আদালত অবমাননা আইন— ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ

এখনই শেয়ার করুন

বিবিধ ডট ইন-এ আদালত অবমাননা আইনের উৎপত্তি, ইতিহাস এবং অন্যান্য খুঁটিনাটিসহ সাম্প্রতিক আদালত অবমাননা আইনে দোষীসাব্যস্ত আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বিষয়ে আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অঞ্জন দত্ত। (আদালত অবমাননা আইন — ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ)

 

আদালত অবমাননা বলতে বোঝায় আদালতের নির্দেশাবলী বা আদালতে প্রাধিকার তথা বিধিসম্মত ক্ষমতার অবমাননা, কালিমালিপ্ত বা অসম্মান করার ঘটনা। মূলত তা রুখতেই আদালত অবমাননা আইনের উৎপত্তি এবং প্রণয়ন ।

উৎপত্তি এবং ইতিহাস

আদালত অবমাননা আইনের ঐতিহাসিক ব্যুৎপত্তি এবং প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে ইংল্যান্ডের বিচারব্যবস্থার সঙ্গে। ইংল্যান্ডের বিচারব্যবস্থা কমন ল সিস্টেম বা চিরাচরিত আইন নামে পরিচিত।

আদালত অবমাননা আইন— এই ধারণাটি নতুন নয়। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ইতিহাসের। বিচারব্যবস্থা শুরুর আগে রাজ-রাজাদের আমল থেকেই চলে আসছে এই ধারণাটি। তৎকালীন সময়ে রাজ-রাজাদের হাতেই ছিল বিচার করার ক্ষমতা। তাঁদের ঘোষিত বিচারই ছিল সেই সময়ের আইন। সেই বিচারের অবমাননা যদি কেউ করতেন, তাহলে রাজা তাঁদের শাস্তি দিতেন এবং এর থেকেই আদালত অবমাননা তত্ত্বটির উৎপত্তি। এই তত্ত্বটি প্রথম পদার্পণ করে ইংল্যান্ডের বিচারব্যবস্থায়। আদালত অবমাননার ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে এই তত্ত্বটিকে বলা যায়। পরবর্তীকালে ভারতে লিখিত আকারে আইন প্রণয়ন হয় । বর্তমান সময়ে ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় কেউ যদি আদালতের কাজ অর্থাৎ বিচার করার বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে, সেটা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়।

ভারতে আইন-প্রণেতারা আদালত অবমাননার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছেন।  ভারতে এই বিশেষ আইনটি Contempt of Courts Act, 1971 বা আদালত অবমাননা আইন, ১৯৭১ নামে পরিচিত। সেই আইনে কনটেম্পট অফ কোর্টকে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হল সিভিল কনটেম্পট ও দ্বিতীয়টি ক্রিমিনাল কনটেম্পট। পাশাপাশি উভয়ের ক্ষেত্রে নিয়মকানুনও যে আলাদা, সেটিও উল্লেখ রয়েছে এই আইনে।

আরও পড়ুন: কোভিড পজিটিভ? ঘরবন্দি থাকাকালীন কী করবেন, কী করবেন না

সিভিল কনটেম্পট

কেউ যদি আদালতের কোনও নির্দেশ বা রায় ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননা করেন, তাহলে সেটা সিভিল কনটেম্পটের অন্তর্গত।

 

ক্রিমিনাল কনটেম্পট

আদালতের অথরিটি বা প্রাধিকার বা বিধিসম্মত ক্ষমতাকে কালিমালিপ্ত করা বা অসম্মান করার ঘটনা ঘটলে, তা ক্রিমিনাল কনটেম্পটের অন্তর্গত। এক্ষেত্রে কোর্টের ভাবমূর্তি বা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে নষ্ট করে, এমন কোনও মন্তব্য যদি কেউ করেন, তাহলেও আদালত অবমাননা আইন লাগু হতে পারে।

আরও পড়ুন: ক্লিনিক: একটি প্রাচীন প্রসঙ্গ ও একটি অর্বাচীন প্রস্তাব (দ্বিতীয় পর্ব)

১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ ভারতের উচ্চ আদালতে বিচারপতিরা নয়া দিল্লিতে জিমখানা ক্লাবে সমবেত হয়েছিলেন ভারতীয় সংবিধানের (ড্রাফ্‌ট) ভূমিকা, তার আইনি তাৎপর্য এবং সেই সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার জন্য। সেই মিটিংয়ে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। সেই আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন বম্বে উচ্চ আদালতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এম সি ছাগলা, ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি স্যার সৈয়দ ফজল আলি, পূর্ব পাঞ্জাবের প্রধান বিচারপতি দেওয়ান রাম লাল, ভারতের প্রধান বিচারপতি স্যার হরিলাল জে কানিয়া, ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি এম পতঞ্জলি শাস্ত্রী, এলাহাবাদের প্রধান বিচারপতি বিধুভূষণ মালিক, পাটনার বিচারপতির মনোহর লাই, কলকাতার বিচারপতি রূপেন্দ্র কুমার মিত্তির, নাগপুরের প্রধান বিচারপতি স্যার ফ্রেডরিক গ্রিল, অবধের প্রধান বিচারপতি গোলাম হাসান, মাদ্রাজের প্রধান বিচারপতি  ভেঙ্কট রাজামন্নর প্রমুখ। ভারতের সংবিধান যখন প্রণয়ন হয়, তখন ভারতীয় সংবিধানের ১২৯ অনুচ্ছেদ ও ২১৫ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট এবং হাইকোর্টকে নিজেদের অবমাননার জন্য শাস্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: ‘তপনকে রাখিস, ও অনেককিছু দেবে ইন্ডাস্ট্রিকে,’ শুটিংয়ে বলেছিলেন ঋতুদা

আদালত অবমাননা এবং প্রশান্ত ভূষণ মামলা

প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের দু’টি টুইটকে কেন্দ্র করে আদালত অবমাননার যে অভিযোগ উঠেছিল, ৩১ আগস্ট, সোমবার সেই মামলার সাজা ঘোষণা করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালত অবমাননার অপরাধে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শাস্তিস্বরূপ এক টাকা জমা করতে হবে তাঁকে। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে তা না করতে পারলে তিনমাসের জেল এবং আগামী তিনবছর তিনি কোনও মামলা লড়তে পারবেন না।

আদালত অবমাননা আইন— ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ বিবিধ ডট ইন

জুন মাসে করা দু’টো টুইটকে কেন্দ্র করেই আইনজীবী তথা সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণকে সাজা শুনিয়েছে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। ২৭ জুন টুইটারে তিনি লেখেন, ‘সরকারিভাবে জরুরি অবস্থা না থাকা সত্ত্বেও গত  ছ’বছরে কীভাবে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, তা দেখার সময় ঐতিহাসিকরা সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা বিশেষভাবে চিহ্নিত করবেন, বিশেষ করে ভারতের শেষ চারজন প্রধান বিচারপতির ভূমিকা।‘ অন্যদিকে ওই মাসেরই ২৯ তারিখ তিনি আর একটি টুইট করেন, ‘মাস্ক বা হেলমেট না পরেই নাগপুরের রাজভবনে এক বিজেপি নেতার ৫০ লক্ষ টাকার মোটরসাইকেল চালিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। এদিকে সুপ্রিম কোর্টকে লকডাউন মোডে রেখে নাগরিকদের বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন তিনি।’এই টুইটের পর মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আদালত অবমাননার মামলা চালু করে তাঁর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ শুনানিতে সব পক্ষকে শোনার পর গত ১৪ আগস্ট প্রশান্ত ভূষণকে দোষী সাব্যস্ত করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তবে চলতি মাসের ২০ তারিখ তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। যদিও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন প্রশান্ত ভূষণ। ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ অস্বীকার করেন। তাঁর পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাজীব ধবনও সাফ জানান, প্রশান্ত ভূষণের টুইটে আদালতের অবমাননা বা বিচারব্যবস্থার অমর্যাদা করা হয়নি। এই নিয়ে চাপানউতর চলতে থাকে। অবশেষে সোমবার (৩১ আগস্ট) সাজা ঘোষণা করে মহামান্য শীর্ষ আদালত।

আরও পড়ুন: সাক্ষাৎকার: আমি ঠোঁটকাটা, ভবিষ্যতে আরও হতে চাই— অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়

আদালত অবমাননা আইন— ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ বিবিধ ডট ইন

তবে প্রশান্ত ভূষণের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা একদশক আগেও উঠেছিল। ২০০৯ সালে প্রথম মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বিচারপতিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ২০০৯ সালের সেই মামলার শুনানি পিছিয়ে গেল। বিচারপতি অরুণ মিশ্রের বেঞ্চ এই মামলাটি আগেই প্রধান বিচারপতি এস এ বোবদের কাছে শুনানির জন্য অন্য বেঞ্চ গঠনের সুপারিশ করেছিলেন। এই মামলাটির এখন প্রধান বিচারপতি গঠিত নতুন বেঞ্চে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুনানি হবে।

আপডেট থাকুন। ফলো করুন আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ:

 

আর্কাইভ: প্রেরণা   ক্লিনিক   ব্লগ   বিজ্ঞান   লাইফস্টাইল   খেলা   ভ্রমণ   অ্যাঁ!   এন-কাউন্টার

আদালত অবমাননা আইন — ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ আলোচনায় আইনজীবী অঞ্জন দত্ত

আদালত অবমাননা আইন— ভারতীয় বিচারব্যবস্থা এবং দোষীসাব্যস্ত প্রশান্ত ভূষণ বিবিধ ডট ইন

অঞ্জন দত্ত

আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট


এখনই শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।