ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?

‘চান্স পেলে মাইনে-করা এক সংস্কৃত পণ্ডিতমশাই রাখবে, যাতে কয়েক ঘণ্টা তাঁর কথা শুনতে পারো’— এই পরামর্শ বোধহয় একমাত্র বাংলার কনরাডের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। মর্ডানিস্ট ইংরেজি সাহিত্যে ঔপনিবেশিক ধারার কথা যেমন কনরাডকে ছাড়া অসম্পূর্ণ, ঠিক তেমনই, ক্লাসিক বাংলা উপন্যাস, তা সে ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, আধিভৌতিক বা রহস্যরোমাঞ্চ যাই হোক না কেন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ অনস্বীকার্য। কনরাড জাতে পোলিশ, রাশিয়ান এম্পায়ারের বার্দিশিভে জন্ম: ইংরেজি ভাষায় সাম্রাজ্যবাদের গল্প শোনাবেন বলে রীতিমতো তালিম নিলেন শেক্সপিয়ারের মাতৃভাষায়। অবশেষে ১৮৯৯ এ প্রকাশিত হল Heart of Darkness; বাকিটা ইতিহাস। এই বছরই ৩০ মার্চ জন্ম নিলেন শরদিন্দু— বাংলা সাহিত্যের চির উজ্জ্বল চাঁদ! পুরো নাম— শরদিন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। (ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?)

জৌনপুর প্রবাসী বাঙালি ব্যারিস্টার তারাভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র শরদিন্দু স্কুল জীবন কাটালেন মুঙ্গেরে, সেখান থেকে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ। সাহিত্যপ্রীতি ছিল ছোটবেলা থেকেই: বঙ্কিমচন্দ্র, শরচ্চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এবং শেক্সপিয়ারকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মানতেন। বিশ্বাস করতেন, লেখার মানোন্নয়নের জন্য লেখকের মানসিক প্রস্তুতি ও বিষয়ভিত্তিক গভীর পড়াশোনায়। আর সেই জন্যই রীতিমতো মাইনে-করা পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে তালিম নিয়েছেন ভাষাচর্চার। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়লে বোঝা যায় কীভাবে শব্দব্যবহারে সমসাময়িক কালের চালচিত্র গড়েছিলেন: ঐতিহাসিক উপন্যাসের বর্ননায় তৎসম শব্দ প্রয়োগ, গোয়েন্দা ও পারলৌকিক কাহিনিতে তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি মিশ্র এমনকী, বিদেশি শব্দের ব্যবহারে বুঝিয়েছেন সমসাময়িক মানসিকতাকে। এ যেন বাঙালির New Historicism-এর পাঠ! স্বয়ং যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি তাঁকে বলেছিলেন, ‘এত সংস্কৃত শব্দ পুঞ্জীভূত হইয়াছে, এত সমাসবদ্ধ নূতন নূতন শব্দ রচিত হইয়াছে, যে ভাষায় আমি আপনার অধিকার দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছি।’

এহেন মানুষটি ছাত্র হিসেবে ঠিক কেমন ছিলেন?
ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে আসত হিতবাদী, ভারতী, প্রবাসীর মত পত্রিকা। ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তারাভূষণ ছেলেকে গ্রাহক করে দিয়েছিলেন প্রথম সংখ্যা থেকেই। প্রথাগত শিক্ষার টেক্সট বইয়ের দু’মলাটের মধ্যে কোনওদিনই বন্দি থাকেনি ছাত্র শরদিন্দুর পড়ার জগৎ। ‘ভাল’ সাহিত্য পড়াকে প্রায় শিল্পের মর্যাদায় নিয়ে গেছেন যিনি, তাঁর নজর যে বরাবর উঁচু তারেই বাঁধা থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! দশ-বারো বছর বয়সী, বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায় দাঁড়ানো শরদিন্দুর তাই মোটেই ভাল লাগেনি সহপাঠীদের মধ্যে হইচই ফেলে দেওয়া বই, পাঁচকড়ি দে-র ‘নীলবসনা সুন্দরী’। বরং তাঁর মন জুড়ে ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রমেশচন্দ্র দত্ত। আর বাংলা কবিতা? গুরুদেবের পর শরদিন্দুর একমাত্র পছন্দ ছিলেন মাইকেল দত্ত। নজরুল ইসলামের লেখার প্যারডি করেছেন শরদিন্দু: ‘তোমার এ মহাবিশ্বে ছাতা হারায় খালি প্রভু’! (ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?)

প্রথম স্কুল মুঙ্গের ট্রেনিং অ্যাকাদেমি, যা শরদিন্দুর কাছে ছিল দুঃস্বপ্নের মত। তবে কিছুদিন পরেই ভর্তি হন মুঙ্গের ডিস্ট্রিক্ট স্কুলে।
মুঙ্গের ডিস্ট্রিক্ট স্কুলকে বলা যায় ভবিষ্যতের ব্যোমকেশ-সৃষ্টার আঁতুড়ঘর! ড্রিল মাস্টার পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী প্রবাসী বাঙালি ছাত্রদের যত্ন করে শেখাতেন বাংলাভাষা, ভালোবাসতে শেখাতেন বাংলা সাহিত্যকে। একদিন বাংলা ক্লাসে পূর্ণবাবু ছেলেদের বাড়ির কাজ দিলেন ‘কবিতা লেখা’। সাথে অভয়বাণী— ‘কবিতা লেখা খুব শক্ত নয়, চেষ্টা করলেই পারবে।’ গোটা ক্লাসের মাত্র দু’জন ছাত্রের চেষ্টা সফল হয়েছিল। কবি গোবিন্দচন্দ্র রায়ের সুযোগ্য পুত্র নিরুপম এবং বলাই বাহুল্য, ‘চন্দ্রহাস’ তথা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। প্রথম কবিতা ‘কষ্টহারিনীর গঙ্গাঘাট’। শরদিন্দু নিজের স্মৃতিচারণায় লিখছেন, ‘পূর্ণবাবু ছিলেন চটপটে দ্রুতভাষী প্রফুল্লচিত্ত ব্যক্তি। …আমার বাংলা সাহিত্য রচনার দীক্ষা পূর্ণবাবুর কাছে। …পূর্ণবাবু সেই যে নেশা ধরাইয়া দিয়াছিলেন, সেই নেশায় আজও বুঁদ হইয়া আছি।’ নেশায় বুঁদ হয়েই গোগ্রাসে শেষ করে ফেললেন চৈতন্য জীবনী। কারণটা আর কিছুই নয়, স্কুলের আর এক শিক্ষক কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় ক্লাসে পড়িয়েছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। ছাত্রের আগ্রহ দেখেই কালীপ্রসন্ন বাবু শরদিন্দুকে চৈতনীজীবনী পড়তে দেন। ফলাফল? ‘চুয়াচন্দন’!

তবে আজকের যে ‘চুয়াচন্দন’ পাঠক পড়েন, সেটি কিন্তু মোটেই সেই ১৫ বছর বয়সী শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাটি নয়। ছাপাখানায় পাঠানোর আগে ছ’বার লিখেছেন ‘চুয়াচন্দন’ পরবর্তীতে। লেখালেখির ক্ষেত্রে, কৈশোর থেকেই শরদিন্দুর বিশ্বাস ছিল Wordsworth-এর মত: ফরমায়েশি লেখা নয়, রীতিমতো গবেষণা করে লিখে তাকে কিছুদিন রেখে দিয়ে বারংবার সংশোধন ও সম্পাদনা করে তবেই চূড়ান্ত করতেন ছাপার জন্য। তাই কিশোর বয়সে লেখা ‘চুয়াচন্দন’ প্রকাশ পায় দ্বিতীয় বই (প্রথম বই, যৌবন স্মৃতি, ১৯১৯) তথা প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জাতিস্মর’-এ (১৯৩৩); ‘প্রাগজ্যোতিষ’ এবং ‘মরু ও সঙ্ঘ’-এর সাথে।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ছুটি কাটাতে গেলেন ইলাহাবাদে, মামার বাড়িতে। অপটু হাতে একটি মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস লিখলেন, ‘প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত’। কিশোর বয়সের কাঁচা লেখা হিসেবে সেটিকে দেরাজে লুকিয়ে তুলে রেখেছিলেন আজীবন। (ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?)

না, মারাত্মক মেধাবী ছাত্র কোনওদিনই ছিলেন না শরদিন্দু, বরং সিলেবাসের বাইরের পড়াশোনার দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। প্রায় সমস্ত রকম খেলাধুলো করা শরদিন্দুর মারাত্মক আগ্রহ ছিল পারলৌকিক চর্চায়। মুঙ্গের স্কুলে পড়াকালীনই নিছক কৌতূহল বশে প্ল্যানচেটে হাতেখড়ি, কলকাতার মেসে থাকাকালীন যা পরিণত হয় অভ্যেসে। তাঁর অকাল্ট বিদ্যার শিক্ষাগুরু কে তা স্পষ্ট করে না জানালেও বরদাচরণের চরিত্রের মাধ্যমে অকাল্টিজমের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য নজর এড়ায়না পাঠকের। কৈশোরে পারলৌকিক চর্চা তাকে আকৃষ্ট করলেও বিগত যৌবনে মেতে ওঠেন কোষ্ঠী বিচার ও জ্যোতিষচর্চায়। এত গভীরভাবে গ্রহ-নক্ষত্রাদি নিয়ে চর্চা করতেন যে তার প্রভাব পড়ত সাহিত্য রচনায়। বন্ধু প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের উপদেশে মেস-বাসী ব্যোমকেশকে গৃহস্থ জীবন দিয়েছেন শরদিন্দু, প্রতুলচন্দ্রের আবদার মেনে সত্যবতীর সাথে বসবাসের জন্য নিজের বাড়িও দিলেন। ‘চিত্রচোর’-এর সাফল্যের পর প্রতুলচন্দ্র আবদার করলেন, ব্যোমকেশের নামডাক হয়েছে, এবার গোয়েন্দার একখানা নিজের গাড়ি চাই। শরদিন্দু সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘আমি ব্যোমকেশের কোষ্ঠী দেখেছি। ওর হাতে গাড়ি নেই।’

বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তির পর মুঙ্গের ছেড়ে প্রথমে এসে উঠলেন YMCA-এর হোস্টেলে; নতুন বন্ধু হল অজিতকুমার সেন, যে বন্ধুত্ব অমলিন হয়ে থেকে যাবে ব্যোমকেশ কাহিনিতে। সাহিত্যপ্রেমী অজিতকুমার সেনের জোরাজুরিতেই ১৯১৯-এ প্রকাশিত হল প্রথম বই, ‘যৌবন স্মৃতি’। অজিতকুমারের উৎসাহে পড়ে ফেললেন মিল্টন, বার্নার্ড শ, কোনান ডয়েল, ক্রিস্তি, মার্ক টোয়েন, ম্যাথু আর্নল্ড! আর কলেজের পড়া? শরদিন্দু মন-কনিকায় লিখছেন, ‘কলিকাতায় গিয়া কিছুদিনের মধ্যেই বায়োস্কোপ দেখায় মাতিয়া উঠিলাম। ফুটবল হকি খেলার ঝোঁক আগে হইতেই ছিল, তার উপর জুটিল টেনিস ও বাস্কেটবল। কলিকাতায় যে পাঁচ বছর ছিলাম, তাহার মধ্যে লেখাপড়া অল্পই করিয়াছিলাম; তবে পরীক্ষায় পাশ করিয়া যাইতাম।’

বস্তুত ১৯১৮সালে পারুলবালা দেবীর সঙ্গে বিয়ের পরই প্রথাগত ছাত্র জীবনের ইতি ঘটে শরদিন্দুর, যদিও তারপর বাবার পরামর্শে আরও দু’বছর নিতান্ত অনিচ্ছায় ওকালতি পড়েন। কিন্তু, আজীবন পড়াশোনা করে গেছেন; যে কোন উপন্যাসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করে, এবং নতুন লেখার জন্য অনুপ্রেরণাও পেতেন নিত্যনতুন বিষয়ে পড়াশোনা করে। (ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?)
বলিউড ও টলিউডের সবচেয়ে প্রিয় কাহিনী ও চিত্রনাট্যকার শরদিন্দুর কিশোর বয়সের উপন্যাস টি দিয়ে শেষ করব। আজীবন দেরাজে লুকিয়ে রাখা পান্ডুলিপিটি পড়তে ইচ্ছে করছে নিশ্চয়ই?
তরুণ মজুমদার উপন্যাসটি নিয়ে ছায়াছবি বানিয়ে বাঙালির প্রেমের মাইলফলক হিসেবে পরিচিত করেছেন; ছায়াছবির নাম, ‘দাদার কীর্তি’।

সাহিত্য বিভাগে ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা? লিখলেন অম্বুজা রাউত

 

অম্বুজা রাউত

অ্যাসিসট্যান্ট টিচার (গোপালনগর গিরিবালা বালিকা বিদ্যালয়)

যোগাযোগ: ambuja.routh@gmail.com

One thought on “ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা?

  • October 20, 2020 at 10:46 am
    Permalink

    তু্ই কি জানিস যে তু্ই বিচ্ছিরি রকম ভালো লিখেছিস?

    Reply

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: