‘ভ্যাকসিন নিয়ে দিব্যি সুস্থ’, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কর্তব্যপরায়ণ IIT খড়গপুরের সৌম্য

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন: কোভিড পরবর্তী ‘নিউ নরমাল’ জনজীবনে ভারতবর্ষের সমস্ত মানুষ ভ্যাকসিনের দিকে তাকিয়ে। এই মুহূর্তে দেশে জরুরি পরিস্থিতিতে অক্সফোর্ডের ‘কোভিশিল্ড’ ভ্যাকসিনের প্রয়োগ চলছে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে। স্বাস্থ্য এবং জরুরি পরিষেবায় যাঁরা কাজ করছেন তাঁরা এই ভ্যাকসিন পাচ্ছেন। ভারত বায়োটেকের কো-ভ্যাকসিনকেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ভ্যাকসিনে কনসেন্ট সই করা নিয়ে জটিলতাও দেখা গিয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি-এর ট্রায়াল দেশে এখনও চলছে এবং ট্রায়ালের শেষ পর্যায় চলছে এই ভ্যাকসিন। (‘ভ্যাকসিন নিয়ে দিব্যি সুস্থ’, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কর্তব্যপরায়ণ IIT খড়গপুরের সৌম্য)

 

এই ভ্যাকসিনগুলির ট্রায়াল পর্বে অংশগ্রহণ করেছেন যুবসমাজের অনেকাংশই। আবার ভয় পেয়ে একাংশ পিছিয়েও গিয়েছে।
আইআইটি খড়গপুরের ছাত্র সৌম্যসারথি গঙ্গোপাধ্যায় এই করোনা সময়কালে বিভিন্ন ভাবে পরিষেবা দিয়েছেন মানুষকে। সৌম্য কেমিক্যাল এবং মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগে স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। নিজের পড়াশোনার সূত্রেই জীবাণু কিংবা বিভিন্ন কেমিক্যাল-এর ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করছেন। করোনার প্রকোপ যখন দেশে এবং রাজ্যে সর্বোচ্চ, সেইসময় থেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পিয়ারলেস হাসপাতালে করোনা সন্দেহভাজন মানুষদের থেকে সোয়াব নমুনা বা লালারস সংগ্রহের কাজ করতেন সৌম্য। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কোভিড যোদ্ধা হয়ে এই পরিষেবা দিয়ে এসেছেন সৌম্য।

আরও পড়ুন: কলকাতা বসুর কড়চা: ৪

এখানেই থেমে যায়নি তাঁর কর্মকাণ্ড। স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন ফেজ-৩ ট্রায়ালের সময় যখন বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের প্রয়োজন পরে তখন সৌম্য এগিয়ে আসেন এই ট্রায়াল পর্বে। শুধু তাই নয়, মাইক্রোবায়লজি সোসাইটি ইন্ডিয়া ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিট সংস্থার পক্ষ থেকে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদের অনুসন্ধান করার কাজও একইসঙ্গে সামলান সৌম্য। কীভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হল। সেই প্রসঙ্গে বিবিধ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌম্য জানান,

আমাদের সংস্থা থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয় ট্রায়াল-এর জন্য স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করা। সেই মতো আমরা একটা ফর্ম বানাই যেটা অনেকের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। যাঁরা স্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রে জড়িত, তাঁদের কাছেও আমাদের তরফে আবেদন করা হয়। তাঁদের মধ্যে যাঁরা আবেদনে সাড়া দেন, তাঁরা সেই ফর্ম পূরণের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করেন। রেজিস্টার্ড হওয়ার পরে তাঁদের সঙ্গে ইনভেস্টিগেটিং ডাক্তার যোগাযোগ করেন এবং ডাকা হয় তাঁদের। এরপর ভ্যাকসিনেশন সম্পর্কে পুরো বিষয়টা তাঁদের বোঝানো হয় যে, কী হবে, কীভাবে হবে, কী করতে হবে। তারপর কনসেন্ট অর্থাৎ অনুমতি পত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার পর তাঁদের স্ক্রিনিং করা হয়। স্ক্রিনিং-এ পাশ করলে পরবর্তী একটি নির্দিষ্ট দিনে তাঁদের ভ্যাক্সিনেশন-এর জন্য ডাকা হয়।


কনসেন্ট কিংবা স্ক্রিনিং-এর পদ্ধতিটি ভ্যাকসিন ট্রায়াল-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই বিষয়ে সৌম্য জানান,

যেকোনও ভ্যাকসিন ট্রায়াল যখন হয় ফেজ-১, ফেজ-২, ফেজ-৩ ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ে, তা যে ১০০% নিশ্চিত প্রয়োগের জন্য, সেটা বলা যায় না। কিন্তু ট্রায়ালের মাধ্যমেই পরীক্ষা করতে হবে যে, সেই ভ্যাকসিন মানবদেহে কতটা কার্যকরী প্রভাব ফেলছে, আদৌ ফেলছে কি না এবং অন্যান্য উপসর্গ কিছু তৈরি হচ্ছে কি না। তবে এটাও ঠিক, ভ্যাকসিন প্রয়োগ সুনিশ্চিত নয় বলে মানবদেহে বিরাট বড় ক্ষতি হবে এমনটাও নয়। যেহেতু পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটাতে কোনও আপত্তি নেই সেই ব্যক্তি এবং স্বেচ্ছায় এই ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করছেন সেটা সুনিশ্চিত এবং সুস্পষ্ট করতে অনুমতি পত্রে সই করতে হয় স্বেচ্ছাসেবকদের। স্ক্রিনিং-এ পরীক্ষা করা হয় কোনও ব্যক্তির অন্যান্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কিংবা মানসিক অসুস্থতা, জটিলতা রয়েছে কি না। এমনকী, শরীরের মধ্যে ইতিমধ্যেই কারুর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, পরীক্ষা করা হয়। যদি এসমস্ত কিছু বিষয় থেকে থাকে সেক্ষেত্রে তাঁর শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয় না। যেহেতু ১০০% সুনিশ্চিত নয়, তাই শুধুমাত্র একজন সম্পূর্ন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের ওপরই প্রয়োগ করা হয় এই ভ্যাকসিন। তবে এমন নয় যে, শারীরিক অসুবিধা থাকলে তিনি কখনও ভ্যাকসিন পাবেন না। ট্রায়াল পর্ব শেষ হলে ভ্যাকসিন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা গবেষক, চিকিৎসকরা পেয়ে থাকেন ফলে পরবর্তীকালে সমস্ত মানুষের জন্যই ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: India-England Test Series: সাক্ষাৎকারে সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সৌম্য এই বয়স থেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্ত থাকার জন্য অনেকের থেকে প্রশংসা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। যে সময় ভাইরাসের ভয় সবাই সামাজিকভাবে নিজেদের ঘরবন্দি করে নিচ্ছিলেন, বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক ভীতি কাজ করছিল, স্বাস্থ‍্যক্ষেত্রের পরিষেবায় জড়িত থাকলে তাঁদের সঙ্গে প্রতিবেশীরা অসহযোগিতা করছিলেন বলে এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছিল, সেই সময় সৌম্যকে কোনওরকম অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়নি। সৌম্য বললেন,

আমার বাবা ষাটোর্ধ্ব। কিন্তু তাও তিনি খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন আমায়। পাড়া, প্রতিবেশীরাও কোনও অসহযোগিতা তো করেনইনি। বরং ভাইরাস সংক্রমণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার কাছে এসে পরামর্শ চাইছিলেন তাঁরা, যেহেতু খুব কাছ থেকে সমস্ত বিষয় আমি পর্যবেক্ষণ করছিলাম, যেহেতু লালরস সংগ্রহ করার কাজ করছিলাম এবং রোগীর সংস্পর্শেও যেতে হয়েছিল।  প্রায় দেড় হাজারের ওপর কোভিড পজিটিভ রোগীর কাছাকাছি এসেছিলাম। কিন্তু আমার কখনও কোভিড হয়নি এবং বিস্ময়কর বিষয় যে, আমার মধ্যে কোনও অ্যান্টিবডিও তৈরি হয়নি। সেইজন্যই আমি নিজে ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশ নিতে পারলাম।

ভ্যাকসিনের কার্যক্রম বোঝার জন্য সকলকেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়, এমনটা নয়। কিছুজনকে ‘প্লাসেবু’ দেওয়া হয় ভ্যাকসিনের বদলে। কিন্তু সেটা সবার অজানা থাকবে। শুধুমাত্র পরীক্ষকরা জানবে এই বিষয়টা। যাঁদের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হল এবং যাঁদের শরীরে ‘প্লাসেবু’ প্রয়োগ করা হল, তাঁদের মধ্যে কী পার্থক্য পরিলক্ষিত হলো সেটা দেখা হয়। ভ্যাকসিন নেওয়ার পর স্বেচ্ছাসেবকদের কীভাবে চলতে হবে, সেই প্রসঙ্গে সৌম্য বলেন,

যাঁদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তাঁদের স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক জীবনে মেলামেশা করতে হবে। নইলে বোঝা যাবে না তাঁদের শরীরে এই ভ্যাকসিন কাজ করছে কি না, কোনওভাবে সংক্রমিত হয়ে পড়ছেন কি না। তবে স্যানিটাইজার, মাস্ক এসবকিছুর ব্যবহার ভুললে হবে না। কারণ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ এভাবেই করতে হবে। সর্বসাধারণের জন্য ভ্যাকসিন চলে আসলেও নিউ নরমাল মেনেই আমাদের চলতে হবে বেশ কিছুদিন। এছাড়া অন্যান্য রোগের ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রেও বলা হয় কিছুদিন মদ্যপান এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকতে। যাতে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া শরীরে না পড়ে। করোনার ভ্যাকসিন একদমই নতুন এবং রোগটাও নতুন তাই অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। বেশকিছুদিন ধূমপান, মদ্যপান যথাসম্ভব কম করা যায় ততই ভাল। এছাড়া সেরকম কোনও আলাদা বিধিনিষেধ নেই। সবাই গুজবে ভাবছেন যে, একেবারেই মদ্যপান এবং ধূমপান বন্ধ হয়ে যাবে তেমনটা নয়।

সৌম্য কিছুদিন আগেই স্ক্রিনিং-এ পাশ করার পর ফেজ-৩ ট্রায়াল পর্বে রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেন। সৌম্য ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক রয়েছেন। তবে ভ্যাকসিন নেওয়ার পর দু’দিন একটু জ্বর ছিল। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরই বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এমন অভিযোগ অনেক জায়গা থেকেই এসেছে। এই প্রসঙ্গে সৌম্য বলেন,

জ্বর হওয়া কিংবা গা, হাত পায়ে ব্যথা হওয়া কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই নয়। এইগুলো স্বাভাবিক একটা প্রভাব যেটা হওয়া ভাল। এই প্রভাবগুলি পড়লে বোঝা যায় যে শরীরে ভ্যাকসিন তার কার্যক্রম করছে অর্থাৎ অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। যেকোনও ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেই এইরকম প্রভাব লক্ষ্য করা যায় শরীরে, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমার সঙ্গে যাঁরা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁদের অনেকেরই জ্বর আসেনি, কিছুজনের অল্প হাতে ব্যথা ছিল। কিছু মিডিয়া এবং মানুষ এই জিনিসটাকে অনেক বড় করে প্রচার করে ভুল ধারণা তৈরি করছেন মানুষের মধ্যে। এত ভীত হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক: জলতরঙ্গ (পর্ব ১৪) — দীপান্বিতা বিশ্বাস

সৌম্য দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কাজ করেছেন, আবার ভ্যাকসিন ট্রায়ালও নিলেন। সৌম্যর নিজের কখনও ভয় লাগেনি? সেকথা জিজ্ঞেস করলে সৌম্য বলেন,

বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কিছু কর্তব্য আমার ওপর বর্তায় এবং সমাজের প্রতি আমরা প্রত্যেকেই দায়বদ্ধ। কোনও বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান এবং প্রয়োজন মতো সাবধানতা অবলম্বন করলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভ্যাকসিন ট্রায়ালের জন্য অনেক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রয়োজন পড়ে। যদি সবাই অকারণে ভয় পেয়ে এগিয়ে না আসেন, তাহলে পরবর্তীকালে এই ভ্যাকসিনের প্রয়োগ পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে। ভয় না পেয়ে সবার এগিয়ে আসা উচিত এবং করোনার কোনও ভ্যাকসিনই শরীরের ক্ষতি কিছুই করছে না। তাই যাঁরা ভ্যাকসিন পাচ্ছেন, তাঁদের সকলের নেওয়া উচিত। বিশেষত যুবসমাজ যাঁরা সুস্থ, সবল, এই করোনা পরিস্থিতিতে তাঁদের সবরকমভাবে এগিয়ে আসা উচিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে।

ভারতে ভ্যাকসিনেশন পর্ব শুরু হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সি ইউসেজ অ্যাপ্রুভাল (E.A.U) ক্যাটাগরিতে স্বাস্থ্যকর্মী এবং জরুরি পরিষেবায় যুক্ত কর্মীদের এই কোভিশিল্ড এবং কো-ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। স্পুটনিক-ভি-এর সফল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। এবার স্পুটনিক-ভি-এর E.A.U ক্যাটাগরি অ্যাপ্রুভালে ভ্যাকসিনেশনের কাজ শুরু হয়ে যাবে বলে জানা যাচ্ছে সূত্র মারফৎ।

 

‘ভ্যাকসিন নিয়ে দিব্যি সুস্থ’, বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কর্তব্যপরায়ণ IIT খড়গপুরের সৌম্য লিখলেন অরিঘ্ন মিত্র।


এখনই শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *