লম্বা আর ভারী গলার জন্য বাজার চলতি রোম্যান্টিক, সংবেদনশীল নায়কের ইমেজে তিনি বেমানান ছিলেন। ১৯৭৩ সালে ‘জঞ্জির’ ছবির পর বলিউডে গড়ে ওঠা নায়কের চিরাচরিত ইমেজ ভেঙ্গে দেন অমিতাভ। একই সাথে পালটে ফেলেন হিন্দি সিনেমার জগতে নিজের ভবিষ্যতও। সাতের দশকেই একক ক্যারিশমায় তৈরি করেন নায়কের নতুন অ্যাংরি ইয়ং ম্যান ইমেজ। একের পর এক হিট হয় ‘নমক হারাম’, ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’-এর মতো সিনেমা। এইসময়ে বলিউডের রাজপাট একপ্রকার তাঁর হাতেই উঠে গিয়েছিল।

কিন্তু ১৯৮৩ সালে ‘কুলি’-র শ্যুটিং চলাকালীন ঘটে গেলো একটা দুর্ঘটনা। ততোদিনে তাঁর ঝুলিতে আছে অনেক হিট সিনেমা। অমিতাভ বচ্চন তখন ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার। কুলিতে একটি ফাইট সিকোয়েন্স শ্যুট করতে গিয়ে তলপেটে মারাত্মক চোট পেলেন। কয়েকমাস গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। সেই ফাইট সিকোয়েন্সে তাঁর উলটো দিকে থাকা পুনিত ইসর তখন গোটা দেশের চোখে ভিলেন। অমিতাভের নামে ঘরে ঘরে চলছে পূজার্চনা। অবশেষে রূপোলি পর্দার নায়ক সুস্থ হয়ে ফিরলেন নায়কোচিত ভঙ্গিতেই।

‘কুলি’ বক্স অফিসে নজিরবিহীন সাফল্য পেলো। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে কিছুদিনের জন্য সিনেমা থেকে বিরতি নিলেন। এই সময়েই বন্ধু রাজীব গান্ধীর কথায় রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইলাহাবাদ কেন্দ্র থেকে জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হলেন এবং রেকর্ড ব্যবধানে জিতে গেলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অমিতাভ ও তাঁর ভাই অজিতাভের নামে দুর্নীতির অভিযোগ আনলেন কংগ্রেসেরই ভি পি সিং। বোফর্স কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়ে গেলো বচ্চন ভাইদের। অপমান এবং খানিকটা অভিমানেও সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন মাত্র তিনবছরের মাথায়। সেসময়ে অমিতাভের জনপ্রিয়তা এতোটাই ছিল যে তাঁর ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে আজ অবধি কোনওদিন ইলাহাবাদ কেন্দ্রে কংগ্রেস জিততে পারেনি।

তবে কারোর জীবনের গাড়িই একতরফা সুখের মসৃণ সরণী ধরে দৌড়ায় না। ওঠানামা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অমিতাভ বচ্চনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘অগ্নিপথ’ বা ‘শাহেনশাহ’-তে অমিতাভের পরিচিত ক্যারিস্মা দেখা গেলেও, আশির দশকের শেষের দিক থেকে বেশ কিছু ফ্লপ সিনেমা তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ অনেকটা নামিয়ে দিচ্ছিলো। বয়স বাড়ার কারণে নায়কের আসন থেকে তিনি সরে যাচ্ছেন, তা বুঝতে পেরে এবিসিএল নামে সংস্থা তৈরি করেন বলিউডের শাহেনশাহ। তাঁর জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় তাঁরই তৈরি করা কোম্পানি এবিসিএল বা অমিতাভ বচ্চন করপোরেশন লিমিটেড। একটা সময়ে তিনি দেউলিয়াও হয়ে যান।

সিরিয়াল থেকে সিনেমা, রিয়েলিটি শো বা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সবকিছুই আয়োজন করতো এই সংস্থা। প্রথমদিকে সাফল্য আসছিলো এবিসিএল-এর। এই সময়ে ব্যাঙ্গালোরে ১৯৯৬-এর মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা আয়োজন করার স্বপ্ন দেখেন মিস্টার বচ্চন। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা থেকে তেমন কোনও লাভ তোলা তো দূর, উলটে বিপুল দেনায় ডুবে যায় তাঁর সংস্থা। ছবি প্রযোজনার ক্ষেত্রেও এই কোম্পানী শোচনীয়ভাবে ধাক্কা খায়। তাদের প্রযোজিত অধিকাংশ ছবিই বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালে কোম্পানি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। দেনা মেটাতে বচ্চন পরিবারের একের পর এক সম্পত্তি নিলামে উঠতে থাকে। পরিবার নিয়ে পথে বসার মতো অবস্থায় এসে পড়েন অমিতাভ।

জীবনের এই কঠিন সময়ে প্রথমবার তিনি যশ চোপড়াকে ফোন করে কাজ চান। দুঃসময়ে বন্ধুকে খালি হাতে ফেরাননি যশ। শাহরুখ খানের সহ অভিনেতা হিসেবে জুটি বেঁধে শুরু হয় ‘মহব্বতে’। এই সিনেমা বহুদিন পর আবার সাফল্যের আস্বাদন দিলো অমিতাভ-কে। নায়কের আসন থেকে সরে গিয়ে সিনেমায় নিজের নতুন জায়গা খুঁজে পেলেন। একই সাথে নিজের অভিনয়ের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছিলেন তিনি। প্রায় এই সময়েই দায়িত্ব পান ‘কৌন বনেগা করোরপতি’ সঞ্চালনার। এই শো-ই তাঁর হারানো গৌরব আবার ফিরিয়ে আনে। কেবিসি দেশের প্রতিটা ঘরে আবার পৌঁছে দিলো সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চনকে।

সিনেমার জগতে দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি মিঃ বচ্চনকে। একের পর এক উপহার দিয়ে গেছেন ‘কভি খুশি কভি গম’, ‘খাকি’, ‘ব্ল্যাক’, ‘সরকার’, ‘চিনি কম’, ‘ভুতনাথ’, ‘আলাদিন’, ‘পা’, ‘সত্যাগ্রহ’, ‘শামিতাভ’, ‘পিকু’, ‘ওয়াজির’, ‘পিংক’, ‘বদলা’, ‘গুলাবো সিতাবো’-এর মতো হিট ছবি। প্রতিটি ছবিতে নিজেকে পরিবর্তন করছেন, নতুন নতুন চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন, এখনও, এই বয়সেও। হয়তো আর নায়কের আসন তাঁর জন্য রাখা হয় না। কিন্তু যে চরিত্রই তাঁকে দেওয়া হয়, তাকেই তিনি নায়কোচিত করে তোলেন তাঁর অমিত আভায়।

আজ তাঁর সমসাময়িক তারকারা হয়তো কেউ কেউ টিমটিম করে জ্বলে আছেন, তাঁর হাঁটুর বয়সী অভিনেতারা বক্স অফিসে আলোড়ন তুলছেন, আর পাঁচ দশকের বেশি সময় কাটিয়ে ফেলা অমিতাভ বচ্চন আজও বহু নক্ষত্রের মাঝে ধ্রুবতারা হয়ে স্বমহিমায় জ্বলজ্বল করছেন। খারাপ সময়ে তলিয়ে না গিয়ে, যারা ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা আর অনুশাসন’-কে হাতিয়ার করে আবার ভালো সময় ফিরিয়ে আনতে পারেন তারাই বোধহয় ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে থেকে যান।

লিখেছেন সৌম্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়

Leave a Comment
Share

Recent Posts

অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে ফিরছেন যুবরাজ?

  বিবিধ ডট ইন: অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছেন যুবরাজ সিংহ? সম্প্রতি যুবরাজের…

November 2, 2021

NEET UG: রাজ্যে প্রথম, সর্বভারতীয় স্তরে ১৯ নম্বরে সোনামুখীর সৌম্যদীপ

  বিবিধ ডট ইন: সদ্য প্রকাশিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট নিট এর প্রকাশিত ফলাফলে…

November 2, 2021

মোদীর আমন্ত্রণে সাড়া, ভারতে আসছেন বরিস জনসন

  বিবিধ ডট ইন: ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আহবান জানালেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস…

November 2, 2021

কাবুল সেনা হাসপাতালে বিস্ফোরণ, মৃত ১৯

  বিবিধ ডট ইন: ফের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল আফগানিস্তান। এবার রক্তাক্ত হলেন হাসপাতালে আসা রোগী…

November 2, 2021

হিমঘর থেকে ৭ টাকায় বিকোলেও খোলা বাজারে ২০ টাকা ছুঁল আলুর দাম

  বিবিধ ডট ইন: হিমঘর থেকে কেনা ৭ টাকার আলু খোলা বাজারে বিকোচ্ছে ২০ থেকে…

November 2, 2021

যাত্রী বিক্ষোভের জেরে বাড়ছে না লোকাল ট্রেনের ভাড়া

  বিবিধ ডট ইন: কোভিড আবহে প্রায় ৫ পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর গত রবিবার…

November 2, 2021

This website uses cookies.