ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (প্রথম পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

এখনই শেয়ার করুন

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

দীপান্বিতা বিশ্বাস

 

ধারাবাহিক — জলতরঙ্গ : কুশ ঘাসের উপর শ্যামসুন্দরের দল এসে বসে একটা সভা বানিয়েছে। একজন বলছে, ‘এ খোলা আকাশ আমার।’ আর একজন বলছে, ‘ধুত্তোর! আকাশ আবার কারও একার হয় নাকি?’ এ আকাশ হল নক্ষত্রের। গুঁড়ো গুঁড়ো মেঘ ভেসে বেড়ায় সেখানে। হাওয়া নেচে নেচে এদিক থেকে ওদিকে ছুটে যায়।

ওদের দলের আর একজন দেখলাম, নীরবে হেমন্তের নগ্ন দুপুরকে আরও নগ্ন হতে দেখছে। চোখের কোণায় খানিক আবেগ মেশানো। আমি দূর থেকে এসব দেখেছিলাম। ওদের সভা চলল আরও বেশ খানিকক্ষণ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। শিরশির করে হাওয়া বইছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা বাবলা গাছ দুলে উঠল।

‘হিন্দোলি, হিন্দোলি ওঠে নীল সিন্ধু

গগনে উঠিল তার কোনও পূর্ণ ইন্দু’

ভেসে ভেসে আসছে হিন্দোল রাগ। আবছায়া হয়ে রবি কুশ ঘাসের আড়ালে উঁকি মারছে। বলেছে যে, ধরিত্রী আমার যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবার বিদায় দাও।

‘বিদায়’ শুনতেই আমার কদম আলির কথা মনে পড়ল। যার মাথায় অর্ধেক চুল ছিল। বাকি অর্ধেক একেবারে চকচকে পেতলের কলসির মতন। গালে কাঁচা পাকা অনেক দাড়ি। দাড়িগুলো ঝুলে এসে থুতনি ছুঁত। আমি একবার ভীষণ কৌতূহল নিয়ে দাড়ি ধরে টানতেই কদম আলি ঈষৎ হেসে বলত, ‘ওমন করে দাড়ি ধরি টানতি নাই বেটি। উহাতে গলার কাছে টান লাগে বড়। আর টানবা না কখনও কেমন!’ আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাতাম।

আরও পড়ুন: সমকাল, ছাদ… এবং আমি: তমাল পাল

আমাদের উঠোনের বাঁদিকে কদম আলির ঘর ছিল। যে যখন যা বলত, কদমআলী তা-ই করত। আমি মাঝেমধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে কদম আলির দাড়ি দেখতাম। যেন এক গোছা কাশফুলের মধ্যে অন্ধকার নেমেছে। যেন অন্ধকার কাটিয়ে ভোর হলেই মহালয়া। রেডিও বাজবে, চারিদিকে আগমনী আগমনী গন্ধ।

একদিন চুপিচুপি কদম আলির ঘরে ঢুকে দেখি, সেখানে একটা চৌকি আর একটা বাক্স ছাড়া তেমন কিছু নেই বিশেষ। মাটির কলসিখানায় ছোট একটা ফুটো। তা দিয়ে জল চুঁইয়েচুঁইয়ে গোটা ঘর ভিজিয়ে দিয়েছে। সোঁদা মাটির গন্ধ আর অনেক দিনের না কাচা বিছানা থেকে আসা পুরনো তামাকের গন্ধ এসে আমার নাকে লাগল। গা গুলিয়ে উঠল খানিক। সামলে নিয়ে বাক্সটার কাছে গেলাম।

মনে হল, এ বাক্স খুললে সমস্ত দেশের পরীরা বেরিয়ে আসবে হুরহুর করে। আমি তাদের নিয়ে রুপকথার রাজ্য থেকে জাদুর কাঠি নিয়ে আসব। পৃথিবীর সবার দুঃখ ঘুচিয়ে দেব।

কাঁপাকাঁপা হাতে বাক্স খুললাম। লাল শাড়ি, নীল লাল মেশানো কাঁচের চুরি আর একটা কাঁচা হাতে লেখা চিঠি বেরোল। দাদু বলতেন, অন্যের চিঠি পড়তে নেই। রেখে দিলাম সব আগের মত। ঘুমিয়ে থাক ওরা।

বাতাস ভারি হয়ে এল। এলো চুলে ছোট ছোট মেয়েগুলো এসেছে শিউলি কুড়োতে।

ওরা কুড়োয়। আমি বলি, ‘এই ওদিকে যা! হ্যাঁ হ্যাঁ… ওদিকে। যা, দেখ, আরও অনেক ফুল পড়ে আছে।’

ওরা দৌঁড়ায়। কে কার আগে যেতে পারবে। কারও কারও সাজি থেকে শিউলি এসে ভিজে ঘাসের ওপর পড়ে।

আরও পড়ুন: অস্তিত্বে অলৌকিকতা কিংবা নিছক ভ্রম: অঙ্কনা বন্দ্যোপাধ্যায়

কদম আলি বাজারে গেছে। ব্যাগ ভর্তি আলু, পটল, বেগুন ভরে আনবে। ফিরে ফিরিস্তি মিলিয়ে রান্না চাপাবে। তার শরীর বেয়ে টপটপ করে ঘাম এসে পায়ে পড়বে। ডাক পড়বে, ‘কদম তামাক দিয়ে যা!’ কদম আলি তৎক্ষণাৎ ছুটবে।

কেউ বলবে, ‘কদম আলি আমার জন্য ছানার ডালনা হয়েছে তো?’

ও উত্তর দেবে, ‘আজ্ঞে সে অনেক্ষণ।’

তারপর প্রশ্নবাণের মত ক্ষিপ্র বেগে ধেয়ে আসবে, ‘অনেক্ষণ মানে! জানিস না তুই, আমি গরম খাবার খাই।’ কদম আলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে।

ঠাকুমা দোতলার বারান্দা থেকে চিৎকার করবে, ‘হতচ্ছাড়া কদম, তোরে না কতবার কইছি, আমার ঠাকুর ঘরে আশেপাশে যেন না দেহি তোরে। তুই আবার আইছোস এই দিকে!’

কদম আলি উত্তর দেবে, ‘আজ্ঞে কত্তামা। কসম কচ্ছি, আমি যাই নাই ওইদিকি।’

ঠাকুমা রাগে কিছু একটা বিড়বিড় করতে করতে ঠাকুরঘরে ঢুকে যাবে। কদম আলি আবার ছুটবে রান্না ঘরে।

আরও পড়ুন:  সরল দিনের গদ্য: সৈকত বালা

রান্নাঘরের চালে পাখিরা এসে বসে। কদম আলি মাঝেমধ্যে চাল, বাটিতে করে জল খেতে দেয় ওদের। আমি কতবার দেখেছি ওদের সঙ্গে কদম আলি কত্ত কত্ত গল্প করে। আর চোখ মোছে। আমার সেসব শোনার সুযোগ হয়নি। লাল শাড়ি, লাল-নীল চুড়ির কথা সে গল্পে থাকে? থাকে নিশ্চয়ই! আবার নাও থাকতে পারে।

কিছু গল্প আমরা বলি না। বলতে চাই না। তাদের বয়ে নিয়ে বেড়াই যতদিন দেহে প্রাণ আছে।

তারপর প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে গেলে, সে গল্প মাটিতে মেশে।

মাটি থেকে জলে। জলের গভীরে যেতে যেতে তলিয়ে যাওয়া কোনও প্রাসাদের দেওয়ালে ধাক্কা খায়।

তারপর সেখানেই সংসার গড়ে নেয়। কারও কাছে সে গল্প কোনওদিন পৌঁছায় না……

(চলবে…)

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

আরও পড়ুন: রিভিউ: ভক্তের চোখে ফকিরার ডিজিটাল কনসার্ট: প্রিয়ম সেনগুপ্ত

 

দীপান্বিতা বিশ্বাস

ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ

যোগাযোগ: ফেসবুক


এখনই শেয়ার করুন

One thought on “ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (প্রথম পর্ব) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

  • July 25, 2020 at 7:03 pm
    Permalink

    wow 👌👌👌 beautiful as usual ❤️

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *