‘ভক্তের চোখে’ সৌরভের কনসার্ট ‘ডিসেম্বরের শহরে’: অভিনব চক্রবর্তী

বিবিধ ডট ইন: গায়ক এবং সুরকার সৌরভ সাহার ডিজিটাল একক কনসার্ট। শীতের কলকাতায় ‘ডিসেম্বরের শহর’ নামে গত ২৮ ডিসেম্বর ২০২০-তে যাত্রা শুরু করে শিল্পীর ডিজিটাল কনসার্ট। ডিজিটাল কনসার্টের এই সন্ধ্যায় সৌরভ হাজির হয়েছিলেন ওঁর গানের ঝুড়ি নিয়ে। স্বাধীন বাংলা গানের লড়াইকে তরান্বিত করার উদ্দেশ্যে যাঁরা গান গাইছেন সৌরভ সাহাকে তাঁদেরই একজন হিসেবে মনে করেন ওঁর ভক্তরা। বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা মহামারীর মাঝেই সমস্ত স্বাথ্যবিধি মেনে সম্প্রতি শুরু হয়েছে সঙ্গীত অনুষ্ঠানগুলো, দর্শকাসন সীমিত। তবু প্রিয় শিল্পীকে একটু কাছে পাওয়ার আশায় অনেকেই জড়ো হচ্ছেন মঞ্চের সামনে। (‘ভক্তের চোখে’ সৌরভের কনসার্ট ‘ডিসেম্বরের শহরে’: অভিনব চক্রবর্তী)

আনপ্লাগ্‌ড ‘ডিসেম্বরের শহরে’

 

‘ডিসেম্বরের শহরে’ ডিজিটাল কনসার্ট হলেও আসলে এদিনের সন্ধ্যায় সৌরভের ভক্তরা সুযোগ পেয়েছিলেন ওঁর মঞ্চের সামনে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করবার। কলকাতা শহরেই ‘জিজি’ নামক একটি রেস্তোরাঁয় অনুষ্ঠিত হয় ‘ডিসেম্বরের শহরে’ অনুষ্ঠানটি। অনুষ্ঠানে সৌরভ ওঁর গানের ঝুলি থেকে বের করেছেন একের পর এক বিস্ময়কর গান ও গল্প, যা সাজিয়ে তুলেছিল ‘ডিসেম্বরের শহর’।

আরও পড়ুন: জমজমাট নাট্যআননের প্রতিষ্ঠাদিবস! নাটক ‘গণেশ গাথা’ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের গানে থাকবেন দুর্নিবার

সৌরভের মুখে এইদিন শোনা যায় এক ভিনগ্রহী প্রাণীর গল্প, যাঁর নাম টুংরেল। অরেলিয়াম নামক একটি গ্রহের বাসিন্দা টুংরেলের জীবন কাহিনি দিয়ে সাজানো এই গল্পে সৌরভ ফিরে ফিরে এসেছেন শব্দের অনুসন্ধানে। সৌরভ জানান, অরেলিয়াম গ্রহের পুষ্টিসঞ্চারক শব্দের কারবারি টুংরেল শব্দের খোঁজে পৃথিবীতে এসে খোঁজ পায় সঙ্গীতের। এক অদ্ভুত শব্দতরঙ্গ, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী মানুষ নিজেই তৈরি করে নিজেদের স্বার্থে। বিস্ময়কর এই শব্দতরঙ্গ টুংরেলের হৃদয় স্পর্শ করে, এমন শব্দধ্বনি সে অরেলিয়ামে কখনও শোনেনি। সঙ্গীতের শব্দতরঙ্গের রহস্য উদ্‌ঘাটনে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে টুংরেল। পৃথিবীতে এসে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে টুংরেল এর সঙ্গে আলাপ হয় স্বরলিপি নামক এক ব্যক্তির। সৌরভের গল্পের বাকি অংশ জুড়ে গান ও গল্পের মাধ্যমে টুংরেল ও তাঁর সাথী স্বরলিপি দর্শকদের সামনে তুলে ধরে শব্দ তরঙ্গের এবং সঙ্গীতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। (‘ভক্তের চোখে’ সৌরভের কনসার্ট ‘ডিসেম্বরের শহরে’: অভিনব চক্রবর্তী)

আরও পড়ুন:  ‘ভক্তের চোখে’ রূপমের বছরশেষের একক: ঈশিকা চট্টোপাধ্যায়

অনুষ্ঠানে শোনা গেল নোবেলজয়ী জার্মান বৈজ্ঞানিক ম্যাক্স প্লাঙ্ক-এর কাহিনি। হৃদয়কে ছুঁয়ে যাওয়া মধুর শব্দতরঙ্গের রহস্য উন্মোচন করতে উন্মুখ টুংরেলকে ওঁর সহচরী স্বরলিপি জানায়, ‘এই পৃথিবীর চাবিকাঠি আসলে আছে বিজ্ঞানীদের হাতে। সেইসব পদার্থবিজ্ঞানী যাঁরা মনে করেন শব্দ আসলে তরঙ্গ, সেইগুলোও পদার্থ।’ স্বরলিপি টুংরেলকে উৎসাহিত করে পদার্থবিজ্ঞান এর পাঠ নিতে, তবেই সে সঙ্গীতকে বুঝতে পারবে। একহাতে সঙ্গীত এবং অন্য হাতে বিজ্ঞানকে নিয়ে পথচলা শুরু হল টুংরেলের।
‘ডিসেম্বরের শহর’-এর টুংরেল ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে, সংগ্ৰহ করতে চেষ্টা করে প্রতিটি শহরের বিশেষ বিশেষ শব্দতরঙ্গ ও সঙ্গীত আবহ। সঙ্গীতের চলন এবং পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে শব্দের সম্পর্কের রহস্য উন্মোচন করতে ব্যস্ত টুংরেল হঠাৎই মানবজীবনের চক্রব্যূহতে প্রবেশ করে ফেলে। সে আবিষ্কার করতে থাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে সঙ্গীতের আত্মীয়তা ঠিক কতটা গভীর। টুংরেল জানতে পারে আসলে সঙ্গীত যে শুধুই শব্দতরঙ্গ নয়, সঙ্গীত মানবজীবনের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রকাশভঙ্গি। সে জানতে চায় সেই প্রকাশভঙ্গি ঠিক যতটা প্রাকৃতিক, সে কি ঠিক ততটাই কৃত্রিম? সবটাই কি পদার্থবিজ্ঞানের দান? নাকি খানিকটা মানবিক অনুভূতিও মিশে রয়েছে? এসবের খোঁজ করতেই মানবজীবনের অন্দরমহলে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে টুংরেল।

আরও পড়ুন: ‘ভ্রম’— স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যবর্তী স্টেশন, গানে গানে বলছে লক্ষ্মীছাড়া

ধর্ম-রাজনীতিহীন একটি গ্রহ থেকে উড়ে আসা টুংরেল যখন মানুষের জীবনের অন্দরমহলে প্রবেশ করে, তখন তাঁর পরিচয় হয় চিৎকারের সঙ্গে। এমন একটি শব্দতরঙ্গ, যা সে আগে কোনওদিন শোনেনি। দৈনন্দিন জীবনের সমস্যায় জর্জরিত মানবজাতির রাগ দুঃখ চিৎকার কানে আসলে টুংরেলের মন ভারী হয়ে ওঠে। গানের অনুষ্ঠানে দর্শকদের মন ভারী করে দিয়ে সৌরভ শোনালেন টুংরেল কীভাবে শুনে ফেলছে সব শব্দ, বোমার শব্দ চিৎকারের শব্দ, অট্টহাসির শব্দ, কান্নার শব্দ, শুধু পাচ্ছে না একটাই শব্দ -নিস্তব্ধতা। দিনের পর দিন বোমা বর্ষণে ধংস হয়ে যাওয়া শহরগুলির রাতে যে নিস্তব্ধতা বাসা বাঁধে সেই শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী মানুষের কাছেও যে বিভীষিকা, তা টুংরেলও বুঝে যায়, হয়তো বোঝে না শুধু মানুষই। (‘ভক্তের চোখে’ সৌরভের কনসার্ট ‘ডিসেম্বরের শহরে’: অভিনব চক্রবর্তী)

আরও পড়ুন: গবেষক সুধীর চক্রবর্তীকে উৎসর্গ, নতুন সংকল্পের কনসার্ট দোহারের

গোটা ডিসেম্বর মাস জুড়ে সারা পৃথিবীর কিছু বিশেষ বিশেষ শহরে গিয়ে খানিক থমকে যায় টুংরেলের উড়ান। সেইসব শহরের মানুষগুলোর দুঃখ-কান্না, রাগ, ভালবাসা এইসবের সঙ্গে সঙ্গীতের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পায় টুংরেল। স্বাধীন শিল্পী সৌরভ ‘ডিসেম্বরের শহরে’ আসলে টুংরেলকে দিয়ে মানুষের দুঃখ কষ্টের অনেক কথাই বলিয়ে নিয়েছেন। গানের অনুষ্ঠানে গুরুগম্ভীর বিষয়ের প্রাধান্য রেখেই সৌরভ ‘ডিসেম্বরের শহর’ উদ্‌যাপন করলেন ওঁর ভক্তদের সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার: সৌরভ এবং ‘ডিসেম্বরের শহরে’

 

‘ভক্তের চোখে’ সৌরভের কনসার্ট ‘ডিসেম্বরের শহরে’ লিখলেন অভিনব চক্রবর্তী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *