ব্লগ

অন্য একতারা: পর্ব— ১

শ্যামশ্রী রায় কর্মকার

কুয়াশা বিধ্বস্ত রোদে হেসে উঠছে জানলার কমলা লেবু গাছ। থরথর হয়ে আছে যৌবনের ভারে। তিন দশক আগে শোনা একটি গানে ধুয়ে যাচ্ছে শ্রবণের পথ। কান্ট্রি রোড, টেক মি হোম। গানটি শুনলেই মায়া ঘিরে আসে। মনে হয়, আর কিছুটা হাঁটলেই স্পর্শ করে ফেলব সেই ঘর। এ সময় যে ঘরের নাম আরোগ্য। যার অপেক্ষায় নিভৃতের আঁচল ধরে বসে আছে সমস্ত পৃথিবী।

পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে আমার দিগন্তবিস্তারী দেশের কথা মনে পড়ে। কৃষক আন্দোলনে অধুনা উত্তাল যে দেশ, তার ভালবাসার মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। ভারতের গ্রাম দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। চাকরির সূত্রে যখন প্রত্যন্ত গ্রামের পথে পা রাখলাম, প্রিয়জনেরা দুঃখ পেয়েছিলেন। ভালোবেসে বলেছিলেন , “এ চাকরি ছেড়ে দে বরং”। আমি জানতাম, শাপে বর হল আমার। চিরদিন সবুজ দেখে উথলে উঠে আমি সামান্য দেহ কষ্টের ভয়ে এ সুযোগ হেলায় হারাবো? বাংলার মাঠে মাঠে নুয়ে আসা মটরের ফুল, ধানের প্রলেপ মাখা দিন আমাকে জড়িয়ে থাকবে। মাটির বুকের গন্ধে থইথই ভরে উঠব আমি।

স্বপ্নের রঙ নীল। নোকিয়ার মোবাইলে পুরুষ গড়ন। আমি তো নতুনের আনন্দে বিভোর তখন। আমার জীবন বান্ধব ওদিকে উদ্বেল হয়ে আছেন শঙ্কায়, ভয়ে। অতএব উপহার এল হাতে। নীল মোবাইলে বেজে উঠল দূরের রিংটোন। কথা আর হয় কই! সিগন্যাল তখনও দূরে। উড়ানের পাখা পোক্ত হয়নি ততটা। ছয়বার গাড়ি বদলাতে হত ইস্কুলে পৌঁছাতে। বাস থেকে নেমে পঁচিশ মিনিট হাঁটা। এঁটেল মাটির পথ বর্ষাকালে পা টেনে ধরতো তার সোহাগী নরম বুকে। আদ্যন্ত শহুরে আমি অতই সহজে তাকে ধরা দিতে পারি? বন্ধু বর্ণালী ও সুশান্তর পাশাপাশি পা টিপেটিপে ঠিক পৌঁছে যেতাম ইস্কুলের ভাঙাচোরা ঘরে। দেখতাম আমার দেশের শুকনো মুখ। হাতে পায়ে খড়ি দাগ, বাড়বৃদ্ধি নেই। ঠোঁটের পাপড়ি খুঁটে রক্ত বার করে বসে আছে।

আরো একবার সেই ডেনভারের গান। কান্ট্রি রোড, টেক মি হোম। এই তো ঘর আমার, এই দেশ, এই তো জীবন। ভালোবেসে ছুটে আসা। কি যে বাঁধনে বাঁধা পড়লাম! আমার ডিলান ডেনভারের সুর মিশে গেল বাংলার ফসলের মাঠে। স্বদেশ নামের এক ছাত্র ছিল, মনে পড়ে। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম হল সে। আমি তাকে বললাম, “কি স্বদেশ! খুশি হয়েছ তো?” স্বদেশের এক মুখ হাসি। “হ্যাঁ ম্যাডাম। জানেন? আজ না মা আমাকে একটা গোটা ডিম খেতে দেবে। আমরা তো ঘরে আটজন! প্রতিদিন সুতো দিয়ে আট ভাগ করে ডিম খাই। আমি আর বোন যখন গোটা ডিমের জন্য বায়না করি, মা বলে- একদিনে বেশি ডিম খেলে অসুখ করে। তবে ফার্স্ট হলে অন্য নিয়ম। আমি কিন্তু অর্ধেকটা বোনকে দেব। ও তো খুব ভালোবাসে খেতে!”
অশ্রু লুকিয়ে রাখা যে এত কঠিন, আগে বুঝিনি। ওর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে হল অসভ্য দেশের প্রতিনিধি। সেদিন বাড়ি ফিরে যে কবিতা লিখেছিলাম, কবেই তা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সেই অনুভূতি এখনও আমাকে তাড়া করে।

হ্যাঁ ম্যাডাম। জানেন? আজ না মা আমাকে একটা গোটা ডিম খেতে দেবে। আমরা তো ঘরে আটজন! প্রতিদিন সুতো দিয়ে আট ভাগ করে ডিম খাই। আমি আর বোন যখন গোটা ডিমের জন্য বায়না করি, মা বলে- একদিনে বেশি ডিম খেলে অসুখ করে। তবে ফার্স্ট হলে অন্য নিয়ম। আমি কিন্তু অর্ধেকটা বোনকে দেব। ও তো খুব ভালোবাসে খেতে!

বহু ধর্মের দেশ আমার, বহু ভাষার দেশ। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদুয়ারায় ঈশ্বর ভজনার দেশ। ঈশ্বরকে বুঝলাম কই! তিনি আছেন না নেই! সন্তান যখন প্রশ্ন করে, আমি ভাবি ঈশ্বর তো মন। যেমন শয়তান। রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, গানে প্রেম ও ঈশ্বর যেমন একাকার হয়ে যান, তেমনই সাগরপাড়ের দেশে আরেকজনের কথা মনে পড়ে। তিনি লেনার্ড কোহেন। হিম নীল অনন্তের উদ্যানে ফুটে থাকা নক্ষত্র কুসুমের মতো কোহেনের কবিতার অক্ষরে মাটি আর ব্রহ্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। পাঠক হিসেবে নয়, গভীর সমুদ্রে নামা নুলিয়ার মতো সেই অনুভূতির অসামান্য বৈভব তুলে আনি।

লেনার্ড কোহেন

কোহেন যত না কবি , গায়ক, তার চেয়ে ঢের বেশি দার্শনিক। ষাট সত্তরের দশকে তাঁর অনন্য প্রভাব বব ডিলানের সমান না হলেও তাঁর পরেই। ভালোবাসা, ঘৃণা, যৌনতা এবং আধ্যাত্মিকতার এক বিরল মিশ্রন তাঁর গান, তাঁর কবিতা। কোহেনের গানের কথা অননুকরণীয়। কবিতাও। কোহেনের কবিতায় আসার কারণ অবশ্যই প্রখ্যাত স্প্যানিশ লেখক ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার প্রভাব। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফ্লাওয়ার্স ফর হিটলার’ (১৯৬৪) প্রশংসিত হলেও অর্থকরী সাফল্য তেমন জোটেনি। কিছুদিন মন্ট্রিয়ালের পোশাকের কারখানায় কাজ করেন তিনি। তারপর সব ছেড়ে ছুড়ে চলে আসেন নিউইয়র্কে। তখন ১৯৬৬। লোকসঙ্গীতের ঢেউ আছড়ে পড়ছে আমেরিকায়। জুডি কলিন্সের সঙ্গে আলাপ হল। কলিনস তখন নামকরা গায়ক। আলাপ হল এন্ডি ওয়ারহল এবং জার্মান গায়ক নিকোর সঙ্গেও। ১৯৬৭ সালে “কোহেনের গান” নামে প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম অ্যালবাম। কোহেনের কলমের জাদু এমন, যে তার স্পর্শ পেতে উন্মুখ হয়ে উঠলেন কলিনস ও উইলি নেলসনের মত জনপ্রিয় গায়কেরা। সাফল্য অনেক সময় মানুষকে লোভী করে তোলে। উত্থানের মায়া সিঁড়ি দিয়ে সে নামতে থাকে নীচে, আরও নীচে। কাউকে কাউকে ক্লান্ত করে। নিংড়ে নেয়।

কোহেনের কবিতা কোনদিনই কেয়ারি করা শব্দের উদ্যান নয়। তাঁর কবিতায় শরীর, আত্মা, ঈশ্বর, অনন্ত- সব একাকার হয়ে যায়। যাঁরা কবিতায় চমক ও জাঁকজমক খোঁজেন, কোহেনের কবিতা তাঁদের জন্য নয়।

অবতরণময় এই উত্থানের পথ থেকে কোহেন সরে এলেন বৌদ্ধ ধর্মের ছত্রছায়ায়। সন্ন্যাস জীবনে তাঁর নাম হলো জিকান। অর্থাৎ স্তব্ধতা। অবশ্য সেই স্তব্ধতাকে তিনি কতটুকু ধরে রাখতে পারলেন, সে কথায় পরে কখনো আসা যাবে। এখন কোহেনের একটি কবিতার কথা বলি বরং। কোহেনের কবিতা কোনদিনই কেয়ারি করা শব্দের উদ্যান নয়। তাঁর কবিতায় শরীর, আত্মা, ঈশ্বর, অনন্ত- সব একাকার হয়ে যায়। যাঁরা কবিতায় চমক ও জাঁকজমক খোঁজেন, কোহেনের কবিতা তাঁদের জন্য নয়। তাঁর লেখা ক্ষণিকের অধিতী নয়, চির অধীয়মান কবিতা। প্রতিমুহূর্তের অনুভব থেকে আত্ম ও অধ্যাত্মকে হৃদয়ঙ্গম করার কবিতা। নিচের এই কবিতাটি পড়লেই বুঝতে পারবেন সামান্য ও অসমান্যের কি অপূর্ব এক মেলবন্ধন কি অনায়াসে ঘটেছে এখানে ।

ভ্রান্ত নেশায় (Drank a lot)
লেনার্ড কোহেন
অনুবাদঃ শ্যামশ্রী রায় কর্মকার

ভ্রান্ত নেশায় আমি, ব্যর্থ পেশায়
ডুবেছি, ভ্রষ্ট কালকেতু
তুমি এসে দাঁড়ালে, যেন পেরিয়ে এলে
ধ্বস্ত উত্তরের সেতু

এক কোপে কেটে ফেলি স্মৃতির শেকড়
ভুলের চক্রব্যূহে পড়ে
তোমাকে সরাই যত, শাস্তির ঘর
তুমিও সরিয়ে নাও দূরে

কোনও আসা-যাওয়া নেই, এক নিঃশ্বাসে
শাসিতের দায় মুছে নিয়ে
আমাকে শেখালে তুমি, বন্ধুর নাম
শুরু হয় ঈশ্বর দিয়ে

শুশ্রূষাটুকু নিও বাহুতে জড়িয়ে
সিঁথিপথে আঙুলের মাস
আমাদের ঠোঁটে শুরু হওয়া চুম্বনে
ভিজে আছে জল ও আকাশ

স্বীকার করেছি যত পাপের স্বখাত
কৌশলও আজ মার্জিত
নতুন বিধান লেখা হবার আগে
বিশ্রাম ন্যায়সঙ্গত

যা হারিয়ে গেছে, তাকে কারণ ভেবেছ
জিতেছি যা, সেও নয় হেতু
সব কাজ ফেলে তুমি পেরিয়ে এসেছ
ধ্বস্ত উত্তরের সেতু

যদিও ক্ষমার নেই কোনও অভিমত
আসিনি তো কষ্ট পোহাতে
কান্না নিভৃত নয়, মানুষ এসেছে
অন্যের অশ্রু কুড়াতে

এই তো প্রথম হল, এই তো দ্বিতীয়
এইবার ধ্বংসের ঘরে
মানুষ জেনেছে, তার কান্নাই শ্রেয়
সত্যকালীন ও তার পরে

নিভে গেছে পথজোড়া আলোর বিভাস
মিথ্যে শিক্ষা দিকে দিকে
অগ্রগমন নয় সত্যের ভাষ
সত্য চেনে না মৃত্যুকে

তারপর এল সেই রাতের আদেশ
যেন থাকি তার অনুরাগে
ইভের গভীরে ছিল যেমন আদম
মহান বিভাজনের আগে

এই শুশ্রূষাটুকু জড়ানো বাহুতে
সিঁথিপথে আঙুলের মাস
প্রতিটি ক্ষিদের মুখে নিজের অজ্ঞাতে
অলস গভীর উল্লাস

আজকের এই আমি ছুঁতে অপারগ
সৌন্দর্যের পথরেখা
যা কিছু এঁকেছি, সুন্দরের অনুগ
বন্ধনহীন রূপলেখা

প্রাচীরের দেহ থেকে হাওয়ার চারণ
নির্ভার, দৈনন্দিন
তোমার ঠোঁটের থেকে যদি দূরে যাই
বিঁধে যায়, খর, সঙ্গিন

নিভে গেছে পথজোড়া আলোর বিভাস
প্রতিটি পথেই বিভ্রম
ভ্রান্ত প্রেমের গাথা জুড়ে লেখা ছিল
স্বপ্নের কার্য ও ক্রম

আর কোনও অভিমত, প্রেক্ষিত নেই
কিছু নেই, কেউ নেই আর
মজি ও বিছিয়ে থাকি লিলির মতন
ব্যাপ্তিতে ডুবি চিরকাল

তুমিই জিহ্বা প্রভু, তুমি দরশন
আমার আসা ও যাওয়া তুমি
নিজহাতে ডুবিয়েছ তরীটি আমার
পারাবার হয়ে আছি আমি

যখন আমার ক্ষুধা মেটবার নয়
জিহ্বা সরিয়ে অনুরাগে
ক্ষুধার গর্ভে সেও দেয় আশ্রয়
জীবনের জন্মের আগে

চলৎ-শক্তিহীন এই বাঁধা পড়া
থেমে থাকা সময়ের বুকে
মজি ও বিছিয়ে থাকি লিলির মতন
ডুবে যাই কেন্দ্রাভিমুখে

গোপন দরজা দিয়ে পালাতে পালাতে
জীবনের সীমা ছুঁয়ে ফেলেছি
তুমি বলতেই পার, সব বিন্যাস
ভাগ্যের হাতে ফেলে এসেছি

আর কোনও অভিমত, প্রেক্ষিত নেই
কিছু নেই, কেউ নেই আর
মজি ও বিছিয়ে থাকি লিলির মতন
ব্যাপ্তিতে ডুবি চিরকাল

শান্তির ভান করে চলতে চলতে
পৌঁছেছি সীমান্তে এসে
হৃদয়ের অণু পরমাণু ছারখার
তোমাকে তীব্র ভালবেসে

(ক্রমশ)

Leave a Comment

View Comments

Share

Recent Posts

সদ্যোজাতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই! সামাজিক বয়কটের মুখে পরিবার

  বিবিধ ডট ইন: 'রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা, এমন কেন সত্যি হয়না আহা!'…

November 3, 2021

এবার ফতোয়া নয়, বাকস্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করছে তালিবান!

  বিবিধ ডট ইন: আফগানিস্তানের দখল তালিবানদের হাতে চলে যাবার পর থেকেই যে দেশের একাধিক…

November 3, 2021

অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে ফিরছেন যুবরাজ?

  বিবিধ ডট ইন: অবসর ভেঙে আবারও ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছেন যুবরাজ সিংহ? সম্প্রতি যুবরাজের…

November 2, 2021

NEET UG: রাজ্যে প্রথম, সর্বভারতীয় স্তরে ১৯ নম্বরে সোনামুখীর সৌম্যদীপ

  বিবিধ ডট ইন: সদ্য প্রকাশিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট নিট এর প্রকাশিত ফলাফলে…

November 2, 2021

মোদীর আমন্ত্রণে সাড়া, ভারতে আসছেন বরিস জনসন

  বিবিধ ডট ইন: ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আহবান জানালেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস…

November 2, 2021

কাবুল সেনা হাসপাতালে বিস্ফোরণ, মৃত ১৯

  বিবিধ ডট ইন: ফের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল আফগানিস্তান। এবার রক্তাক্ত হলেন হাসপাতালে আসা রোগী…

November 2, 2021

This website uses cookies.