দশাবতার তাসের কিসসা! ধুঁকছে বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য

 

‘I full believe that the game was invented about eleven or twelve hundred years before the present date’- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্য ‘ দশাবতার তাস’ খেলেছেন কী ? আমরা যে তাস খেলি যেখানে
টেক্কা, সাহেব, বিবি, গোলাম নিয়ে হরেকরকমের খেলায় আজও ৮ থেকে ৮০ মেতে উঠি। কিন্তু এই তাস খেলার সাথে দশাবতার তাসের আলাদা ইতিহাস আছে। বাংলা লোকশিল্পের রত্নভাণ্ডার যা বিষ্ণুপু্রের ‘দশাবতার তাস’ একটি বিচিত্র নিদর্শন। তবুও দশাবতার তাসের ঐতিহাসিক প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে শাস্ত্রী মহাশয় যা বলেছেন তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, এই দশাবতার তাস হলো একধরনের লোকশিল্প। এই তাস চিএায়নের ঐতিহ্য বহন করেছেন বিষ্ণুপুরের ফৌজদার ও সুত্রধররা। যদিও বর্তমানে এরা নেই। কিন্তু এদের পেশা কী ছিল ? কাঠ, পাষাণ, মৃত্তিকা ও চিত্র –এই চার শ্রেণীর সূত্রধর বা শিল্পী ছিলেন। কাঠ-শিল্পীরা কাঠের কাজ করতেন, পাষাণ-শিল্পীরা ছিলেন ভাস্কর, মৃত্তিকা-শিল্পীরা মাটির মূর্তি, পুতুল ও পাত্র গড়তেন,আবার ছবিও আঁকতেন।
এই তাস বানানোর পদ্ধতি বেশ অন্যরকম ছিল, তা দেখে নিই, প্রথমে কাপড় তিনভাঁজ করে পর-পর সাজিয়ে তেঁতুল বীচির আঠা বা ‘মাড়ি’ দিয়ে সাঁটা হয়। তারপর একাধিকবার খড়িমাটির প্রলেপ দিয়ে শুকিয়ে নেওয়া হয়। শুকিয়ে নেওয়া্র পর ঝামাপাথর দিয়ে উপরের অংশ যতদূর সম্ভব মসৃণ করা হয়। একে বলে তাসের ‘জমিন’ প্রস্তুত করা, যা বেশ সময় সাপেক্ষ একটা কাজ। জমিন তৈরি হলে, তাসের আকার অনুযায়ী সেগুলো চক্রাকারে কেটে নেওয়া হয়। তারপর আরম্ভ হয় চিত্রাঙ্কন। আঁকা শেষ হওয়ার পর মেটে সিঁদুর আর গালা টেনে ‘পিঠ’ তৈরী করা হয়। এই পিঠ তৈরি করার পদ্ধতিটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাসের একদিকে ছবি আর একদিকে মেটে সিঁদুর ও গালার প্রলেপ থাকে। বিচিত্র সব রঙের অদ্ভুত সামঞ্জস্য রেখে তাসগুলো বানানো হয়। ‘ তাদের তাস চিএায়ন দেখলে বোঝা যায়, তাদের শিল্পসত্ত্বার প্রতি গভীরতা। এবার আসি সেই আলোচনায় যেখানে তাসের হঠাৎ এরকম নামকরণ কেন হলো? এ প্রসঙ্গে বলা বাহুল্য যে, দশাবতার বলতে এখানে পৌরাণিক দেবতাদের কথা বলেছে। এই দশাবতার হলেন, মৎস, কুর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, রাম(রঘুনাথ), ভৃগুরাম(পরশুরাম), বলরাম, জগন্নাথ(বুদ্ধ) ও কল্কী –ও পরে উজীর সহ মূর্তির চিএাঙ্কন করেছেন। কিন্তু পৌরাণিক দশাবতার থাকতে উজীর কেন যোগ হল? এই উজীর আর কেউ নন ! পৌরাণিক অবতারের ক্ষমতা অসীম, তাঁদের প্রতিভূ হলেন ‘উজিররা’।
দশাবতার তাস খেলা না হলেও এখন ব্যবহৃত হয় সৌন্দার্যায়নে। বর্তমানে একমাত্র তাস খেলার নির্মাতা হলেন শীতল ফৌজদার। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা গেছে, ১০টি গোলাকার তাস প্যাকেট হিসেবে বিক্রি করে থাকেন শিল্পীরা। তবে, শিল্পীদের কথায়, বছরে মেরেকেটে ১০টির বেশি প্যাকেট বিক্রি হয় । তাই বলি চলুন না আমরা আমাদের এই পুরনো ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগী হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই তাস চিএায়নের মধ্য দিয়ে সমাজবিন্যাসের ছবি ফুটে উঠেছে আর সেই খেলার ভিতরেই আত্মগোপন করে রেখেছে অতীত সমাজের ইতিহাস। এইভাবেই হয়তো সমাজের প্রতিচ্ছবিরূপে এই সচিত্র তাসখেলার প্রবর্তন হয়েছিল।

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: