এখানে ‘আত্মহত্যা’ করে পাখিরা! কোন রহস্য এই ‘সুইসাইড জ়োন’কে ঘিরে?

বিবিধ ডট ইন: আজকের দুনিয়ার বহু রহস্যের কিনারা করেছে আধুনিক বিজ্ঞান।এই বিজ্ঞানের প্রাদুর্ভাবেই দেখা গেছে, মানুষের অন্ধ বিশ্বাসের ফলে জন্ম নেওয়া কিছু রীতি-নীতির আসলে কোনো প্রাসঙ্গিকতাই নেই। তবুও বলাই বাহুল্য, ইহ জগতের অনেক প্রগাঢ় রহস্যের সংজ্ঞা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছেও ঘন কুয়াশার ঢাকা। যুগের পর যুগ চলে যায়, বহু গবেষণা, বহু খোঁজাখুঁজি ইত্যাদি চলে তবুও এমন কিছু রহস্য থেকে যায়, যার সমাধান বৈজ্ঞানিক নিয়ম দ্বারা করা সম্ভব হয় না।অথবা এও হতে পারে যে বিজ্ঞানীরা হয়তো যে রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা বিজ্ঞানের পৃষ্ঠায় একটিও দাগও কাটতে পারেনি।এমনই এক ঘোর রহস্যময় জায়গার নাম হল জাতিঙ্গা।

আত্মহত্যা করে মৃত্যু বরণ করার নিরিখে আজকের মানব সমাজের স্থান বোধহয় আদি মানব সমাজের চেয়ে অনেকটাই বেশি।প্রতিদিনই আমরা কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার খবর শুনেই থাকি। অনেক লোকই, প্রিয়জনের অথবা সমাজব্যবস্থার ওপর অভিমান করে বা কোনো দুর্বিষহ যন্ত্রণার সূর্য সমান উষ্ণতা সহ্য করতে না পেরে হারিয়ে যান এক অদূর দিগন্তে। ‘সুইসাইড জোন’ মানে মানুষ যেখানে শান্তিতে আত্মহত্যা করতে পারে এরূপ জায়গার উদাহরণ পৃথিবীতে বহু।যেমন জাপান দেশের মধ্যে অবস্থিত ‘আকিগাহারা জঙ্গল’ ‘সুইসাইড জ়োন’ হিসেবে ভীষণ ভাবে পপুলার।

মানুষ আত্মহত্যা করে এতো সবার জানা কিন্তূ আপনি কি পাখিদের আত্মহত্যার শুনেছেন জীবনে? ভীষণ অবাক হলেন, তাই না? কিন্তূ এই তথ্য সর্বসম্মত ভাবে সত্য এবং জানলে আরো অবাক হবেন খোদ আমাদের দেশ অর্থাৎ ভারতবর্ষেই রয়েছে এমনই একটি ‘পক্ষী সুইসাইড জ়োন’।বছরের প্রায় প্রত্যেক সময়ই বিশ্বের বিভিন্ন রকমের পাখিরা ঝাঁক বেঁধে আসে এখানে আত্মহত্যা করতে।

জাতিঙ্গা নামক এই বিশেষ গ্রামটি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য আসামের দিমা হাসাও নামক এক জেলায় অবস্থিত। ‘বার্ড সুইসাইড জোন’ এই পাহাড়বেষ্টিত আদিবাসী গ্রামটিতে বেশ কয়েকটি বর্তমান। আধুনিক পৃথিবীর কাছে এই ঘটনা এক বিরল ও অতিবৈচিত্রীক। এই গ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠ দের কাছে শোনা যায়, আজকের থেকে প্রায় ১ হাজার বছর বা তারও আগে কোনো এক অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার পাখি হটাৎ করে আত্মহত্যা করতে শুরু করে দেয়। গ্রামবাসীরা এও বলেন এই ঘটনা ছিলো কোনো দেব-অভিশাপ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বভাবতই ভীষণ ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে এলাকাবাসীদের মধ্যে।

এই ঘটনার কারণে সন্ধে নামলেই বাড়ি গ্রামবাসীরা বাড়ি থেকে বেরোতেন না।কিন্তূ বিজ্ঞানের কার্যকরী মধু যখন ধীরে ধীরে এখানকার মানুষ পান করতে শুরু করে তখন থেকেই তাদের মধ্যে যুক্তি-বৈশিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ আসা শুরু হয়ে যায়।রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য জন্য অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে শুরু করে।

অনেক পক্ষীবিজ্ঞানীই মধ্য বিংশ শতাব্দীতে এই রহস্যের গবেষণায় লিপ্ত হলেন।কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই ঘটনার কোনো যৌক্তিক রহস্য বা নির্দিষ্ট কারণ কেউই প্রজ্বলিত করতে পারলেন না।যদিও এটাও ঠিক তারা সবাই নিজেদের মতো করে এই ঘটনার জন্য বিভিন্ন ধরনের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।তবুও পাখিদের আত্মহত্যা বন্ধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন তারা।

সাধারণত প্রতি বছর বর্ষাকালকেই আত্মহত্যার জন্য উপযুক্ত হিসেবে বেছে নেয় পাখিরা। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি মাত্রায় চোখে পড়ে।প্রতি বছর বর্ষার সময়ে অসংখ্য মানুষকে ভিড় জমাতে দেখা যায় আসামের এই বিশেষ জায়গাতে এই নির্মম দৃশ্য দেখার জন্য।তবে এই ঘটনা মোটেও দর্শনীয় বা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নয়।

জাতিঙ্গা গ্রামের পাহাড়ি খাদগুলিকে সাধারণত আত্মহত্যার উপযুক্ত হিসেবে পাখিরা পছন্দ করে এবং রাত যখন গভীর হয় তখন সেখানে গিয়ে তারা তাদের প্রাণ বিসর্জন দেয়। এক পক্ষী বিজ্ঞানীর কথা অনুযায়ী,পাখিরা গভীর রাত্রি বেলায় এক আলোকোজ্জ্বল পদার্থের উপর হঠাৎ করে ঝাঁপ দেয় এবং প্রাতঃকালে নীচে তাদের ক্ষত-বিক্ষত কোমল দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পাখিদের এভাবে ‘স্বেচ্ছায়’ জীবন শেষ করাটা তো আর সহজ ব্যাপার নয় তাই এ নিয়ে প্রচুর চর্চা ও গবেষণা এখনো করে চলেছেন পক্ষী বিজ্ঞানীরা। ১৯০৫ সালের ব্রিটিশ ভারতে প্রথম এই গবেষণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় । শোনা যায়,এই গবেষণা শুরু হয়, এক রহস্যময় পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে –

১৯০৫ সালের কোনো এক ঝড়বৃষ্টির রাতে জাতিঙ্গা গ্রামের কোনো এক অধিবাসীর একটি মেষ খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই মেষটির নানা কারণে বিশেষ গুরুত্ব ছিল গ্রামবাসীদের কাছে। ফলে রাত্রি বেলায় সাধারণত গ্রামবাসীরা বাহিরমুখো না হলেও সেই মেষকে খোঁজার জন্য তাদের দল বেঁধে বেরোতে হয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চল তার ওপর আবার রাত্রি বেলা তাই সবাই মশাল হাতে নিয়ে বের হয়। মেষটিকে জঙ্গলের মধ্যে খোঁজাখুঁজি করছিলো তারা। কিন্তূ এক বিস্ময়পূর্ণ ঘটনা আচমকাই ঘটে যায়।

চারপাশ থেকে হাজারো পাখি ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে এসে তিরবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে জ্বলন্ত মশালগুলোর মধ্যে এবং মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় সব কটি পাখির।

গ্রামবাসীরা অদ্ভুত এই ঘটনা দেখে অস্থির হয়ে পড়েন। এরপর সকালে এই ঘটনার কথা স্থানীয় বনবিভাগকে জানাতে তা সরকারের কানে যায়। এমন অবিশ্বাস্য খবর শুনে সরকারও বিস্মিত হয়ে যায়।

তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনার সত্যতা প্রমানের জন্য তাদের দেশের একটি পক্ষী বিজ্ঞানীর দলকে এই গ্রামে গবেষণা করতে পাঠায়।

ইতিমধ্যেই এই বৈচিত্র্যময় খবর সংবাদপত্রে ছাপা হওয়ার ফলে, সারা বিশ্বে খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যায়। অনেক বিদেশী বৈজ্ঞানিক দলও এই খবর শোনার পর জাতিঙ্গা গ্রামে ঘাঁটি গাড়ে। কিন্তু কেউই গবেষণাতে কোন সাড়া ফেলতে পারেননি।

এই বিস্ময়কর ঘটনার গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বলতে একমাত্র ইংল্যান্ডের প্রাণীবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড রিচার্ড জি নামই করা যায়, যিনি ১৯৬০ সালে সর্বপ্রথম এই রহস্যের কিছুটা দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হন। বলাই বাহুল্য ড. জি তখন এ বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রাণী বিজ্ঞানীদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করেন। ভারতের খ্যাত পক্ষী বিশারদ সেলিম আলিও এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন।

ড. জি মতামত প্রকাশ করে বলেন যে, পাখিরা কোনো এক অজানা প্রচণ্ড পাহাড়ি বাতাসের কারণে এরকম ভাবে মৃত্যু বরণ করে। কিন্তূ গ্রহণযোগ্যতার অভাবে এই দাবির সঙ্গে অনেকেই একমত হননি। দেখতে হইবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে পাখিরা হটাৎ করে কেনো এরকম ভাবে মারা যাবে। এটাও উল্লেখযোগ্য যে আসামের ওই অঞ্চলের আশেপাশের অন্যান্য এলাকায়- যেসব জায়গা জাতিঙ্গার অনুরূপ সেসব জায়গায় পাখিদের মধ্যে কেনো এরকম ভাবে আত্মহত্যা করার রীতি নেই।

অনেকে আবার এই ধারণাও পোষণ করেন যে, এই সব পাহাড়ি এলাকায় বর্ষাকালে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড বেগে ঝড় হও এবং এই ঝড়ের ফলে সেখানকার পাখিরা দিকভ্রান্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাই সেইসব পক্ষীকুল নিম্নমুখী হয়ে অথবা কোথাও ধাক্কা খেয়ে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু স্বভাবতই এই দাবিও ধোপে টেকেনি।

অবশেষে একজনের কথা না বললেই নয় যার নাম ভারতের আনোয়ার উদ্দিন চৌধুরী যিনি একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী।
২০০০ সালের গোড়ায় তিনি গ্রন্থ প্রকাশ করেন তার এই ব্যাপারে গবেষণা সম্পর্কে নাম- ‘দ্য বার্ড’স অফ আসাম’ । এই গ্রন্থে তিনি একটি রহস্য তুলে ধরেন যার সারমর্ম হলো-

এই জাতিঙ্গা অঞ্চলের চুম্বকীয় স্তরে বর্ষাকালের রাতে অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। এই সময় এই এলাকার শুন্যে থাকা পাখিদের পৃথিবী তার নিজের কেন্দ্রের দিকে প্রচণ্ড বেগে টানতে করতে থাকে। এর ফলে আকাশে থাকা পাখিরা মাটিতে মারা যায়।তবে
এই চুম্বকীয় স্তরের পরিবর্তন সম্বন্ধীয় কোনো আবিষ্কার তিনি এখনো করতে পারেননি।

ড. চৌধুরীর গবেষণার ফলস্বরূপ এই ব্যাপারে তদন্তের জন্য বিজ্ঞানী দের একটি দল সেখানে যায় এবং তারা জানায়, এই অভিযানের পর পাখিদের মৃত্যু অনেকটাই আটকানো গেছে। গবেষকরা গ্রামের অধিবাসীদের ঘরে ঘরে গিয়ে এই ব্যাপারের বৈজ্ঞানিক দিক বুঝিয়েছেন।কিন্তু এখনো অনেকেই মনে করেন আগের মতো এখনো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি জাতিঙ্গা গ্রামে আসে আত্মহত্যা করতে।

সাদা সারস, সবুজ পায়রা, সোনা ঘুঘু, কাঠঠোকরা ও মাছরাঙা এই জাতীয় পাখি বিশেষত আত্মহত্যা করতে আসা পাখির তালিকায় রয়েছে। পরীক্ষা করার জন্য একবার একদল বিজ্ঞানী জাতিঙ্গা গ্রামে গিয়ে সেখানকার কিছু পাখি খাঁচায় আটকে রেখেছিলেন যাতে সেই সব পাখি আত্মহত্যা না করে কিন্তূ উল্লেখযোগ্য ভাবে তারা কোনো খাবার না খেয়ে মারা যায়। এই বিশেষ অঞ্চলে পাখিদের এইরূপ মৃত্যুবরণের কারণ আজ কুয়াশাচ্ছন্ন।

লিখেছেন আকাশ চৌধুরি

হ্যালো! আপনার মতামত আমাদের কাছে মূল্যবান

%d bloggers like this: