ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (ষষ্ঠ পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

দীপান্বিতা বিশ্বাস

পঞ্চম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

নিধু মিত্তিরের বাড়ির সামনে বড় হট্টগোল। বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার রোল ভেসে আসছে। আমি দাদুর সঙ্গে চৌমাথার হাটে যাচ্ছিলাম। এখানে প্রতি বুধ আর শনিবার হাট বসে। হাট এলেই কদম আলি বাড়ির সবার জন্য গরম গরম নিমকি আর খেদাইদের দোকান থেকে গরম রসে ভরা জিলপি নিয়ে আসতো। তবে সেদিন অন্যরকম ছিল। তখনও শরৎ শেষ হয়নি। ক’দিন বাদেই দুগ্গাপুজো। চারিদিকে কেমন পুজোপুজো গন্ধ। আকাশে একপাল সাদা সাদা মেঘ এধার থেকে ওই ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাদুকে বললাম , দাদু হাটে নিয়ে যাবে? দাদু বললেন যাবি? চল তবে। (ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (ষষ্ঠ পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস)

আরও পড়ুন: জেনারেশন গ্যাপ: একটা সন্ধিক্ষণে বেড়ে ওঠার গল্প

হাটে যেতে গিয়েই থামতে হল। দাদুকে সবাই প্রণাম জানালো। বলল বিশ্বাস মশাই নিধু গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়সে।
দাদু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন নাতনি না থাকলে যেতুম বাড়ির ভেতরে। এখন যাই বুঝলে পরে একবার দেখা করে যাব। ঘরের ভেতর থেকে ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে নিধু মিত্তিরের বাড়ি ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। গাছগুলো কেমন শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড় আসার আগে যেমন গুমোট হয়ে থাকে তেমন সবকিছু যেন শান্ত হয়ে আছে। আমার ভয় হল। দাদুর হাত শক্ত করে ধরে রইলাম।

ক্রমেই দুপুর শেষ হয়ে এল, রোদের তেজ কমে এল। নদীর চর শুকিয়ে এল।
আমাদের চৈতি নদীর ধারে তখন হোগলা বন। তারমধ্যে কত ফড়িং খেলা করত। ঠাকুমার সঙ্গে একবার গেছিলাম। আমি ফড়িং খুঁজতে গেছিলাম বলে কত বকা ঠাকুমার। আমিও তেমন যতক্ষণ না দাদুকে বলতে পারছি ততক্ষণ কান্না করে গেছি। বাড়ি ফিরে দাদুকে বলে তবেই আমার শান্তি। দাদু কোলে নিয়ে বলতেন আমার দিদিভাই বুঝি রাগ করেছে। আমি বলতাম না একটুও করিনি। আমি তো ঢং করছিলাম। দরজার ধারে দাঁড়িয়ে কদম আলি হাসত। দাদু কদম আলিকে ডেকে বলতো। কদম যা তো আলোকে ছাদে ঘুরিয়ে নিয়ে আন। কদম আলির চোখে মুখে তখন ক্লান্তির ছাপ। দেশ ছেড়ে ছাড়ার নানান গল্প তার মুখের রেখা থেকে ছিটকে বের হয়ে আসতে চাইছে। আমার বড় মায়া হতো কদম আলিকে দেখে। মুখে হাত বুলিয়ে দিতে যেতাম। কদমআলী বলতো ‘এইসব কি করো ছোটমা, এরম করবানা কেমন। আমরা হলাম ছোটমানুষ! আমাগে মুখে হাত দিতি নাই’। আমি কিছু না বুঝে শুধু তাকিয়ে থাকতাম ওঁর দিকে। আমার কান্না পেত খুব রাগ হতো।

আরও পড়ুন: পরিযায়ী শ্রমিক থেকে পরীক্ষার্থী, চেনা স্ক্রিপ্টে শুধু চরিত্রবদল!

এখন যখন সবটা মেনে নিতে নিতে নদী শুকিয়ে গেছে। কান্নাগুলো মরে গেছে। তখন বুঝি এবার বুঝি সত্যি সত্যি বড় হয়ে গেলাম। কতদিন ঘরে ফেরা হয়না! সনেকপুরের পদ্ম বিল দেখা হয়না। চৈতী নদী শুকিয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে মস্তবড় ব্রিজ। ব্রিজের উপর দিয়ে রোজ কত গাড়ি যায়। মানুষ আর এখন দাওয়ায় বসে দুটো গল্প বলেনা। পুতুল বাড়ি ভেঙে গেছে। নাটকের মহড়া হয়না। ঠাকুমা আর বান্ধবীর সঙ্গে বসে ভরদুপুরে পান খায় না।
এখন বুঝি সত্যিই বড় হয়ে গেছি।

(চলবে…)

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

পঞ্চম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

আর্কাইভ: প্রেরণা   ক্লিনিক   ব্লগ   বিজ্ঞান   লাইফস্টাইল   খেলা   ভ্রমণ   অ্যাঁ!   এন-কাউন্টার

আপডেট থাকুন। ফলো করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ:

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (ষষ্ঠ পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

দীপান্বিতা বিশ্বাস

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

যোগাযোগ: ফেসবুক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *