ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (সপ্তম পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

এখনই শেয়ার করুন

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

দীপান্বিতা বিশ্বাস

ষষ্ঠ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের রোদ এসে ফিরোজের চোখে লাগে। জানলার পাশে নিমগাছ। নিমগাছের সবুজ আর হলুদ পাতার আড়ালে রোদ্দুর চিকচিক করছে। মৃদুমন্দ বাতাস বয়। বাতাসের তালে তালে কয়েকটা পাখি ডেকে ওঠে। শিমুল গাছের মাথায় এক ঝাঁক কাক কা কা করে ডেকে চলেছে। ফিরোজ সেদিকে একমনে তাকিয়ে থাকে।
এমন বিকেলগুলোতে আমি আর ফিরোজ নদীর ধারে গিয়ে বসে কত গল্প করি। যেদিন স্কুল থাকে না সেদিন তো দুপুর হলেই ছুট লাগাই। ঠাম্মা অবশ্য খুব বকেন।

ঠাম্মাকে তখন বলি, ‘তুমি কি দিদিঠাকুরের কথা শুনতে? সেই তো বনেবাদারে ঘুরে বেড়াতে।’ ঠাম্মার মাকে আমি দিদিঠাকুর বলে ডাকি।
ঠাম্মা বলতেন, ‘সেই সুযোগ কি ছ্যালো দিদিভাই! তোর মত বয়সে তো আমার ভরা সংসার। নাইতে নাইতেই বেলা চারটে বেজে যাইত। যাহ পালা ঘুরে আয়গা…।’ বুঝতাম ঠাম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
আমি ছুটতাম ফিরোজ দের বাড়ি। ওকে সঙ্গে নিয়ে আগে তেঁতুল তলায় তারপর নদীর ধারে গিয়ে বসতাম।
সূর্য ডুবত ধীরে। সূর্যাস্তের আগে পশ্চিম দিকে মেঘ এসে জমা হতো কখনও সাদা কখনো ধূসর সেই মেঘের মধ্যে ডুবে যেত রবিমামা। ফিরোজ মাঝেমাঝে বলত, ‘আলো, জানিস আমার না বড় সাধ সূর্যের মত হব।’ আমি হেসে বলতাম ‘সূর্য তো ছেলে। কী করে ওর মত হবি তুই? পরের জন্মে ছেলে হলে সূর্যের মত হোস।’ ফিরোজ চুপ করে থাকত।
ফিরোজকে ডাকতে গেছি এমনই এক বিকেলে। দেখি জানলায় বসে নিম গাছের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
বললাম চল চল ঘুরে আসি। ফিরোজ বলল, ‘আজকে আর যাব না রে আলো। আয়, আমার পাশে বস। দু’টো গল্প করি।’
আমি দেখলাম ওর চোখ মুখ কেমন যেন শুকিয়ে গেছে।

হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওরা আমাকে আর পড়তে দিল না রে আলো! তুই কিন্তু মন দিয়ে পড়বি। মানুষের মত মানুষ হবি। সূর্যের মত হবি।’
আমি বললাম, এসব কী বলছিস ফিরোজ? ফিরোজ আমাকে বলল, ‘ফিরোজ নই রে, বল ফিরোজা।’
দরজার কাছে দেখলাম ফিরোজের মা এসে দাঁড়িয়েছে।
আমাকে বলল, ‘অ আলো, আইছ? কাল ফিরোজার সাদি। আজকে ওর বাবা আর চাচা মিলে হঠাৎ ঠিক করল। বিরাট ভাল ছেলে। বড় ব্যবসা। কাল কিন্তু তুমি অবশ্যই আসবা।’
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, আচ্ছা কাকিমা।
ফিরোজের মা চলে যেতেই বললাম, এসব কী বলছে রে কাকিমা? তোর সত্যি বিয়ে?
ফিরোজ বলল, ‘আম্মি যা বলছে সত্যি বলছে। যা বাড়ি যা.. কাল আসিস সময় করে।’
হঠাৎ যেন ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল। বাতাস থেমে গেল। আমি নদী ভুলে গেলাম। বুকের মধ্যে কেমন ঝরা পাতারা খসখস করছে!
শূন্য মাথা নিয়ে বাড়ি পৌঁছলাম। ঠাম্মা আর মাকে গিয়ে বললাম, ‘জানো, কাল ফিরোজার বিয়ে।’ ঠাম্মা বলল, ‘ওগো মধ্যি এরম কম বয়সে বিয়া হয়।’ মা বলল, ‘এইটুকু মেয়ের বিয়ে? তবে ওর পড়াশোনা?’

পরদিন ফিরোজের বিয়ে হয়ে গেল। ঠিক করলাম, আজ থেকে ফিরোজাকে আর ফিরোজ বলে ডাকব না। লাল বেনারসি মাথায় লাল চেলি। কপালে লাল টিপ হাতে লাল চুরি। সবাই বলছিল ফিরোজাকে জান্নাতের পরীর মত লাগছে। আমার যেন কেমন দমবন্ধ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এই তো এই সূর্যটা। যেন বিকেল হয়ে এসেছে নদীর ধারে পাখির কোলাহল। ফিরোজা যেন সূর্য হয়ে উঠেছে। হঠাৎ যেন আকাশ জুড়ে কালো মেঘেরা ছুটে ছুটে আসছে। ফিরোজার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। সে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের বুকে। ক্রমেই কালো মেঘের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকল।
সন্ধে হবার আগে ফিরোজাকে নিয়ে ওর বরের দল বেরিয়ে গেল। সেদিন খুব ঝড় উঠেছিল। এ গাছ হেলে পড়ে ও গাছের উপর, কাঁচা বাড়ির তিন উড়ে এদিক সেদিক পড়ল। কিছুক্ষণ পরে ঝড় থেমেও গেল। সেই ঝড়ে হারিয়ে গেল আমার বাল্যকালের সখী। তারপর আমি আর ফিরোজকে খুঁজে পাইনি।

 

(চলবে…)

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

পঞ্চম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

ষষ্ঠ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

 

দীপান্বিতা বিশ্বাস

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

যোগাযোগ: ফেসবুক


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *